শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

গল্প >> ঘুণ পোকা : সুকুমার রুজ

ঘুণ পোকা

সুকুমার রুজ

আচমকা স্বপ্নটা ভেঙে গেলো বিলাসের। বিদঘুটে স্বপ্ন। আজগুবি। মনের মাঝে স্বপ্নে দেখা বিটকেল লোকটা। অদ্ভুত চেহারা। গায়ের রঙ ফ্যাকাশে সাদা। মাথায় ছোট-ছোট লালচে চুল। চোখদুটো নীল। মুখে গোঁফ-দাড়ির চিহ্ন নেই। তার আজগুবি কথাগুলো মনে পড়ছে বিলাসের। নাকি সুরে কাটা কাটা কথা - আজ থেকে যার দিকে তোমার দৃষ্টি পড়বে, তখখুনি তার মনের ভাবনাটা তোমার মনেও চলে আসবে। বিলাসের হাসি পায়। অন্যের ভাবনা সে জেনে যাবে! সত্যিই স্বপ্নের কোনো মাথামু-ু থাকে না। স্বপ্ন কখনও সত্যিও হয় না। বিলাসের কানে কাক ও অন্যান্য পাখ-পাখালির ডাক। জানলা দিয়ে আবছা আলো ঘরের মধ্যে। ওর এখন বিছানা ছাড়ার ইচ্ছে নেই। হাই তুলে পাশ ফেরে সে। পাশেই বিনতা ঘুমের জগতে। নীলচে আলোয় বিনতার আলগা শরীর দেখতে ভালো লাগে তার। ঘুমন্ত মুখটা যেনো কিশোরীর! কিন্তু এ কী! এ কী হচ্ছে তার মনে! বিনতার স্বপ্ন তার মনে চলে আসছে! আশ্চর্য! বিনতা স্বপ্নে দেখছে গোরাকে। বাড়িওয়ালার ছেলে গোরা। বিনতা ওকে বলছে - গোরাদা! তুমি আর আসো না তো! আগে মাঝে মাঝে আমার ঘরে চলে আসতে। এখন আমাকে তোমার ভাল্লাগে না? ও তো দুপুরে স্কুলে থাকে। আজ দুপুরে চলে এসো না। কতদিন তোমার সাথে গল্প করিনি। জানো তো আমি কতো একা। বিলাস হতভম্ব। বিনতার স্বপ্ন, তার অবৈধ কামনা সত্যি-সত্যিই ওর মনে ধরা পড়েছে। বিলাসের গা ঘিন ঘিন করে ওঠে। ছিঃ! বিনতা এমন! অথচ ও বিনতার সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করছে। কিন্তু ওকে দেখে তো কিছু বোঝা যায় না! না না বিনতা এমন হতে পারে না। এ তারই মনের নোংরামি! অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু সে স্পষ্ট শুনলো যেনো ‘গোরাদা! ...!’ বিলাসের মন অস্থির। সে নিশ্চিত হতে বিছানা ছাড়ে। বারান্দায় বেরোতেই বাড়িওয়ালা গুহবাবুর মুখোমুখি। বাড়িওয়ালার হাতে ধরা ডোবারম্যানের ‘চেন’। মুখে মেকি হাসি। চোখেমুখে অবাক হবার ছাপ ফুটিয়ে প্রশ্ন - কী ব্যাপার বিলাসবাবু! আজ বড় সকাল-সকাল! মর্নিংওয়াক শুরু করছেন নাকি আজ থেকে?
বিলাস হালকা হাসি ফুটিয়ে এমনভাবে ঘাড় নাড়ে যার অর্থ হ্যাঁ বা না দুটোই হতে পারে। গুহবাবুর মুখে হাসি থাকলেও মনে অন্য ভাবনা। বিলাসের মনের পর্দায় অদ্ভুতভাবে সে ভাব ফুটে ওঠে - ব্যাটা মাস্টার! এ মাসেই তোর এগ্রিমেন্ট শেষ। এবার এমন পেছনে লাগবো, পালাতে পথ পাবি না। তারপর আবার নতুন ভাড়াটে। আবার অ্যাডভান্স! আরও ফিক্সড ডিপোজিট। কী আনন্দ!
উঃ! কী পাষ- লোকটা! ব্যবহারে বুঝার উপায় নেই মনে এত প্যাঁচ! যদি সত্যিই বুড়ো বদমাইসি করে তাহলে আবার বাড়ি খোঁজা। আবার নতুন করে সংসার পাতা...! স্কুল-ট্যুইশনির ফাঁকে-ফাঁকে বিদেশী কোম্পানির নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের ‘চেন’টা এই এলাকাতেই করেছে। এই এলাকায় ঘর ভাড়া না পেলে...? নাঃ! স্বপ্নটা তাহলে সত্যি সত্যি ফলছে তো! এতে অবশ্য একটা সুবিধা হলো, আগেভাগে অন্যের মনের ভাবনাটা সে জানতে পারছে। প্রয়োজন মতো ব্যবস্থা সে আগেই নিতে পারবে। তার নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ে এ ব্যাপারটা দারুণ কাজে লাগবে। অন্যের সাইকোলজি...। বিলাসের মনে হালকা খুশি। কিন্তু বিনতার স্বপ্নের কথাটা মনে পড়তেই আবার মন ভারি হয়। এর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। গোরাটা একটা লম্পট। বিনতা কী করে ওর চক্করে পড়লো কে জানে! 
সূর্য উঠতে এখনো দেরি আছে। বিলাসের ট্যুইশনে বেরোনোর সময়ও হয়নি এখনো। কিন্তু বিছানায় গিয়ে শুতেও আর ইচ্ছে হচ্ছে না। বিনতার উপর একটা চাপা রাগ ও ঘৃণা ওর মনে। মনটাও ভালো নেই। অন্যের ভাবনা ওর মনে ঢুকে মনটা চঞ্চল হচ্ছে। রাস্তার দিকে চোখ যায় বিলাসের। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের পাশে ছোট ময়লা ফেলা আস্তাকুঁড়ে কাকগুলো ভিড় জমিয়েছে। অনেক কাক একসঙ্গে খাবার খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। ওদের পাশে-পাশে দু-একটা শালিকও বেশ ভীরু-ভীরু চোখে। রাস্তার ধারে সরু কাঁটামাদার গাছটার মাথায় লাল-লাল ফুল। গাছটাতে পাতা নেই বললেই চলে। সেই ফুলের খোসার উপর একটা দোয়েল বসে ফুল থেকে কী খুঁটে খাচ্ছে কে জানে। সরু গাছটা হাওয়ায় দুলছে। তার সঙ্গে সঙ্গে দোয়েলটাও। বিলাসের চোখে এসব দৃশ্য নতুন লাগছে। এ দৃশ্য দেখার ফুরসত হয় না তার কোনো দিনই। ইচ্ছেও লাগে না। আজ যেনো একটু অন্য রকম। বিলাস চপ্পলে পা গলিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। আজ যখন ভোরে জেগেই গেছে, ভোরটাকে সে উপভোগ করতে চায়। কিছুটা এগোতেই কাকলির মায়ের সাথে চোখাচোখি। কয়েকটা বাড়ি পরেই ওরা থাকে। বিলাসকে দেখে নিস্পৃহ গলায় বলে - কী গো মাস্টার! এত সকালে পড়াতে যাচ্ছো, তোমার ছাত্তরের ঘুম ভেঙেচে এখন? বিলাস হালকা হেসে বলে - না মাসিমা! এখন পড়াতে যাচ্ছি না। এই একটু পায়চারি আর কী! কাকলির মা খোকনদের প্রাচীরের ধারে টগর গাছ থেকে ডিঙি মেরে ফুল তুলতে তুলতে বলে - তা বেশ। ভালো, ভালো। এই মুহূর্তে কাকলির মায়ের মনের ভাবনা বিলাসের মনে - হাড়হাভাতে মাস্টার কোত্থেকে এসে এ পাড়ায় জুটে আমার ‘সব্বোনাশ’ করলো। মুকে যেনো মদু - মাসিমা - আমার চোদ্দপাকের বোনপোরে! এখানে পাড়ার সব ‘টিউশানি’গুলো তুই ধরে নিলি। ওগুলো তো সব কাকলির বাবারই ছিলো। বুড়ো মানুষটা চোকে কম দেকে। ও কি অন্য পাড়ায় পড়াতে যেতে পারে! যাওবা কাকলির বিয়েটা যেমন-তেমন করে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম...! বিলাস এ কথাটা একবারও ভাবেনি। পেনশন না-পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত ওই শিক্ষকের মনোকষ্টের কারণ হয়েছে সে! কিন্তু তার কী করার আছে। ছাত্র-ছাত্রীর বাবা-মা তাকে পড়াতে বললে সে তো পড়াবেই। সে তো টাকা উপার্জন করতেই শহরে এসেছে। এখনই তার খাটার বয়স। যত বেশি রোজগার করে নিতে পারে। তা না হলে পরে তো কাকলির বাবার দশা তারও হবে! তাই কাকলির মায়ের ভাবনাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে। তবুও মনটা কেমন যেনো খিঁচখিঁচ করছে তার। ওই অদ্ভুত স্বপ্নটাই যত নষ্টের গোঁড়া। স্বপ্নটা হঠাৎ সে দেখলোইবা কেনো? আর দেখলোই যদি তা সত্যি সত্যি ফলছেই কেনো? এর আগে কত স্বপ্নই সে দেখেছে - পিএইচডি করে কলেজে লেকচারার হয়েছে কিংবা অমিতাভের মুখোমুখি বসে সব প্রশ্নের সঠিক জবাব দিয়ে ক্রোড়পতি বনেছে। এ স্বপ্নগুলো তো ফলেনি। স্বপ্নে দেখা সেই বিদঘুটে লোকটাইবা কে? মুখটা অনেকটা জর্জ বুশের মতো লাগছিলো। নাকি তার নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের অর্গানাইজার, সে কাল সেমিনারে বুঝাচ্ছিলো কীভাবে মানুষের মনের মধ্যে কিংবা আস্তে আস্তে একদম অন্দরমহলে ঢুকে পড়তে হয়; সেই মানুষটার মুখ ছিলো ওটা? কাল কী সুন্দর অংক কষে বুঝিয়েছিলো ম্যানুফ্যাকচারার টু কাস্টমার। মাঝে ডিলার, সাব ডিলার, রিটেলার, এমনকি বিজ্ঞাপন - সব ওমিট। সেই অংশটা পুরো কমিশন। পার মান্থ অ্যাবাউট টেন থাউজেন্ড। ইয়ারলি ওয়ান ল্যাক টোয়েন্টি প্লাস ইনসেনটিভ। দু’ বছরে বাড়ি-গাড়ি। গুহবাবুদের দলে তারও নাম। ইস হ্যাভিক স্বপ্ন দেখিয়েছে মাইরি! ওটা যদি সত্যি হয় তা হলে তো কেল্লা ফতে! এসব ভাবতে ভাবতে বিলাস কখন পায়ে পায়ে পৌঁছে গেছে পাড়ার পার্কে।

বিলাস বিনতার শরীর থেকে চোখ সরিয়ে নিলেও তার স্বপ্ন কিন্তু ভাঙেনি। স্বপ্নে গোরাদা তাকে কথা দিয়েছে আজ দুপুরে আসবে। বিনতার মনে খুশির হাওয়া। আজ সে গোরাদা’র সঙ্গে দুপুরে গল্প করতে পারবে। ওর মুখ থেকে তার রূপের ভুরি ভুরি প্রশংসা শুনবে। দু’জনে মন খুলে কত কথা, হয়তোবা আরও কিছু...! তাই সে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলছে। বাথরুমে ঢুকেছে বিদেশী কোম্পানির দামি সাবান নিয়ে। বিলাস এ সাবান দিয়েছে তার নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের জন্য চার হাজার টাকার বিনিময়ে পাওয়া কসমেটিক্স ভরা কিটস থেকে। কোম্পানির নির্দেশ আছে-আগে নিজে বাড়িতে ব্যবহার করুন। পড়শি, আত্মীয়স্বজনের ঈর্ষার কারণ হোন। তারপর অন্যকে বিক্রি করুন। সেই সাবান মাখছে তার শরীরে, অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে। এতে নাকি ত্বক হবে আরও উজ্জ্বল ও মাখনের মতো নরম। বাথরুমটা সাবানের গন্ধে ভরপুর। প্লাস্টার চটা, মাকড়শার জাল, বিছানো বাথরুমটা কী করে যে সাদা ধবধবে টাইলসে সেজে উঠেছে। দেওয়ালে বিশাল এক আয়না। পুরো শরীর ধরা পড়ে ওতে। এটাইবা এলো কোত্থেকে। যাকগে, ওসব ভাবার সময় এখন বিনতার নেই। সে তার নিরাবরণ শরীরটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আয়নায়। নিজেকে দেখে উৎফুল্ল সে। আগের চেয়ে হঠাৎ কী করে সে আরও সুন্দর হয়ে গেছে। থুতনির নিচে কী সুন্দর ছোট্ট একটা ঢেউ! আগের চেয়ে আরও ভারি হয়েছে বুক। কোমরে ছোট্ট-ছোট্ট দুটো ভাঁজ। মনের মাঝে কখনো বিলাস কখনো গোরাদা! গোরাদা তাকে দেখলেই কত রূপের প্রশংসা করে। অথচ বিলাসের রূপ দেখার সময় নেই। সে সারাদিনই বাইরে। ট্যুইশনি-স্কুল-কোচিং সেন্টার। ছুটির দিনে কসমেটিক্স ভর্তি ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পড়ে। দু’ বছরের মধ্যে বাড়ি-গাড়ি করবেই সে। তখন নতুন বাড়িতে বিনতাকে রাণী করে রাখবে। নতুন গাড়ি চড়িয়ে গঙ্গার ধারে হাওয়া খেতে নিয়ে যাবে। তাই এখন তার কথা বলারও ফুরসত নেই বিনতার সঙ্গে। শুধু রাত্রিবেলায় যা...! বিনতার রূপচর্চার শেষ পর্ব চলছে এখন বিলাসের এনে দেওয়া পছন্দসই দামি লিপস্টিকের ছোঁয়ায়। তারপর সে সারা গায়ে ছিটিয়ে নেয় বিদেশী বডি-¯েপ্র মিন্ট। বিলাস বলে এর গন্ধটা খুবই কামোত্তেজক। এমন মাদকতা এর গন্ধে, যে কোনো পুরুষকে কাবু করে দিতে পারবে। আজ বিনতা এর প্রমাণ পেতে চায়। ওই যে দরজায় খটখট শব্দ। বোধহয় গোরাদা এলো। শব্দটা এবার বেশ জোরে। বিনতার ঘুম ভাঙে। কানে আসে কাজের মেয়ে ডলির ডাক - ও বৌদি। এখনও জাগোনি। ঘুম ভাঙতে এত দেরি তোমাদের!
এখনো সূর্য ওঠেনি। পূব-আকাশে লালচে আভা। বিলাস ভোরে ওঠেনি বহুদিন। সূর্য উঠা কতদিন দেখেনি। ওর আজ সূর্য উঠা দেখার ইচ্ছে হয়। কিন্তু ওর মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বিনতার স্বপ্ন। আচ্ছা বিনতা কি সত্যিই এ রকম? সে কি সত্যিই ওই নচ্ছার গোরাটার সঙ্গে মাখামাখি করছে তার ঘরে না থাকার সুযোগ নিয়ে। আচার ব্যবহারে তো কিছু বুঝা যায় না। যেনো খুবই ‘পতিব্রতা’ নারী। স্বামীর সুখ-সুবিধার জন্যই সে সারাটা দিন ব্যস্ত থাকে এমন ভাবখানা তার! মনের মধ্যে যেসব চিন্তা ঘুরে বেড়ায় সেগুলোই স্বপ্নে আসে বলে শুনেছে। তাহলে বিনতা নিশ্চয় কখনো-সখনো গোরার কথা ভাবে। স্বপ্নটা সে গোরাকে নিয়ে দেখছিলো এটা ঠিক। এ তার নিজের মনের বিকৃত ভাবনা নয়। কেননা শুধু বিনতার স্বপ্ন নয় বাড়িওয়ালা গুহবাবু কিংবা কাকলির মায়ের মনের কথাও সে জানতে পেরেছে স্বপ্নের গুণে। নাঃ, সূর্য রোজই উঠবে। যেদিন হোক দেখলেই চলবে। বিনতাকে আজ একটু বাজিয়ে দেখে নেওয়া যাক, এই ভেবে বিলাস পার্ক থেকে উঠে পড়ে। 
বিনতা বিলাসকে বিছানায় না দেখতে পেয়ে ভেবেছিলো বাথরুমে গেছে। ডলির ডাকে বিছানা ছেড়ে দরজা খুলতে গিয়ে দেখে দরজার খিল খোলা। তাহলে বিলাস নিশ্চয় বাইরে বেরিয়েছে। কিন্তু এত সকালে কোথাও তো যায় না! বিশেষত তাকে না বলে বেরোনো এই প্রথম। বিনতা কিছুটা চিন্তায় পড়ে। ডলিকে শুধায় - কী রে তোর দাদাবাবুর সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলো? ডলি তার স্বভাবগত ভঙ্গিতে উত্তর দেয় - কী করে দেখা হবে? দাদাবাবুর রাস্তা আর আমার রাস্তা কি এক? আমি এ বাড়ি ও বাড়ির পাশ দিয়ে, গলিঘুঁচি দিয়ে...! বিনতা হালকা ধমক দেয়, থাম। তুই বড্ড বেশি বকিস। ডলি বিনতার গলার স্বরে মনের ভাবগতিক বুঝে চুপ করে যায়। প্রতিদিন সকালটা এক নির্দিষ্ট ছকে চলে বিনতার। আজ কেমন যেনো এলোমেলো হয়ে গেছে। এই সময় সে চা বানিয়ে. বিছানায় বিলাসকে এক কাপ আর ডলিকে এক কাপ দিয়ে বারান্দায় গ্রিলের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আয়েস করে চা খায়। চা খেতে খেতে দেখে আস্তাকুঁড়ে কাকেদের লড়াই, আকাশে উড়ন্ত সঙ্গহীন চিল কিংবা সামনের বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা গা-উদোম মানুষটাকে। শোনে ময়লা ফেলা ঠেলাগাড়ির ঘর্ঘর শব্দ, দূরে কারখানার সাইরেন কিংবা বাড়িওয়ালার বাথরুম থেকে ভেসে আসা গোরাদার বেসুরো গান। আজ সে চা বসায়নি। ডলিও কাজে ধরতাই পাচ্ছে না। রোজ সে দরজার চৌকাঠে বসে চা আর একটা টোস্ট খেয়ে, তিনজনের কাপ তুলে নিয়ে বাসন মাজতে বসে। সে আজ এখনো বাসন মাজা শুরু করেনি। একটু উসখুস করে ডলি বলে - কী গো বৌদি আজ এখনো চা বসালে না! মন ভালো নেই বুঝি! দাদার সঙ্গে কিছু হয়েছে নাকি গো? ডলির কথা না শোনার ভান করে বিনতা গ্যাস জ্বেলে চা বসায়। আজ একটু অন্যমনস্ক সে। কেনো যেনো হঠাৎ তার মনে পড়ছে বিয়ের পর প্রথম দিকের দিনগুলোর কথা। শ্বশুর, শাশুড়ি, আইবুড়ো ননদ। ভোর হতে না হতে গৃহস্থালি কাজ, শ্বশুরের ফরমাইশ, শাশুড়ির সাংসারিক জ্ঞান দেওয়া। কী বিতিকিচ্ছি ছিলো সে দিনগুলো। তার মোটেই ভালো লাগতো না। একটু অন্য রকম কাটতো শনিবার সন্ধ্যে থেকে রবিবার সারাটা দিন। সপ্তাহ শেষে বিলাসকে নতুন নতুন লাগতো তার। অনেক বাদ-বিসম্বাদ, মান-অভিমান ও অনেক নাটকীয় ঘটনার পর এই ভাড়াবাড়িতে চলে এসে সে যেনো হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলো। কিছুদিন পরেই অবশ্য তার খারাপ লাগা শুরু হয়েছিলো এখানে। বিলাস ঘরে থাকতে দু’ একটা কথা কিংবা ডলির বকবকানি থামাতে কিছু কথা খরচ করা ছাড়া সারাটা দিন মুখ বুজে একা একা। আজ যেনো হঠাৎ সেই খারাপ লাগাটা বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে প্রথম দিকের সেই দিনগুলোই বোধহয় ভালো ছিলো। কখনোও একা হওয়ার সময় পাওয়া যেতো না। এখানে বিলাস সারা দিনই বাড়ির বাইরে। এখন তো কী এক চেন সিস্টেমের ব্যবসাতে নেমে রাতেরও কিছুটা সময় বাইরে কাটায়। প্রতিবেশী মেয়ে কিংবা বৌগুলোর চোখে চোখ রেখে দেখেছে - সে চোখে কোনো ভাষা নেই। নির্বিকার, অচেনা কিংবা অবাঞ্ছিত। একদিন হঠাৎ বাড়িওয়ালার ছেলে কী এক দরকারে বিলাসের খোঁজ করেছিলো - বৌদি দাদা ঘরে নেই? বোধহয় এখানে আসার পর তার উদ্দেশ্যে অজানা পুরুষের কণ্ঠ শুনেছিলো সেই প্রথমবার। হঠাৎ সে উচ্ছল হয়ে উঠেছিলো। ইচ্ছে করেই একটু বেশি সময় কথা বলেছিলো গোরার সঙ্গে, যার গলার বেসুরো গান রোজ সকালে চা খেতে খেতে শোনে। গোরাও তাকে কিছুটা সময় দিয়েছিলো কিংবা তার শরীরটা জরিপ করতে কিছুটা সময় নিয়েছিলো। বিনতা খুশি না হলেও অখুশিও হয়নি। তারপর কখনো-সখনো গোরা দু’-একবার কথা বলেছে - কী বৌদি ভালো আছেন? কিংবা বাঃ, দারুণ লাগছে তো আজ আপনাকে। প্রথম দিন একটু বেহিসেবি হলেও পরে কখনো গোরার সঙ্গে কথা বলতে সে হিসেবি হয়েছে। গোরাদার চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করেছে। ব্যস, এটুকুই। এর বেশি কিছু নয়। তবুও গোরাদার কাছে সে একটা ব্যাপারে কৃতজ্ঞ, গোরাদা তার একাকীত্বের স্থির জলে ঢিল ছুঁড়ে যেনো জলটাতে ছোট্ট ঢেউ তুলে দিয়েছে। সেই গোরাদাকে নিয়ে কেনো যে আজ এসব স্বপ্ন দেখলো, সেটাই তার মাথায় আসছে না। কোনোদিন সে জ্ঞানত এসব কথা ভাবেনি। ভাবতেও চায় না। তার গ্রামে বেড়ে ওঠা জীবনের চিন্তা ভাবনায়, মানসিকতায় এটা পাপ। কিছু না করলেও শুধু স্বপ্ন দেখাটাই তার মনে পাপের কাঁটা ফোটাচ্ছে। সেই জ্বালাটাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে ভোর বেলায় কিছু না জানিয়ে বিলাসের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া। কত সাত-পাঁচ চিন্তা তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ডলি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলে - এমা! বৌদি তোমার আজ কী হয়েছে বলো তো! চা বসাতেই মনে ছিলো না। যদিওবা চা করলে চিনি দাওনি চায়ে। আরে বাবা! ঘটি-বাটি একসাথে থাকলে ঠোকাঠুকি হয়। মানুষ তো দু’জন। ঝগড়া মানেই জানবে ‘পেরেম’ জমবে ভালো।
বিনতা এক চামচ চিনি ডলির কাপে চামচসহ ঠকাস করে ডুবিয়ে দিয়ে বলে - আঃ! ডলি কী হচ্ছে, কী শুধু বকরবকর! তোকে কে বলেছে তোর দাদাবাবুর সাথে আমার ঝগড়া হয়েছে? চা খেয়ে নিজের কাজ কর। বিনতা ভাবতে থাকে, সে নিজেই ডলিকে মাথায় তুলেছে। প্রথম প্রথম ডলি চুপচাপ কাজ করে চলে যেতো। ডলি বিকেলে বাসন ধুতে এলে বিনতা নিঃসঙ্গতা কাটাতে ওর সাথে এটা ওটা কথা বলা শুরু করায় ওর বাচালতা বেড়ে গেছে।

বিলাস পার্ক থেকে সোজা বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। এখন তার মনজুড়ে বিনতা আর গোরা! আচ্ছা বিনতা স্বপ্নে বলেছিলো - ‘গোরাদা। তুমি আর আসো না তো! আগে মাঝে মাঝে আমার ঘরে চলে আসতে।’ সত্যিই কি গোরা তার ঘরে আসে ওর না-থাকার সুযোগ নিয়ে! বিনতা কোনোদিন এ কথা বলেনি। একদিন শুধু ওর খোঁজে গোরা বিনতার সঙ্গে কথা বলেছিলো, সেও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। এ কথা বিনতা তাকে বলেছিলো। তারপর কি গোরার সঙ্গে মাখামাখি বেড়েছে! সে রকম হওয়ার কথা নয় অবশ্য। এতদিনে বিনতাকে সে যা বুঝেছে...। আসলে গোরা ছেলেটা সুবিধের নয়। ওর উলুক-ঝুলুক স্বভাব আছে বলে শুনেছে। কিন্তু এমনিতে ও যথেষ্ট ভদ্র। তার সঙ্গে সম্মান দিয়েই কথা বলে গোরা। ওকে যদি এখন সে দেখতে পেতো তাহলে ভালো হতো। ওর মনের কথাগুলো জানতে পারতো। ঠিক আছে, কিছুক্ষণ পরই গোরা বেরোবে বাড়ি থেকে। তার আগে বিনতার মনের ভাষাটা একটু পড়ে নেওয়া যাক।

ডলিকে চা দিয়েছে, কিন্তু নিজের জন্য কাপে চা ঢালেনি বিনতা। সে অপেক্ষা করতে থাকে বিলাসের জন্য। নিশ্চয় বিলাস কাছেপিঠে কোথাও গেছে। নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের ব্যাগটা তো নিয়ে বেরোয়নি যে দূরে কোথাও যাবে। ট্যুইশন করতে বেরোনোর সময়ও হয়ে এলো। ওই ঘোড়ার ডিম সাবান, সাবানের ব্যবসাটা শুরু করার পর থেকে ট্যুইশনটাও মাঝে মাঝে কামাই হচ্ছে। ‘ব্যবসা’ বললে ওঁর আবার রাগ হয় - বলে এটা ব্যবসা কে বলেছে? এ হলো এক বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির মেম্বারশিপ নেওয়া। কোনো জিনিস বিক্রি না করলেও চলবে। শুধু তিনজন সদস্য বাড়াতে হবে। আমার দায়িত্ব শেষ। এবার তারা সদস্য বাড়াবে। আামি ঘরে বসে কামাবো। তুমি দেখো না বিনু, দু’ বছরের মধ্যে আমি ভাড়া-বাড়ি ছেড়ে দেবো। নিজের বাড়ি হবে। চাই কি দু’ চাকাও... বলে খ্যাক-খ্যাক করে হাসে। হাসি থামিয়ে বলে - আমি কি এতোই বোকা, ‘চেন’-এ তিনজন নামিয়ে গায়ে হিমজল ঢেলে বসে থাকবো। কোম্পানি থেকে বেশি-বেশি মাল তুলবো। এত বাড়িতে ছেলেমেয়ে পড়াই। তাদের বাড়িতে দু’-একটা করে পুশ করলেই কমিশন প্লাস একস্ট্রা লাভ। বিলাসের চোখে ঝিলিকের কথা মনে পড়ে যায় বিনতার। বিনতার তখন সেটা দেখে ভালো লাগেনি। বিলাস যতোই বলুক - ব্যবসা নয়। এটা তো আসলে ব্যবসাই। ব্যবসা তার কোনোদিনই পছন্দ নয়। বর্ধমানের এক বড় ব্যবসায়ী পাত্রকে সে বাতিল করে বাবার মনে দুঃখ দিয়েছিলো। বিলাসকে অবশ্য এসব কথা বলেনি। বলেছিলো - তুমি শিক্ষক, তোমার আলাদা একটা সম্মান আছে। ওদেরকে এসব বিক্রি করতে গেলে ওদের চোখে তুমি ছোট হয়ে যাবে গো! মুখে কিছু না বললেও ওরা তোমাকে আগের মতো সম্মান দেবে না। আর আমাদের এত টাকার দরকারইবা কী! সরকারি স্কুলে চাকরিটা আছে। দু’ বেলা ট্যুইশনিও করছো। আমাদের ছেলেপুলেও হয়নি এখনো। বিলাস মুখ ঝামটা দিয়েছিলো - তুমি থামো তো! হয়নি বলে কি আর হবে না? নিইনি তাই হয়নি। শহরে ছেলে মানুষ করার খরচ জানো? আর ভাড়া-বাড়িতেইবা কতোদিন থাকবো? এই তো সামনের মাসে এগ্রিমেন্ট শেষ। আবার অ্যাডভান্স দিতে হবে তারপর রি-এগ্রিমেন্ট। মাসে মাসে হাজার টাকা ভাড়া গোনা তো আছেই। আজকালকার দিনে ওসব সম্মান-টম্মানের কোনো মূল্য নেই, বুঝলে? আসল জিনিস হচ্ছে টাকা। যার টাকা আছে তার সম্মান আছে। বিনতা চুপ করে গিয়েছিলো। মনে মনে বলেছিলো - তোমাকে কী করে বুঝাবো যে, আমাদের গ্রামে কোনো অনুষ্ঠান হলে গ্রামের মানুষ আমার বাবাকে সম্মান দেখিয়ে সভাপতি করে নিয়ে যায়, পেনশন না-পাওয়া গরিব রিটায়ার্ড শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও। অথচ গ্রামের সবচেয়ে পয়সওয়ালা বরেণ দত্ত সেই অনুষ্ঠানে সাধারণ শ্রোতা হয়ে সামনে সারি দেওয়া বেঞ্চিতে বসে বাবার ভাষণ শোনেন। শুধুই টাকাই সবকিছু নয়। সেই টাকার পিছনে ছুটতেই কি বিলাস ভোরবেলা কোথাও বেরোলো? নাকি অন্য কোনো কাজে। এসব ভাবতে ভাবতে বিনতা চায়ের কেটলিটা আবার গ্যাসে বসায়। 
দরজায় খটখট শব্দ। ওই বুঝি বিলাস এলো। বিনতা ছুটে গিয়ে দরজা খোলে। না - বিলাস তো নয়। বারান্দায় একজন অচেনা যুবক। বিনতা দু’ পা পিছোয়। যুবকের ভারি গলা - স্যার আছেন? 
- না একটু বেরিয়েছেন। কিছু বলতে হবে?
- বেরিয়েছেন? আমাকে সকালে এই সময়ে স্যার আসতে বলেছিলেন।
- কিন্তু উনি তো... আচ্ছা আপনার নাম?
- আমি প্রলয়। প্রলয় গুপ্ত। স্যার আমার ভাইকে পড়ান। 
গলাটা চেনা মনে হতে ডলি দরজার সামনে আসে। প্রলয়কে দেখে বলে - ও গুপ্তবাবুর ছেলে। আমি ওদের বাড়িতেও কাজ করি। কী গো প্রলয়দা কী ব্যাপার?
- ও ডলি, তুই এখানেও কাজ করিস! আমি স্যারের সঙ্গে একটু...। 
বিনতা বলে - আপনি ইচ্ছে করলে অপেক্ষা করতে পারেন। এখুনি এসে যাবে হয়তো! প্রলয় দরজার বাইরে জুতো খুলে ঘরে গিয়ে বসে। বিনতা কেটলি থেকে এক কাপ চা ঢেলে প্রলয়কে দেয়। প্রলয় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে থাকে ঘরের ভিতর কালার টিভি, ফ্রিজ, আলমারি, বইভর্তি র‌্যাক এবং মাঝে মাঝে আড় চোখে বিনতাকে। 
বিলাস বারান্দায় উঠেই চমকে ওঠে। দরজার সামনে এক জোড়া জুতো। ছেলেদের। কে আবার এলো সাত সকালে। ভোরবেলায় সে যখন বেরিয়ে গেছে তখন বিনতা ঘুমাচ্ছিলো। এর মধ্যে তার না থাকার সুযোগে বদমাইস গোরাটা ঢুকেছে নাকি ঘরে! তা যদি হয় তাহলে দুটোকেই আজ ‘মার্ডার’ করে ফেলবে, তারপর যা আছে কপালে। দরজায় কড়া নাড়তে গিয়েও বিলাস থেমে যায়। দরজার ফুটোতে কান লাগায়।
বিলাস না আসায় বিনতা নিজের কাপে চা ঢেলে নেয়। ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে প্রলয়কে জিজ্ঞেস করে - আপনি কী করেন? প্রলয় হালকা হাসে তেমন কিছু করি না। বেকারই ধরতে গেলে। তাই স্যার বলেছিলেন কী একটা ব্যবসার কথা বলবেন। প্রচুর লাভও আছে নাকি! ও ব্যাপারেই আমাকে আজ আসতে বলেছিলেন। 
বিলাস শুনতে পায় ঘরের ভিতর পুরুষ কণ্ঠ। তার মনে যেনো আগুন ধরে যায়। দরজায় কড়া নাড়ে খুব জোরে, খটখট-খটখট! বিনতা চায়ের কাপ হাতে এসে দরজা খোলে, বিলাসকে দেখে তার চোখে একরাশ প্রশ্ন। বিলাসের চোখে আগুনের ফুলকি। বিনতাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে সে। প্রলয় ততক্ষণে চায়ের কাপ রেখে উঠে দাঁড়িয়েছে।
- গুড মর্নিং স্যার। 
বিলাসের মুখে কোনো কথা বেরোয় না।
- স্যার আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন সকালে।
বিলাস নিজের মধ্যে নিজেকে ফিরে পায় যেনো! বলে - হ্যাঁ বসো, কতক্ষণ এসেছো?
- এই মিনিট পাঁচেক হলো।
বিলাসের মনে পড়ে যায় নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের চেনে প্রলয়কে নামতে কনভিন্স করার জন্য ওকে আসতে বলেছিলো। 
বিনতা বিলাসের ব্যবহারে চমকে ওঠে। এমন তো কখনো করে না। সে হতভম্ব হয়ে দরজার সামনে দাঁড়ায়। প্রলয়কে ঘরে বসতে বলায় ও কি রাগ করেছে? নাকি অন্য কোনো সমস্যা? দেখেও কেমন-কেমন লাগছে! বিলাসকে চা দেওয়ার কথাও ভুলে যায় বিনতা। বিলাস প্রলয়ের দিকে তাকায় পূর্ণদৃষ্টিতে। ওকে নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য প্রস্তুতি নিতেই হয়তোবা। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। প্রলয়ের মনের মাঝের ভাবনাটা ওর মাঝে চলে আসে - বাঃ, মাস্টার ভাড়া বাড়িতে থাকলেও মালদার পার্টি আছে। ঘরে কালার টিভি, ফ্রিজ, মিউজিক সিস্টেম কী নেই! বৌটাও খাসা। সরেস জিনিস। দেখি কী ব্যবসার কথা বলে মাস্টার! যাই হোক লটকে যাবো। তাহলে পিসটাকে মাঝে মাঝে মাপা যাবে। ওর হাতের মিষ্টি চায়ের কাপে চুমু খাওয়া যাবে। খেলোয়াড় তো আমি কম পাকা নই। তেমন তেমন সিগন্যাল পেলে...।
বিলাসের রগের শিরা ফোলে। হাতের মুঠি শক্ত হয়। চোখদুটো যেনো বাঘের চোখ। সহসা সে চিৎকার করে ওঠে - বেরিয়ে যাও ঘর থেকে। প্রলয় চমকে ওঠে। বিনতা ভয় পায়। ডলি কলঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে। 
- কী হয়েছে বৌদি? দাদাবাবু রাগারাগি করছে কেনো?
বিনতা আস্তে আস্তে নিজের মনেই যেনো বলতে থাকে - কী জানি - মানুষটার কিছু গ-গোল হলো কি না - ঠাকুর এ তুমি কী করলে! প্রলয় দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে মাস্টারকে দেখে হয়তোবা ভয় পেয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বিলাস হঠাৎ তার নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়।

বিনতা ও ডলি একে অপরের দিকে চেয়ে চোখের ভাষা বুঝার চেষ্টা করে।

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

গল্প >> খাঁচা : আবদুল হাই মিনার

খাঁচা

আবদুল হাই মিনার

গরমপানির কাছাকাছি আসতেই সকাল গড়িয়ে দুপুর।
জলপাইগুড়ির রাস্তাগুলো এদিকে ততো সুবিধের না। পাহাড়ের ঢালে আর টিলার কোলের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা উঁচু-নীচু রাস্তা। ঝাঁকুনিতে  গাড়ির  যেমন  জান  বেরিয়ে  যাওয়ার  জোগাড়,  তেমনি মানুষেরও। মাঝখানে কতোগুলো চা-বাগান পড়েছিল পথের মাঝে। অইটুকু পথে ওদের গাড়ি   যেন উড়ছিল। খুব ভালো লেগেছিল জায়গাটা পেরোতে। নিশ্চয় চা-বাগানের বাবু সাহেব আর শ্রমিকরা খুব যতœ-আত্তি করে সড়কগুলোর! ফেব্রুয়ারির এই ঝলমলে সকালে বুবুনরা যখন শিলিগুড়ির ঝুমরাতি থেকে রওনা দিয়েছিল বাতাসে তখনো হিমের ভাব মিলোয়নি। এদিককার লোকজন শীতকে বলে জাড়। তো, রাস্তায় জাড়ের একটুও কমতি ছিল না সকাল দশটা পর্যন্ত। শিরীষ-মেডেলা আর চাপালিশের গায়ে কুয়াশার চাদর লেপ্টে ছিল সিগারেটের ধোঁয়ার মত। বানর আর হনুমানের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো খেলছিল রাস্তÍার ওপর। কেমন দুষ্টু একেকটা! মানুষজন বা গাড়ি-ঘোড়াকে যেন তাদের মোটেই ভয় নেই। বরং বুবুন আর সোনমকে ভেঙাচ্ছিল তাচ্ছিল্যভরে। দুপুর গড়ানোর আগেই সব কিছু বদলে গেল। ওম ওম গরম বাতাস বইতে লাগল বনের মাথার ওপর দিয়ে। ছোট ছোট জঙ্গলি জন্তু-জানোয়ারের জায়গায় বুনো হাতি আর মোষের দেখা মিলতে লাগল পথের ধারের বনে আর নালা-ঝরণার কিনারগুলোয়। আরো কত দূর যাওয়ার পর পাতার ফাঁকে ফাঁকে লোকজনের বসতবাটিও চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। শন-ছাওয়া মাটির কুটির। গরু-ছাগল আর ভেড়া নিয়ে রাখালছেলে মাঠে বেরিয়েছে। লাল মাটির পথে মানুষের যাতায়াতও চোখে পড়ার মত। ছোট্টো একটি মেয়ে পাহাড়ের ঢালের টলটলে জলের ঝরণায় হাতমুখ ধুচ্ছে।
বুবুনের বাবা বললেন,- ‘এ’টা হল গিয়ে পশ্চিম দিনাজপুর। আধঘণ্টা আগে আমরা শিলিগুড়ি পেরিয়ে এসেছি। আর, ওই যে, ওই পূবদিকে দেখ, ফাঁসিদেয়া, ওটা বাংলাদেশ। ওই যে           বর্ডার!’
বুবুন আর সোনম গাড়ির কাঁচ নামিয়ে পূবের দিকে তাকাল। কতগুলো ঘর-বাড়ি দেখা গেল। আর সেগুনের বন। রাস্তাটা ধূলায় ধূলাক্কার!
মা বললেন,- ‘ওফ্, ধূলার জ্বালায় বাঁচি না! কাঁচ তোল্, আমার চোখ জ্বালা করছে।’
ওরা তাড়াতাড়ি কাঁচ উঠিয়ে নিল। বাংলাদেশ দেখা হল না ভাল করে।

দু’দিনের কড়ারে বাবাসহ বুবুনের মায়ের বাপের বাড়ি বিধাননগর যাচ্ছে ওরা। একদিন আগে ওরা ছিল দার্জিলিং। সেখান থেকে যাত্রা শুরু করে কার্সিয়ং পাংখাবাড়ি হয়ে শিলিগুড়ি এসে পৌঁছেছিল। রাত্রিবাস গার্গীকাকী আর সেজকাকুর জাঙ্গল-কাটেজে। রাত্তিরে মুগডালের খিঁচুড়ির সাথে হরিয়ালের রোস্ট, আর ভেড়ার মাংসের ভুনা দেয়া হয়েছিল খাবার টেবিলে। বুবুনের মা বললেন,- ‘ভেড়ার মাংস না ছাই, আসলে-’ তারপরই গার্গীকাকীর চোখ টেপায় চুপ করে গেছিলেন। বুবুন সোনমরা বুঝতে পেরেছিল আসলে হরিণের মাংসই খাওয়া হচ্ছে। আইনের মানুষ তাদের বাবাও আইন অমান্য করে আগ্রহভরে সেই মহার্ঘ মাংস খেয়ে চলেছিলেন।

একটু পরেই ওরা দেখে কী, রাস্তাটা দু’ভাগ হয়ে দু’দিকে চলে গেছে।
বুবুনদের গাড়ি আগে আগে চলছিল। পেছনে আসছিল ওদেরকে এস্কর্ট করে আসা পুলিশের পিকআপ ভ্যান।
গাড়ি বাঁয়ের সড়কে পড়তেই পেছন থেকে ড্রাইভারকে জানান হল ওটা সঠিক পথ নয়। ডানের সড়কে চল।
গাড়ি পিছিয়ে এসে আবার ডান দিকে চলতে লাগল।
কতদূর যাওয়ার পর এক অদ্ভুত দৃশ্য ওদের চোখে পড়ল।
সার বেঁধে একদল লোক কোথায় যেন চলেছে। অসংখ্য লোক।
মা বললেন,- ‘পিঁপড়ের সারি!’
‘সামনেই মেলা-টেলা আছে বোধহয়।’ বাবা বললেন।
কিন্তু আরো অনেকদুর আসার পরও কোন মেলা বা সভা সমাবেশের পাত্তা পাওয়া গেল না! লোকগুলো চলেছে তো চলেছেই, থামাথামির নাম নেই।
ওদের যেন বিরামহীন পথ-চলা!
ওরা কোথাও থামবে না, ওদের ক্লান্তি নেই। পৃথিবীটা যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে সেখানে গিয়ে বুঝি ওদের পথ-চলা থামবে।
বাবা ভারি অবাক হয়েছেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে আছে।
মা বললেন,- ‘চলেছে কোথায় ওরা, আশ্চর্য তো!’
‘গাড়ি থামিয়ে একটু খোঁজ নেয়া যায় না?’ বুবুন বলল।
ড্রাইভার একটুকু ঘাড় ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকাল। গাড়ি থামাবে কি না, তারই অনুমোদন- প্রতীক্ষা।
বাবা বললেন- ‘হ্যাঁ, গাড়ি থামাও। ব্যাপার কী জিজ্ঞেস কর!’
জিজ্ঞেস করায় জানা গেল, চলেছে ওরা আব্বাস আদমের ডেরায়, খাঁচা দেখতে।
‘খাঁচা!’ বাবার চোখ কপালে উঠল।
মা বললেন- ‘খাঁচা দেখতে এ’ভাবে সার বেঁধে, পাগল নাকি! কিসের খাঁচা!’
কিন্তু লোকগুলো আর কিছুই বলছে না, জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে ছুটছে তারা আঙরাবাড়ির দিকে। সেখানেই আব্বাস আদমের ডেরা।
বাবা ড্রাইভারকে আরেকটু তথ্য-তালাবি করতে বললেন। ড্রাইভার অনিন্দ্য সুর আসামের গোয়ালপাড়ার মানুষ, এদিককার ধুর-ধার বোঝে ভাল। অনেক ঝুলাঝুলি করল লোকগুলোর সাথে, কিন্তু নূতন আর কোন তথ্য ওদের কাছ থেকে আদায় করতে পারল না।
‘আঙরাবাড়িটা কোথায় জানা যাক।’ বাবা বললেন। ‘কাছাকাছি হলে একটা চক্কর মেরে আসা যাবে। কি অদ্ভুত কা-, খাঁচা দেখতে মানুষ এ’ভাবে ছুটতে পারে ভাবা-ই যায় না!’
মাও চোখ কপালে তোলে বললেন,- ‘কি অশৈলী কা-!’
বুবুন আর সোনমের পোয়াবারো। মাঝপথে একটু থামা যাবে, হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খাওয়াও চলতে পারে। আরো কত মজা যে পথের মাঝে লুকিয়ে আছে কে জানে।
গাড়ি এবার চলল আঙরাবাড়ির পথে। মাত্র একটুখানি পথ। মিনিট দশেকের মাথায় গাড়িটা হড় হড় করে নেমে এলো একটা নাবাল মত জায়গায়।
সামনেই সারি সারি ঘর। বিরাট গাঁও। লোকজনে থিক থিক করছে। খাঁচা-দেখতে-আসা তামশগির জনতার ভিড়ে গ্রামটা নরক।
মা নাক সিঁটকে বললেন- ‘এম্মা, এ’ কোথায় নিয়ে এলে গো!’
বাবা কিছু না বলে গাড়ি থেকে নামলেন। তাঁর চোখেমুখে অঘোর বিস্ময়! বুবুন আর সোনমও নামল। ড্রাইভার অনিন্দ্য ওদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। ওদের গাড়ির পেছনে ততক্ষণে পুলিশের পিকআপ ভ্যানখানাও এসে থেমেছে। তামশগীর জনতা পুলিশ দেখে একটু যেন ভয় পেয়েছে। তাদের হৈ-হল্লা থেমেছে।
গাঁয়ের পথে একটুখানি এগিয়ে যেতেই বেশ ফাঁকা একটি জায়গা চোখে পড়ল। সেই ফাঁকা জায়গা ঘিরে সার বেঁধে তামশগির মানুষের ভিড়। এখানে এই মানুষগুলো নিস্তব্ধ। চুপচাপ তারা অবাকবিস্ময়ে তাকিয়ে আছে বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরী অর্ধসমাপ্ত বে-ধারা ধরনের বিশাল এক     খাঁচার দিকে। অন্তত শ’ চারেক হাত দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বেড় দিয়ে খাঁচাটা আস্তে আস্তে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। মুরগির খাঁচা! আব্বাস আদম ও তার বউ-ছেলেমেয়েরা আড়াইমাস ধরে খাঁচাটা বানাচ্ছে।
আব্বাসের বউ, আর আব্বাস নিজে, আর, তার ছেলেমেয়েরা একটুকু খচ্চর। নোংরা থাকে, খাওয়া-দাওয়ারও বাছ-বিচার নেই। মোরগ পোষে। প্রথমে অল্প ক’টা মোরগ নিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। দেশি মোরগ। পরে টার্কি সাওতি মোরগে ঘর ভরে গেল। এ’গুলোর স্থান সংকুলান অসম্ভব হয়ে উঠল। পাড়ায় গ্রামে লোকজনের ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়তে লাগল মোরগগুলো। লোকজন অতিষ্ট হয়ে উঠল। পাড়া-পড়শির সব্জিবাগান, ফুলবাগান আর বসতঘরের ভেতরেও তাদের অবাধ যাতায়াত! উচিত ছিল আব্বাসের তাৎক্ষণিকভাবে মুরগির সংখ্যা কমিয়ে আনা! তা’ না করে হারামজাদা মুরগি আরো বাড়িয়ে চলল।
মুরগির উৎপাতে পড়শিরা বে-ক্বারার! এ’ নিয়ে হাজারো নালিশ-ফরিয়াদ আর কাজিয়া ফসাদ হয়ে গেছে আগে। সালিশ বসেছে শতবার। শেষে বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্তটা নিতে হল আব্বাসকে। একটা বিশাল খাঁচা বানাবে সে। সবগুলো মুরগিকে সেই খাঁচায় ভরে ফেলবে। খাঁচার ভেতরেই তাদের খাওয়া-দাওয়া, হাগু-মুতু, জন্ম-মৃত্যু চলবে।
হিসেবটা মাথায় রেখে ডিসেম্বরের এক বিষণœ সকালে বউকে সাথে নিয়ে খাঁচার কাজ শুরু করেছিল আব্বাস আদম। সেই খাঁচা এখন প্রায় তৈরী।

বুবুনের বাবা একটু দূরে দাঁড়িয়ে খাঁচা বানানো দেখছিলেন। ঠিক যে দেখছিলেন তা’ অবশ্যি নয়। তিনি তখন অন্যমনস্ক। আইডিয়াটা তাঁর মাথায় পিন ফোটাচ্ছে। সংখ্যায় বেড়ে গেলে এ’ভাবেই তো মুরগিগুলোকে খাঁচায় ভরে ফেলতে হয়। তা’ হলে?
চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইলের এতটুকুন এক দেশ, তার জনসংখ্যা দেখ!
বুবুনের বাবা প্রতিবেশী বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবনায় বুঁদ হয়ে গেছেন তখন।
এই ঊনিশ শ’ নব্বুইতেই যদি বারো কোটি মানুষে ভরে যায় দেশ তা’হলে আরো পঁচিশ বছর পর কী হবে? বিশ কোটি! তাঁর মাথা ঝিম্ ঝিম্ করতে লাগল। ভয়ঙ্কর ! মহা ভয়ঙ্কর! ভারতের জন্য মোটেও ভাল খবর নয় এটি। এখন রোজদিনই শত শত বাংলাদেশি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়ছে। পঁচিশ বছর পর অবস্থা কি দাঁড়াবে! যখন তাদের জনসংখ্যা বিশ কোটির ওপরে উঠবে?
আব্বাস আদমকে হাত ইশারায় ডাক দিলেন তিনি।
আদম ইতস্ততঃ করছিল, আসবে কি আসবে না। সময় নষ্ট করার সময় তার হাতে নেই। একজন অতি উৎসাহি তামশগির দৌড়ে গিয়ে তার কানে কানে কী বলল। আব্বাস যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল। এক লাফে খাঁচা থেকে নেমে দৌড়ে বুবুনের বাবার কাছে এসে হাত জোড় করে দাঁড়ালো।
বুবুনের বাবা কেন্দ্রীয় সরকারের সরাষ্ট্র সচিব, সেটি ততোক্ষণে চাউর হয়ে গেছে। সবাই সমীহভরে তাঁর দিকে তাকাচ্ছে।
‘খাঁচার পুরোটাই বন্ধ করে দেবে নাকি?’ আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘ওপরের দিকে একটুকু খোলা থাকবে।’ হাত কচলে জানালো আব্বাস।
‘বেঁচা-বিক্রির জন্য মুরগি ধরে আনতে অইটুকু খোলা রাখতে হয়।’
‘যদি উড়ে যায়?’
‘গেলে যাবে, তার আর চারা নেই, সাহেব।’
বুবুনের বাবা নির্নিমেষ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন, শেষে ছোট্টো একটা শ্বাস     ফেললেন।
‘তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আব্বাস, অসংখ্য ধন্যবাদ।’ তিনি আব্বাসের হাত আঁকড়ে ধরলেন। তাঁর চোখেমুখে কৃতজ্ঞতার চিহ্ন।
আব্বাস আদম হতবাক। এ’ ভদ্রলোক এ’ রকম করছেন কেন! সে তো তাঁর কোন উপকারই করেনি! বলল-
‘সাহেব, আমি তো আপনার কোন উপকারই করলাম না, তবে কেন ধন্যবাদ দিচ্ছেন?’
‘তুমি জানো না আব্বাস, শুধু আমার নয়, তুমি সারা ভারতের বিরাট উপকার করেছো, বিরাট উপকার, ওহ্- ’
তিনি উত্তেজিত স্বরে ড্রাইভার অনিন্দ্যকে গাড়ি ঘোরাতে বললেন।

গাড়ি বিধাননগরের দিকে চলছিল, বললেন,- ‘বিধাননগর নয়, বাগ-ডোগরা এয়ারপোর্ট। দু’ ঘন্টায় বাগ-ডোগরা পৌছাতে হবে। গরুঢ়ের ফ্লাইটটি তা’হলে ধরতে পারব।’

রাত্রেই দিল্লী পৌছে গেছিলেন বুবুনের বাবা।
জরুরী ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি মিটিং ডাকলেন তিনি।
বিশাল এক খাঁচা তৈরীর জন্যে এ’ মিটিং! বাংলাদেশের চারদিক ঘিরে কাঁটাতারের খাঁচা!

গল্প >> দৃশ্যপট : মুজাফফর আলী তালুকদার

দৃশ্যপট

মুজাফফর আলী তালুকদার


- ঠুক্ ঠুক্ ঠুক্ -
দরোজায় টোকা দেওয়ার শব্দ
- কে?
- দুয়ার খুলেন মাদবর সাব। আমি গনি।
কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার রাত। বাইরে বৃষ্টি ঝরছে টুপ টুপ করে। গা ছমছমে পরিবেশ। প্রায় শব্দহীনভাবে দরজা খুলে গেলো। ভিজে কাপড়ে ঘরে ঢুকলো গনি আর ছাত্তার। ওদের দিকে তাকিয়ে বাহাজ মাদবর বিস্ময়ে বলে উঠলো - কী খবর গনি?
- রাইত কয়ডা সাব?
হারিকেন উঁচু করে টেবিল ঘড়িটার দিকে চেয়ে বাহাজ মাদবর বললো - বারোটা। তা হোক, আগে খবর ক’!
- কেল্লা ফতে, মাদবর সাব!
- ফতে?
- হ, এহেবারে সাবাড়।
- লাশ কোথায়?
- নোজঙ্গের মোড়ে, পাচমুড়া বিলের পানার নিচে। একটু নড়ে উঠে গনি। গামছা দিয়ে ভিজে মাথা মুছতে মুছতে বলে - নেইন, টেহা দেইন। সেকেন্ড শো ভাঙবো এহন। হইটালে নাম ডাইরি করছি। ছোৎ কইরা যামু গা। কাপড় বদলান নাগবো।
মাদবরের কাছে এসে দাঁড়ায় ছাত্তার। ফিসফিস করে বলে - বিশ্বাস অয় না মাদবর চাচা? গনি তো কিছুই করে নাই। আমিই তো বেবাক করছি। মাথার মধ্যে নোয়ার ডাং দিয়া এছা বাড়ি দিছিলাম-এক্কো বাড়িতেই খলিল চেরমেন পইড়া গেলো।
বাহাজ মাদবর ছাত্তারের মুখটা চেপে ধরে - আরে-র-। কথা কইছ না, হালার পো হালা। কেউ হুনবো।
হারিকেন উঁচু করে পকেট থেকে আলমারির চাবিটা বের করে আনে বাহাজ মাদবর। তারপর তালা খুলে দু’জনের সামনে দু’ শ’ টাকা ধরতেই মাথা নেড়ে উঠে গনি - না মাদবর সাব, বেবাক টেহা একবারেই দিয়া দেইন। বাহি থুমু না এহন।
রেগে উঠে বাহাজ মাদবর - কী কইলি?
- কইছি মাদবর সাব। ঠিকই কইছি।
- এতো রাতে কেউ ঘর থিকা টেহা দেয় রে চুতমারানির পো!
প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে ছাত্তার - গাইল পারবাইন না মাদবর চাচা। কাম কইরা টেহা চাইছি। তাড়াতাড়ি করেন। সোময় নাই।
মুহূর্তে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে বাহাজ মাদবর - যাবি গা - যা - যা এহন। পরে আবি।
ঘুরে দাঁড়ায় ছাত্তার - মাদবর চাচা, কামডা বালা অবো না কইলাম। কাম শেষ অইলেই বাহি বেবাক টেহা একবারেই দিবার চাইছুন। এহন আবার বামছাম করুন ক্যা?

টর্চ লাইটের তীব্র আলো মাদবরের মুখের উপর ফেলে হঠাৎ ঘরটা উদ্ভাসিত করে দেয় ছাত্তার।
বাহাজ মাদবরের উত্তেজিত দেহটা কেঁপে উঠে - ছত্তাইরা! বাড়াবড়ি করিস না।
- তাড়াতাড়ি বিদায় করেন চাচা।
- চুপ। যা - বাইর হইয়া যা।
- টেহা ছাড়াই?

দ্বিতীয়বার ছাত্তারের হাতের টর্চ জ্বলে উঠতেই থাবড়া দিয়ে তা ধরে ফেলে বাহাজ মাদবর - শুয়োরের বাচ্চা আমার মুখের উপর কথা।
ছাত্তারের মুখে ঘুষি লাগিয়ে দেয় বাহাজ মাদবর।
এ দৃশ্য দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলো না গনি। মাথায় রক্তে উঠে গেলো। হাতটা চলে গেলো তার কোছের কাছে। শক্ত একটা প্রতিশোধাকাক্সক্ষা উন্মাদ করে দিলো তাকে। সঙ্গে সঙ্গে কোছে গোঁজা ছোড়াটা বসিয়ে দেয় বাহাজ মাদবরের বুকে - শালা হারামির পয়দা।
চোখের নিমেষেই ঢলে পড়লো বাহাজ মাদবরের বেঁটে দেহটা।
একটা গোঙানি। ধপাস শব্দ।

আবারও জ্বলে উঠলো ছাত্তারের টর্চ।

আরেকটি শব্দ, আলমারি খোলার।

রবিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১০

বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১০

ভিনদেশী সাহিত্য >> আকাশে চারটি তারা : আহমাদ নদীম কাসমী (ফায়যুর রাহমান)

আকাশে চারটি তারা

আহমাদ নদীম কাসমী (ফায়যুর রাহমান)

ঘর থেকে মসজিদে যাওয়া-আসা ছাড়া আর কোনো কাজ ছিলো না মিয়া হানিফের। তার বাড়িতে একটি মাত্র ঘর। ঘরটিও বেশ লম্বা। পুরো ঘরে দরোজা একটাই। মাঝখানে। ছাদে গোলাকৃতির একটি ছিদ্র, যেনো ম্যানহোল। বর্ষাকালে মিয়া হানিফ এই ছিদ্রটি পাকা মাটির ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করে দেয়। স্থানীয় ভাষায় এই ছিদ্রকে বলে ‘মুখা’। দরোজা যখন বন্ধ থাকে, তখন বাইরের জগতের সঙ্গে মিয়া হানিফের যোগাযোগের মাধ্যম ওই ছিদ্রই। দিনের বেলায় ওই ছিদ্র দিয়ে আলো-বাতাস আসে। রাতের বেলা মিয়া হানিফ শুয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকায়, তারা খোঁজে ওই ছিদ্র দিয়ে। তার ধারণা, ছোট্ট এই ঘরে একাকি বসবাস করলেও সে আসলে একা নয়। আকাশের তারাগুলো তার বন্ধু। শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসের প্রতি সে ভয়াবহ বিরক্ত, কারণ বৃষ্টির জন্য এ সময়টাতে ছাদের ছিদ্রটি ঢেকে রাখতে হয়। যখন তার তারা দেখার তেষ্টা জাগে খুব, তখন ঢাকনাটি সরিয়ে দেখে, আকাশের তারাগুলো মেঘে মেঘে ঢেকে আছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে সে নিমগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ওই ছিদ্র দিয়ে কোনো তারা দেখতে না পেলে সে অস্থির হয়ে পড়ে। তখন খাটখানা এদিক-ওদিক সরিয়ে শোয়। শুয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকায়। তারা খোঁজে। অনেক চেষ্টার পর ছোট্ট একটি তারা যখন তার দৃষ্টিগোচর হয়, খুশিতে আত্মহারা হয় সে। যেনো স্রষ্টার সাক্ষাৎ পেয়েছে। তখন মনে মনে বলে, ‘বন্ধু তোমাকে দেখার জন্য সারাটা আকাশ ঘুরে এলাম, আঁতিপাতি করে খুঁজেও তোমাকে পেলাম না। এবার যখন পেলাম, তবে আর পালিয়ে যেও না, আমি তোমাকে প্রাণভরে দেখবো, নয়তো আমার ঘুম আসবে না।
ঘরের মাঝখানে একটি তাক। ওখানে সে গম রাখে। কয়েক বিঘা জমি আছে মিয়া হানিফের। বর্গা চাষিরা বছর শেষে তার পাওনা গম বাড়িতে পৌঁছে দেয়। গম ছাড়াও তাকের ওপর সে রাখে পানির একটি হাতলবিহীন পানপাত্র। আর একটা মাটির প্রদীপ। প্রদীপের সলতেটা সারাক্ষণই কেরোসিনে ডুবে থাকে। মিয়া হানিফ এশার নামাজের পর ঘরে ফিরে প্রদীপটা জ্বালায়। তারপর দরোজা বন্ধ করে খাটে বসে সুরেলা কণ্ঠে কুরানের শেষ পারার পনেরটি সুরা পড়তে থাকে। এই সুরাগুলো সে নামাজেও পড়ে। নামাজ ছাড়াও ঘরে বসে বারবার পড়ে। মাথা দুলাতে দুলাতে পড়ে। এক সময় দেয়ালের খুঁটিতে ঝোলানো তসবি নিয়ে বিড় বিড় করে কালেমা তৈয়ব আওড়ায়। ক্লান্ত হলে খাটে শুয়ে পড়ে, আর ছাদের ছিদ্র দিয়ে আকাশের নক্ষত্র খোঁজে। হঠাৎ যখন একটি নক্ষত্র তার চোখে পড়ে, সে এতোই খুশি হয় যেনো স্রষ্টার দর্শন পেয়েছে।
কৈশোরে মিয়া হানিফ মাদরাসায় আট কেলাশ পর্যন্ত পড়েছে। কুরানও মুখস্থ করেছে। যৌবনে তার বিয়ে হয়েছিলো। এক বছর পর সন্তান প্রসবের সময় স্ত্রীর মৃত্যু হয়। নবজাতকও হয় মৃত। এই ঘটনার পর পৃথিবীর উপর থেকে মন উঠে যায় মিয়া হানিফের। সবকিছু ছেড়ে দেয় সে। শুধু আল্লাহর সাথে সংযোগ রক্ষায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে। তার আত্মীয়-স্বজনরা এলাকার বিখ্যাত পীরের কাছে তাকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। তাদের ধারণা, পীরের কাছে মুরিদ হলে তার জীবনে একটা গতি আসবে। নিজেকে সামলে নিতে পারবে। কিন্তু মিয়া হানিফ রাজি হয় না। বলে, আমার পীর রাসূলুল্লাহ। তিনি সবচে’ বড় পীর, দুনিয়ার পীরেরা  আমার রসুলের উপর নির্ভরশীল, তিনিই আমাকে মাওলার কাছে পৌঁছে দেবেন।
এক পৌষ মাসে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিলো। এক নাগাড়ে কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছেই, ছাড়বার নাম নেই। ছাদের ফাঁক ফোকর চুঁইয়ে বৃষ্টির পানি ঘরের মেঝেতে পড়ছিলো। ঘরের যেখানেই বৃষ্টির পানি পড়ে, মিয়া হানিফ সেখানেই বাসন-কোসন, পেয়ালা-পাতিল বসিয়ে দেয়, যাতে পানির ফোঁটায় মেঝেতে গর্ত সৃষ্টি না হয়। এ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে টপটপ করে যখন বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে, তখন বৃষ্টির ফোঁটাকে মিয়া হানিফের মনে হয় মধুর শব্দ। একেকটা পাত্রে পানির ফোঁটার শব্দ হচ্ছে একেক রকম, আর সব ক’টি শব্দ মিলে সৃষ্টি হচ্ছে জলতরঙ্গের মতো সুর। মিয়া হানিফ এই শব্দ শুনে মুচকি মুচকি হাসে। সে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানায় তার উপর দয়া করার জন্য। কারণ, ছাদ থেকে ঘরের সবখানে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, কিন্তু কী আশ্চর্য, তার খাটখানা অক্ষত। এক ফোঁটা পানিও তার বিছানায় পড়েনি। সে এ জন্য আনন্দিত। ভাবে, সৃষ্টিকর্তা তার অনুগত বান্দাকে নিশ্চয়ই দেখছেন, সে ঘর থেকে মসজিদ আর মসজিদ থেকে ঘর ছাড়া কোথাও যায় না, সবসময় তার জিকিরে ব্যস্ত থাকে। নিশ্চয়ই তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানে তার অনুগত বান্দা ভোরের আযান পর্যন্ত ঘুমোয়, সেটা যেনো বৃষ্টি থেকে অক্ষত থাকে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ে।
মধ্য রাতে হঠাৎ বিকট শব্দে তার ঘুম ভাঙে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। তার মনে হয় রোজ কেয়ামত এসে গেছে। সে কালেমা তৈয়ব পড়তে থাকে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিজলির আলো ঘরে আসছে খানিকটা। সে খাট থেকে নেমে তাকের উপর রাখা বাতিটা খুঁজতে যায়। ঘরের মাঝখানের খুঁটিটা পেরিয়ে ওপাশে গিয়ে দেখে সবকিছু ভিজে একাকার। ঘরের ভিতরে বৃষ্টির ধারা এলো কী করে - মিয়া হানিফ ভেবে পায় না। আবার বিদ্যুৎ চমকালে দেখলো ছাদের অর্ধেকটা ভেঙে পড়েছে। সে বিড়বিড় করে বলে, মাওলা, তুমি এ কী করলে? তোমার নতজানু বান্দার সাথেও একই ব্যবহার করলে, যা অন্যদের ব্যাপারে মানায়!
সে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে খাটে গিয়ে বসে। ভয়ে কাঁপছিলো সে। এবার বলে, মাওলা আমার, খামাখাই তোমাকে অভিযুক্ত করলাম, তোমার দেওয়া বৃষ্টিতে ছাদের একাংশ ভেঙেছে তো কী হয়েছে, অন্য অংশ তো এখনো অক্ষত, যার নিচে তোমার অনুগত বান্দা শুয়ে আছে। তুমি মানুষকে দেখিয়েছো, পুরো ছাদ ভাঙার দরকার নেই, পৃথিবীর বুকে এখনো অনুগত বান্দারা আছে, তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নও তো আছে। তোমার প্রিয় বান্দাকে তাই নিরাপদে রেখেছো। তোমার রহস্য কি সবাই বুঝতে পারে?
দূর থেকে ভোরের আযান ভেসে আসে। মসজিদ তেমন দূরে না। তবু প্রবল বৃষ্টির কারণে আযানের ধ্বনি ভালোমতো শোনা যাচ্ছিলো না। মনে হচ্ছিলো, বহুদূর থেকে আযানের সুর আসছে। আযান শেষ হলে মিয়া হানিফ দোয়া পড়লো। তারপর গায়ে চাদর দিয়ে বৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষার জন্য ছাতা নিয়ে বের হলো। দরোজায় তালা লাগাতে গিয়ে তার মনে হলো, ছাদ যেখানে ভেঙে পড়েছে, সেখানে তালা লাগানোর দরকার কী। তবু সে তালা লাগালো। গলিতে পানি জমেছে। সে পানি ভেঙে মসজিদে গিয়ে ছাতাটা এক পাশে রেখে দেয়। মসজিদের টেপে অজু করে। জামাতে শামিল হয়। নামাজের পর ইমাম সাহেব দোয়া করেন, ‘ইয়া এলাহি, আমাদের রক্ষা করো, আমরা গরীব, আমাদের বাড়িঘর কাঁচা, বৃষ্টির পানি আমাদের বাড়িঘর গিলে খাচ্ছে, এবার বৃষ্টি থামাও হে খোদা’।
মিয়া হানিফ বেশ শব্দ করে বলে, আমিন। তার শব্দে মসজিদে গুঞ্জন সৃষ্টি করে। ইমাম সাহেব ও মুসল্লিরা তার দিকে তাকায়। দোয়ার পুনরাবৃত্তি চলে, ‘বৃষ্টি থামাও’।
মিয়া হানিফ এবার গর্জে উঠে - আমিন।
‘বৃষ্টি থামাও’।
মিয়া হানিফের জোর গলা - আমিন।
সমবেত মুসল্লিরা মিয়া হানিফের দিকে তাকায়। তারা হয়তো ভাবে, স্বল্পভাষী এই লোকটার কী হলো আজ। তার আমিন উচ্চারণের শব্দ যেনো মসজিদের ছাদ পেরিয়ে ওপাশে চলে যাচ্ছিলো। দোয়ার পর ইমাম সাহেব বললেন, দোয়ায় আমিন বলা বিধিসম্মত, কিন্তু এতো জোরে বলার কী দরকার ছিলো।
মিয়া হানিফ বলে, মৌলভী সাহেব, এটা আমার মাওলার কারবার। তারপর সে বিড় বিড় করে বলে, হে প্রভো, হে খোদা, একি তোমার খেলা! উপস্থিত মুসল্লিরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। মিয়া হানিফ ভেজা চাদর গায়ে দিয়ে ছাতা নিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়। সূর্যোদয় হয়েছে কিন্তু আবছা অন্ধকার এখনো লেগে আছে। আকাশে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। টপ টপাটপ বৃষ্টি পড়ছে। মিয়া হানিফ গলির হাঁটু পানি ভেঙে যেই ঘরের দুয়ারে এলো, অমনি মুষলধারে বৃষ্টি শুরু। সে তালা খোলার জন্য হাত বাড়াতেই বিকট গর্জন শুনে পিছু হটে। বিস্ফোরিত চোখে দেখে ঘরের বাকি অর্ধেক ছাদও ধ্বসে পড়ছে।
তালা খুলে দরোজায় ধাক্কা দিয়ে হানিফ দেখলো, খৃলছে না। কারণ, ছাদের বাকি অংশ ভেঙে পড়ে দরোজা খোলার পথটি বন্ধ হয়ে গেছে। সে অস্থির হয়ে ওঠে। ভেঙে পড়া ছাদের অংশ নিজের চোখে দেখতে চায়। বিকট শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়েছিলো। তারা সকলে বন্ধ দরোজায় হাত লাগায়। সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে কিছুটা ফাঁক হয় দরোজাটি। মিয়া হানিফ আধ-খোলা দরোজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়। তারপর মুচকি হেসে পেছন ফিরে তাকায়, বলে, ‘শক্তিমান প্রভু, তোমার তুলনা হয় না। তোমার কুদরত বুঝা দায়। এই ঘটনা যদি তোমার ইচ্ছায় হয়ে থাকে, তবে তাই হোক।
লোকজন সবাই চলে যায়। সে তালাটি একদিকে ছুঁড়ে মারে। মসজিদে রওয়ানা হয়। সে যখন মসজিদের নিকট পৌঁছে তখন বিদ্যুৎ চমকায় আর মেঘের গর্জনে আকাশটা কেঁপে ওঠে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার খুব রাগ হচ্ছে বুঝি এই বান্দার ওপর, প্রভো? তার একমাত্র ভরসা তুমি। তোমার দেওয়া বৃষ্টিতে তার ঘরের ছাদ ধ্বসে পড়েছে, এখন আবার মেঘের গর্জন কেনো? আমার উপর শুধু বজ্রপাত হওয়া বাকি, সেটাও করতে চাও? হে মেঘ এসো, বজ্রপাত করো’। সে রেগে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ।
সে যখন মসজিদে প্রবেশ করে, তখন মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজে জবুথবু অবস্থা। শীতে কাঁপছিলো। মিম্বরের কাছে মেঝেতে বসে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে সে। ‘প্রভু, আমি রাগের মাথায় এসব কথা বলেছি, ক্ষমা করো, এই নতজানু বান্দাকে ক্ষমা করো’।
আশপাশের কয়েকজন এসে মিয়া হানিফকে সান্ত্বনা দেয়। মিয়া হানিফের কান্না থামে না। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়। কিছুক্ষণ পরপর বাড়িঘরের দেয়াল ধ্বসে পড়ার শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দে মিয়া হানিফ চমকে ওঠে। তার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ‘কাঁচা ঘরবাড়ি সব ধ্বসে পড়ছে, আর পাকা বাড়িগুলো অক্ষত। তোমার লীলা বুঝা দায় হে প্রভু’- মিয়া হানিফ বলে।
মাগরিবের নামাজের পর সবাই হতবাক। আকাশ পরিস্কার। মেঘের রেশটুকুও নেই। ভরা চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলো আর আকাশের তারা ঝলমল করছে। ইমাম সাহেব ও মুসল্লিরা তাকে মসজিদের হুজরায় নিয়ে আসে। একজন তার জন্য বিছানাপাতির ব্যবস্থা করে।
ইমাম সাহেব দরদ নিয়ে বলেন, মিয়া হানিফ, তুমি আল্লাহওয়ালা লোক, মসজিদের হুজরায় থাকার অধিকার তোমার রয়েছে। এখন থেকে তুমি এখানেই থাকবে। হানিফ বলে, ঠিক আছে মৌলভী সাহেব, আমার বাড়ির ছাদ ভেঙেছে তো কী হয়েছে, প্রভুর ঘর মসজিদ তো আছে। আমার প্রভু অবশ্যই আমাকে আশ্রয় দেবেন।
এশার নামাজের পর মসজিদ শূন্য হয়ে যায়। মিয়া হানিফ হুজরায় যায়। মেঝেতে বিছানা পেতে কুরানের শেষ পারার পনেরোটি সুরা পড়তে থাকে। ক্লান্ত হয়ে সে বিছানায় যায়। শুয়ে পড়ে। হঠাৎ বিছানা থেকে হকচকিয়ে উঠে বসে। অন্ধকার হুজরার মধ্যে ঘোরাঘুরি করে আর ছাদের চারদিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। হতাশ হয়ে সে হুজরার দরোজা খুলে বাইরে আসে। সে জানে, মসজিদের এক কোণে একজন খাদেম থাকে। মিয়া হানিফ তার দরোজায় কড়া নাড়ে। ভেতর থেকে খাদেম বলে, কে?
‘আমি হানিফ, প্রভুর বান্দা।’
খাদেম বাইরে এসে হানিফের হাত ধরে বলে, কী খবর মিয়াজী, আপনি তো হুজরায় ছিলেন, না’?
‘হ্যাঁ ভাই ছিলাম। আপনার কাছে জানতে এসেছি, হুজরায় কি কোনো ছিদ্র নেই’?
‘আছে, কিন্তু বৃষ্টির জন্য তো সেটি এখন ঢেকে দেয়া হয়েছে।
‘বৃষ্টি তো ভাই থেমে গেছে। ঢাকনাটি এখনই খুলে দেয়া উচিত।’
‘ঠিক আছে, খুলে দেবো। কাল ভোরে উঠে এটিই হবে আমার প্রথম কাজ।
হানিফ আপত্তি জানায়, বলে, ‘না ভাই ছাদে গিয়ে এখনই ঢাকনাটি সরিয়ে দাও, আমার প্রভুর সাথে আলাপ আছে।’
খাদেম নিশ্চুপ। মিয়া হানিফের কথায় সে খানিকটা ভীত। তবু সে ছাদে গিয়ে ঢাকনা সরিয়ে দেয়। হানিফ তাকে প্রাণভরে দোয়া করে, ‘আমার প্রভু তোমাকে সুখে রাখুক।’
হুজরায় এসে হানিফ ছিদ্র দিয়ে থাকিয়ে থাকে। হঠাৎ আকাশে চারটি তারা চোখে পড়ে তার। সে আনন্দিত হয়। নীরবে হাসে। ‘এক সঙ্গে চারটি তারা। প্রভু আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছো। কখনো অকৃতজ্ঞ হয়েছি আমি। আমি তোমার নতজানু বান্দা, সারা জীবন একটি তারা দেখেই কষ্ট ভুলে থাকি’। 

[উর্দু সাহিত্যের সব্যসাচী লেখক আহমদ নাদীম কাসমী একাধারে কবি, গল্পকার, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক ও সাংবাদিক। পাকিস্তানের খোশাব জেলার পার্বত্য গ্রাম আঙ্গায় ১৯১৬ সালের ২০ নভেম্বর তার জন্ম। পাঞ্জাব বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। সরকারি চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। উর্দু সাহিত্যের ছোটকাগজ ‘ফনুন’ সম্পাদনা করেন দীর্ঘ ৫০ বছর। দৈনিক ইমরোজের সহকারী সম্পাদক ছিলেন। প্রভাবশালী দৈনিক জং পত্রিকায় দীর্ঘদিন ‘রেওয়ান-দেওয়ান’ শিরোনামে সমকালীন বিষয়ে কলাম লিখেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থ ৫০ টিরও বেশি। সাহিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৮ সালে লাভ করেন রাষ্ট্রপতি পদক, পাকিস্তান একাডেমি থেকে পান আজীবন সম্মাননা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘সিতারায়ে ইমতিয়াজেও ভূষিত হন। তার কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, ফুল, তাহযিবই নিসওয়ান, আদাব-ই- লাতিফ, সাভেরা ইত্যাদি। গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, চৌপল, সানাতা, কাপাস কা ফুল, গারসে গার তক ইত্যাদি। তার মেয়ে ড. নাহিদ কাসমী ও ছেলে নোমান কাসমী। শক্তিমান এই লেখক ২০০৬ এর ১০ জুলাই ইন্তেকাল করেন।
গল্পটি মাসিক উর্দু ডাইজেস্ট থেকে অনূদিত -অনুবাদক]

>> পথিক ১৮

ভিনদেশী সাহিত্য >> সম্পর্ক : সালমান রুশদী (লায়লা ফেরদৌস ইতু)

সম্পর্ক

সালমান রুশদী (লায়লা ফেরদৌস ইতু)

প্রফেসর মালিক সোলাঙ্কার তৈরি করা পুতুলগুলো, তার সেই প্রথম দিককার চরিত্রগুলো অবয়ব পেতো ছোট ছোট কাঠের টুকরো, কাপড় আর তুলা দিয়ে। বিভিন্ন রং দিয়ে এসব চরিত্রের চেহারা ফুটিয়ে তোলা হতো, সেসব চেহারায় আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক ইঙ্গিতও থাকতো। এরপর এসব চরিত্ররা তাদের এই ক্ষুদ্র শরীর আর চেহারা ছাড়িয়ে বিশাল রূপ ধারণ করার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তাঁর সন্তানদেরকে তিনি মাটি দিয়ে গড়ে তুলবেন। কারণ- ঈশ্বর, যিনি আসলে কোথাও নেই, তিনিও  তাঁর সন্তানদেরকে গড়েছেন মাটি দিয়ে। অথচ এখানে তাঁর কৌতুক শেষ করেননি। মানুষ তাঁর কল্পনার অংশ, অথচ মানুষের জীবন ভীষণরকম বাস্তব। এখানে কল্পনার কোনো স্থান তিনি রাখেননি।
যাই হোক, এসব পুতুলগুলো তাঁর জন্য ছিলো বাস্তব। তিনি এদেরকে তৈরি করতেন, এদের ইতিহাস জানতেন, এদের বেঁচে থাকা দেখতে পছন্দ করতেন এবং এদেরকে ভালোবাসতেন। এদের মনস্তত্ব এবং ইতিহাস নিয়েই তাঁর ভাবনা আবর্তিত হতো অথচ বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো শুধু তিনি পুতুলই খেলছেন। এ সমস্ত পুতুলের মধ্যে একটা পুতুলকে তিনি খুব বেশি ভালোবাসতেন, তার নাম তিনি রেখেছিলেন ‘লিটল ব্রেইন’। লিটল ব্রেইন পুতুল থেকে পাপেট, পাপেট থেকে কার্টুন, কার্টুন থেকে দর্শকদের প্রিয় মুখে পরিণত হয়। তিনি অনুভব করতেন ‘লিটল ব্রেইন’ তাঁকে ছাড়িয়ে গেছে। তিনি কি তাহলে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন টাইপের কিছু একটা জন্ম দিয়েছিলেন? তাঁর নিজের ধ্বংসের সূত্রপাত কি তাহলে তাঁর ভালোবাসার সন্তান ‘লিটল ব্রেইন’ই করেছিলো?
মালিক সোলাঙ্কা কোনো দিনই ভাববিলাসী ছিলেন না, বরং ভীষণরকম মেধাবী ছিলেন। ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক, পুতুল তৈরি করাটা ছিলো তাঁর শখ। হঠাৎ একদিন তিনি তাঁর নিজের মাঝে এক অদম্য উন্মাদনা অনুভব করেন, অনুভব  করেন তিনি তাঁর ভালোবাসার মানুষদের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছেন। তিনি গভীর রাতে স্ত্রী-ছেলেকে খুন করতে তাদের রূমে ঢুকে পড়েন। ভাগ্যিস, ওরা সেটা দেখতে পায়নি। ডাক্তার রায় দেয়, তাঁর মাঝে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। সুতরাং, তিনি স্ত্রী-সন্তানকে ত্যাগ করে আমেরিকায় চলে আসেন। কারণ, আমেরিকা সব সময়ই স্বর্গস্বরূপ, এর অর্থ আর ক্ষমতার স্রোত সব রকম আক্রোশ ভুলিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে।
‘ফিউরি’ চার অরের একটি চমৎকার শব্দ। অভিধানে এর অর্থ লেখা হয়েছে, অসহ্য ক্রোধ, অদম্য উন্মাদনা, মারাত্মক আক্রোশ কিংবা অপ্রতিরোধ্য পাগলামি। আর পুরাণ বলছে, মানব সভ্যতার সূচনা কালে ইউরেনাস, যার অর্থ আকাশ, তিনি পাহাড়ের উপর থেকে পৃথিবী মাতার দিকে প্রেমময় দৃষ্টিতে তাকালে সেই দৃষ্টি বৃষ্টিরূপে ঝরে পড়েছিলো । তাতে পৃথিবী মাতা গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং তার গর্ভ থেকে তখন মানুষ, গাছ-পালা, জীব-জন্তু সব বেরিয়ে আসে।  আর তার শরীরের উঁচু-নিচু খাঁজগুলো বৃষ্টিতে পরিপূর্ণ হয়ে গড়ে ওঠে নদী-সাগর আর বিভিন্ন জলাশয়।
পৃথিবী মাতার সন্তানদের মাঝে সাইকোপস ছিলো খুবই দুষ্টু। এ কারণে ইউরেনাস তাকে পাতালপুরীতে আটকে রেখেছিলেন। এতে পৃথিবী মাতা নিজেও খুব মনঃক্ষুণ্ন হন এবং অন্য সন্তানদেরকে তাদের বাবার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলেন। এসব বিদ্রোহী সন্তানদের নেতৃত্ব দিয়েছিলো ক্রোনাস, তার অস্ত্র ছিলো একটি ছোট কাস্তে। সব বিদ্রোহী সন্তানরা তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় আটক করে এবং ক্রোনাস তার সেই কাস্তে দিয়ে বাবার পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে, যাতে আর কখনো ইউরেনাস তার বংশ বিস্তার করতে না পারে। সে সময় ইউরেনাস এর তস্থান থেকে ঝরে পড়া রক্ত পৃথিবী মাতার উপর পড়তেই তিনি গর্ভ ধারণ করেন এবং ইলেকটো, থিসিফোন, মেগেরা নামে তিন অতি প্রতিহিংসাপরায়ণ দেবীর জন্ম দেন। এদের কাজ হলো ভীষণ রকম উন্মাদ হয়ে অন্যায়ের প্রতিশোধ নেয়া। এদেরকে একত্রে ‘ফিউরি’ ডাকা হয়।
সুতরাং, যার উপর ফিউরি ভর করে সে হয়ে পড়ে অযৌক্তিক রকম উন্মাদ, অদম্য এক অস্থিরতা তাকে কুরেকুরে খায়। প্রফেসর মালিক সোলাঙ্কার উপরও এখন ফিউরি ভর করেছে। সিজোফ্রেনিয়া আবার কী? আর তার সন্তান ‘লিটল ব্রেইন’ও কি তার সুস্থ মন- মানসিকতা সম্পন্ন পিতার স্বাভাবিক সত্তার হত্যার প্রতিশোধ নেবে? নতুবা সে কেনো মনুষ্য শরীর ধারণ করে এই মিলা নামের মেয়েটির মাধ্যমে তার জীবনের সাথে যুক্ত হলো?
প্রফেসর তার ‘লিটল ব্রেইন’কে গড়ে তুলেছিলেন ঠিক একটি কন্যা সন্তানকে গড়ে তোলার মতো করে। এদিকে মিলাও এমন এক কন্যা সন্তান, যার বাবা ছিলেন একজন কবি। তিনি বসবাস করতেন কল্পনার জগতে এবং সেই জগতে মিলাই ছিলো তার একমাত্র সঙ্গী ও সহকারী। হয়ত এ কারণেই মিলা এতো সহজে তার মাঝে ‘লিটল ব্রেইন’কে ধারণ করতে পেরেছিলো ।
এদিকে প্রফেসর মালিক সোলাঙ্কা, যার ভেতরে এক অসম্ভব অস্থিরতা, যিনি জানেন না তাঁকে কী করতে হবে কিংবা তিনি আসলে ঠিক কী করছেন। তিনি শুধু বুঝতে পেরেছিলেন যে বেঁচে থাকার জন্যই কেবল তাঁর একটা অবলম্বন দরকার। কল্পনার জগতে বিচরণ করতে করতে নিজের জীবনটুকু যাপন করে যাবার জন্য তার একজন বিশ্বাসযোগ্য সহযাত্রী দরকার। নিজের বোধকে প্রকাশের মাধ্যমে দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য তাঁর একজন সঙ্গী দরকার । তিনি কি তাহলে মিলাকে আঁকড়ে ধরবেন না? এক অসহায় পিতা কি তার অস্তিত্বের জন্য কন্যার মুখাপেক্ষী নয়?
‘আপনার চোখগুলো আমার বাবার চোখের মতো’ পরিচয়ের পরপরই  মিলার এই উক্তি তাঁকে প্রশান্তি দেয়। তিনি ভাবতে পারেন যে, মেয়েটা তার মাঝে মৃত বাবার ছায়া খুঁজে পাচ্ছে, পিতৃহীন এক সন্তান তাঁর মাঝে হারানো পিতৃত্বের স্বাদ অনুসন্ধান করছে। সম্পর্কটা এর বেশি কিছু নয়।
তিনি এখন বৃদ্ধ। মিলা তাকে সুরক্ষা দেবে, তাকে এক অলৌকিক পিতৃত্বের স্বাদ দেবে, কোনো দিন অনুভব করতে না পারা আনন্দের অধিকারী করবে। এর বেশি কিছু কি তাঁর প্রত্যাশা ছিলো? না কি থাকা উচিত? কিন্তু মিলার হাসিতে যদি কন্যাসুলভ আবেগের চেয়ে বেশি কিছু প্রকট হয়ে ওঠে তাহলে তিনি কী করবেন? বিশাল এ পৃথিবীতে তো তাঁর কোথাও কিছু পাওয়ার নেই, কিছু চাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। অথচ মিলা তাঁকে যা দিচ্ছে তা তো তিনি ফেলতেও পারছেন না, কিংবা তিনি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না যে তিনি এই বিষয়টা চান না। তাহলে কি তিনিও ভেতরে ভেতরে এই বিষয়টার জন্য, ঐ অজানা শিহরণের জন্য ক্ষুধার্ত হয়ে  উঠেছিলেন?
‘প্রফেসর, আপনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। মনে হয় যেনো আমার বাবার সাথে কথা বলছি। আপনারও যখনই কথা বলতে ইচ্ছা করবে আমাকে ডাকবেন।’ এভাবেই এক বৃষ্টিঝরা বিকেলে নিস্তব্ধ এক আধো অন্ধকার কামরায় তাদের বাবা-মেয়ে খেলার সূত্রপাত হয়েছিলো । মিলা ছিলো একটা জীবন্ত পুতুল, একটা কথা বলতে পারা ‘লিটল ব্রেইন’। তিনি পুতুল নিয়ে খেলতে আনন্দ পেতেন, এর ভাবনার সাথে একাত্ম হতে পারতেন, এর আচার-আচরণ দেখে সুখী হতেন। একে কি পাপ বলা যাবে?
মিলা সব সময় তাঁর কোলে মাথা রেখে বসে থাকতো। তার বুক তখন তাঁর পায়ের সাথে লেগে থাকতো। তিনি তাই তাঁর পায়ের উপর একটা বালিশ রেখে দিতেন। কারণ একটা পরিণত নারী শরীরের স্পর্শে তাঁর দেহে কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে সেটা তাঁর কন্যা বুঝে ফেলুক সেটা তিনি চাইতেন না। কন্যাও সেটা বুঝত না, তাই তাঁর পায়ের ওপর তার বুকের চাপ বাড়তে শুরু করেছিলো ।
একদিন চুপিসারে তাঁর শার্টের বোতাম খুলে মিলার ঠোঁট ঢুকে পড়ে তাঁর হাহাকার ভরা পাঁজরের কাছে। বাইরে তখন দিনের আলো ফিকে হয়ে গুটিগুটি পায়ে সন্ধ্যা নামছে আর ঘরের ভেতর এক অপার্থিব কন্যা সন্তান অনাবৃত করছে তার পিতার গোপন করে রাখা বেদনার জগত, শুষে নিচ্ছে পিতার ভেতরে প্রবহমান সেই কষ্টের জলপ্রপাত। অথচ তাদের মাঝে তখন কোনো রকম বাক্য বিনিময় হচ্ছিলো না, সেটা অবশ্য হয়নি কোনো দিনই। ভাষা আসলেই একটি অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ মাধ্যম। কেউই ভাষার সাহায্যে সত্যিকার অর্থে কোনো কাজ করতে পারে না। আবার ছোট-বড় সবারই খেলার জন্য একটি পুতুল প্রয়োজন।
মিলা জিহ্বা দিয়ে প্রফেসরের বুক ছুঁয়ে বলেছিলো, ‘আপনি সময় নিন। তাড়া-হুড়ো       করার কী দরকার? আমি কোথাও পালাচ্ছি না। কিংবা কেউ এসে আমাদেরকে মাঝ পথে থামিয়েও দেবে না। আমি তো আপনারই হাতে গড়া পুতুল। আপনি শুধু মনে রাখুন কীভাবে খেলতে হয়।’
মিলা বাস্তবে ছিলো একটা মাকড়সা, যার শক্ত জালে পতঙ্গের মতো আমাদের এই বিজ্ঞ ইতিহাসের প্রফেসর ফেঁসে যাচ্ছিলেন। ‘আমি আর আমার বাবা সারা পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, এক সাথে, এক হয়ে।’ তো, আজ কি প্রফেসরের সাথে তার এক হবার পালা? মৃত বাবার ভূমিকায় প্রফেসরের স্থলাভিষেক কি নিয়তি? তাঁর ঝরে পড়া অশ্রু শুষে নেয়ার কাজটা যে মেয়ে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে তাকে কি কন্যা ছাড়া আর কিছু ভাবা যায়? কন্যারা কি এভাবেই তাদের বাবাদের ভালোবাসা না পাবার যন্ত্রণাময় ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেয়?
আচ্ছা, মিলার বাবাও কি তাঁর মতো অনাবিষ্কৃত পৃথিবী আবিষ্কারের পাপ করেছিলেন? এভাবেই কি মানুষের কাছে গচ্ছিত স্বচ্ছ আত্মাগুলো নরকের জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে?
‘না, আগেও কিছু ঘটেনি, আর এখনও কিছু ঘটছে না।’ মিলার একথা শুনে তিনি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন এ কারণে যে, তাঁর কোনো জৈবিক কন্যা সন্তান নেই। মিলা তাঁর কন্যা নয়, শুধু কন্যার মতো। তিনি এই মেয়ের প্রেমিক নন, কিন্তু প্রেমিকের মতো। তাদের সম্পর্কটা যৌনতা ভিত্তিক নয়, আবার যৌনতামুক্ত বলে বুকে হাত রেখে দাবিও করা যাবে না। এ সম্পর্ক পাপের নয়, আবার পুরোপুরি নিষ্পাপও নয়। তাঁদের মাঝে কোথাও কোনো আড়াল নেই। সম্পূর্ণ সততার উপর প্রতিষ্ঠিত এ সম্পর্কের পরিণতিই বা কী? এও কি তাহলে শুধু ফিউরির অভিশাপ?
প্রফেসর কি স্বীকার করবেন? তিনি নিজেই কি বুঝতে পারছেন কী ঘটছে, কেনো ঘটছে? যেদিন মিলা তাঁর ঘাড়ের ওপর ঠোঁট রেখে সমস্ত বেদনা, জীবনব্যপী তাড়া করা অভিশাপ, কষ্টের উচ্চারণ শুষে নিচ্ছিলো, তখন তাঁর মনে হচ্ছিলো যেনো এই মেয়েই সেই ফিউরি, যে নিতান্ত প্রতিহিংসাবশত তাঁর অস্থির ভাবে ফুটন্ত রক্ত পান করছে। অথচ কী অদ্ভুত, ঠিক তখনই তিনি তাঁর অভ্যস্ত সেই পুরনো খেলার নিয়মটা মনে করতে পারলেন। ‘আপনার ভেতর এতোদিন ধরে যে জিনিসটা অপেক্ষা করছে, মুক্তির আশায় প্রহর গুনছে, যার চাপে আপনি নিজেও এতোটাই জর্জরিত, তাকে আজই কাজে লাগান। আপনি লিটল ব্রেইনের জন্মদাতা, আপনি এটা পারবেন। হ্যাঁ, এভাবেই আপনি নির্ভার হোন।’
সেদিন থেকে প্রফেসর অনুভব করতে শুরু করেছেন অন্য এক উন্মাদনা। তাঁর ভেতরে সেদিনই গড়ে উঠেছে অন্য এক পৃথিবী, অন্য এক কল্পনার মোহাচ্ছন্ন মায়াজাল। মিলার কাছে তিনি কৃতজ্ঞ, কারণ এই অপার্থিব কন্যাটি তাকেও এক অপার্থিব আনন্দের শিক্ষা দিয়েছে। তাঁকে দিয়েছে বর্ণনার অতীত নতুন এক সম্পর্কের স্বাদ, নতুন রকম শ্বাসকষ্টের অভিজ্ঞতা, নতুন প্রকরণের সিজোফ্রেনিয়ার দুর্ভোগ। পৃথিবীতে তো কতো নাম না জানা সম্পর্কই গড়ে ওঠে, কতো অদ্ভুত অবস্থানে মানুষ নিজেকে মানিয়ে নেয়। কিন্তু নিজের মনে সততা থাকলে কোনো সম্পর্কই পাপ নয়। সেই সম্পর্কের কোনো নাম নাইবা দেয়া গেলো.....

[সালমান রুশদী ১৯৪৭ সালের ১৯ জুন ভারতের মুম্বাই (বোম্বে) নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। কৈশোরে তিনি সপরিবারে ইংল্যান্ডে স্থানান্তরিত হন এবং রাগবি স্কুল ও কিংস কলেজে শিক্ষা জীবন কাটান। বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। এছাড়াও তিনি বর্তমানে ‘রয়াল সোসাইটি অব লিটারেচার’ এর ফেলো এবং ‘পেন আমেরিকা’ সেন্টারের সভাপতি ও ‘কমান্ডার ডি আর্ট অ্যান্ড ডি লেটার’ এর সদস্য।
সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর প্রথম সৃষ্টি ‘Grimus’. ১৯৯৩ সালে ‘Midnight’s Children’ এর জন্য তিনি বুকার পুরস্কার পান। ভারতীয় ও পাশ্চাত্য জীবনের তুলনা, রূপকথা, ইতিহাস, রাজনীতি, মনস্তত্ত্ব, সমকাল সব মিলিয়ে তাঁর উপন্যাস এক জাদু-বাস্তবতার অনুভূতি দান করে।
‘Fury’ উপন্যাসটি গড়ে উঠেছে ‘ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স’কে অবলম্বন করে। একদিকে কন্যা সন্তানের জন্য স্নেহের টান, অন্যদিকে মানুষ হিসেবে শুধু নারী আর পুরুষ হিসেবে জীবনের অর্থ খোঁজা, এই রকম মানসিক টানা-পোড়েনের চিত্রই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। -অনুবাদক]


>> পথিক ১৮

গল্প >> পূর্ণতার পিঠে : অনন্ত নিগার

পূর্ণতার পিঠে

অনন্ত নিগার

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও খ্যাতিমান বিজ্ঞানী শওকত হোসেন, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার উপর যার তৈরি কিছু থিসিস পেপার আমেরিকান কয়েকটি নামকরা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিলো এবং চারটি মৌলিক বলের মধ্যে তিনটি মৌলিক বলকে একত্রীভূত করার সম্ভাব্য তত্ত্ব যিনি তৈরি করেছিলেন, তিনি কেন তাঁর জীবনের অবশিষ্টাংশটুকু মাতৃভূমি বাংলাদেশের একটি অজপাড়া গ্রাম রসূলপুরে কাটিয়েছিলেন, তা অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়। সে যাই হোক, জীবনের একেবারে অন্তিম পর্যায়ে এসে অস্ত যাবার আগ মুহুর্তে শওকত সাহেব তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে যে নিজস্ব ভাবধারায় জীবনের প্রবাহমান বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো লিখে রেখেছিলেন তারই উল্লেখযোগ্য শেষাংশটুকু নিচে পেশ করা হলো:
‘.... অতঃপর আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম যে, য়্যূরোপের চাকচিক্য আর গতিময় জীবন কিংবা যান্ত্রিক জীবন আমাকে উদ্বেলিত করিতে পারে নাই। টগবগে যৌবনে যে দুর্বার প্রেরণা আর উদ্দীপনা নিয়া শহরে পদার্পন করিয়াছিলাম, শহরে থাকাবস্থায়ই অনুধাবন করিয়াছিলাম উহা ক্রমশঃ স্থিমিত হইয়া আসিতেছে। অতঃপর প্রথম শ্রেণীতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করিয়া যখন জ্ঞানের পরিধি বাড়াইবার নিমিত্তে উচ্চতর ডিগ্রী লইবার তাগিদে বিলেতে পাড়ি জমাইয়াছিলাম, প্রথমতঃ বিলেতের চাকচিক্যের মোহ আমাকে কিছুটা আবেশিত করিয়া রাখিলেও আস্তে আস্তে তাহা উবিয়া গেল। গবেষণা সম্পন্ন করিয়া বিগত কয়েক বছর ধরিয়াই দেশ মাতৃকার প্রতি, আমার জন্মস্থান রসূলপুরের প্রতি যে অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করিতে লাগিলাম তাহাই আমাকে শেষ পর্যন্ত জন্মভূমিতে সজোরে লইয়া আসিল।
য়্যূরোপের যে চাকচিক্যময় জীবন তাহা খুবই আকর্ষণীয়, তাহা যে কোন টগবগে যৌবনের অধিকারীকে মোহান্বিত করিয়া রাখিবে। কিন্তু আমি থাকিতে পারিলাম না, কারণ য়্যুরোপের ঐ যান্ত্রিক জীবন ক্রমশঃ আমাকে উদ্বিগ্ন করিয়া তুলিতেছিলো । মানুষগুলো যেভাবে যন্ত্রের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িতেছে, তাহা খুবই আশংকাজনক। মানুষ যতোই যন্ত্রনির্ভর হইবে, ততই তাহার মধ্য হইতে শারীরিক ও স্বাভাবিক ক্ষমতা লোপ পাইতে থাকিবে।
যন্ত্র কী? যন্ত্র হইতেছে এমন একটি কৃত্রিম বস্তু, যাহা প্রকৃতির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে প্রকৃতির সহিত পাল্লা দিবার প্রয়াস পায়। কিন্তু ইহা খুবই সুস্পষ্ট যে, প্রকৃতির সহিত যাহা পাল্লা দিতে চেষ্টা করিবে কিংবা যাহা প্রকৃতির সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হইবে, প্রকৃতি উহাকে ক্রমশঃ ধ্বংস করিয়া ফেলিবে। তদুপরি, মানুষ যতোই দিন দিন যান্ত্রিক হইয়া উঠিবে, প্রকৃতি ততই মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলিয়া দিবে। তাই বর্তমান প্রজন্মকে শারীরিকভাবে ক্রমশঃ দুর্বল বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে।
মানুষ তাহার সমস্যার মোকাবিলায় কিংবা চাহিদা মিটাইবার তাগিদে যন্ত্র তৈয়ার করিতেছে। চাহিদা কে তৈয়ার করিতেছে? প্রকৃতি করিতেছে। তাহা হইলে প্রশ্ন উত্থিত হইবে, সৃষ্টির পরিকল্পনা কী?
আমি আমার পিতৃভূমিতে আসিয়া, এ যাবত পৃথিবীর সবচাইতে আধ্যাত্মিক ও খ্যাতিমান গ্রন্থ কোরান নিয়া বেশ মনোযোগ সহকারে পড়াশুনা করিয়াছি। উহা পড়িয়া অনুধাবন করিলাম, ‘আসমাউল হুসনা’ কিংবা স্রষ্টার সুন্দর নাম অথবা গুণসমূহের মধ্যে ‘কামেল’ গুণটি স্রষ্টার মধ্যে আছে। অর্থাৎ স্রষ্টা পরিপূর্ণ; কামেল ছাড়া বাকী আটানব্বইটি গুণ মানুষের মধ্যে আছে। এতে অনুধাবন করা যায় মানুষ সব গুণাবলীর অধিকারী কিন্তু মানুষ পূর্ণ হইতে পারিবে না। মানুষ যতই পূর্ণতার দিকে যাইতে থাকিবে, ধ্বংসও ক্রমশঃ তাহার দিকে ধাবিয়া আসিবে।
আমি এইসব লইয়া ভাবিতে চাহি না। ভাবিতে চাহি না যন্ত্রকে লইয়া। আমি মাটির মানুষ। উদ্ভিদ যেমন ভূমি উদগীরণ করিয়া সবুজ হইয়া বাহির হয় আমিও তেমনি মাটি ভেদ করিয়া সবুজের ন্যায় মাথা উঁচাইবার চাই। আমি চাই নরম একটি জীবন, সরল একটি জীবন, যে জীবন মাটির ন্যায় মৌলিক।’
ঘটনার প্রায় দুই শ' বছর পরে যখন স্থানীয় জনপ্রিয় একটি আর্কাইভ থেকে খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও কথাসাহিত্যিক শওকত হোসেনের ডায়েরী উদ্ধার হলো, তখন বিজ্ঞানী মহলে বেশ সাড়া পড়ল এবং সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো শওকত সাহেবের ডায়েরীতে তাঁর গ্রামের যে বর্ণনা দেয়া আছে সে অনুসারে চতুর্মাত্রিকের বদলে ত্রিমাত্রিক একটি ভার্চুয়াল গ্রামের ভিডিও চিত্র তৈরি হবে এবং কয়েক মিনিটের সেই ভিডিও চিত্র ছোট শিশুদেরকে স্থানীয় বিজ্ঞানাগারে প্রদর্শিত করা হবে।
ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশন সফটওয়্যার ব্যবহার করে চলতি প্রজন্মের কম্পিউটার দ্বারা মাত্র কয়েক ঘন্টায় ভার্চুয়াল গ্রামের অ্যানিমেশন তৈরি হলো।
পরদিন বিকেলে স্থানীয় বিজ্ঞানাগারে সুপার প্রজেক্টরের সাহায্যে প্রদর্শনীর আয়োজন হলো। ছোট ছোট শিশুরা এলো। এদের প্রায় সবারই চোখে মাইনাস লেন্স বসানো। অনেকে শ্বাসকষ্টের রোগী, তাই শরীরের সাথে লাগোয়া ছোট সিলিন্ডারের সাহায্যে শ্বাস ফেলছে। অনেকেই বিকলাঙ্গ ও শারীরিক প্রতিবন্ধি, তাই এদের সাথেই রয়েছে ছোট বোতল ভর্তি ভিটামিন সিরাপ। আবার বাকশক্তিহীন অনেকের মস্তিষ্কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নিউরো রিডিং কম্পিউটার।
অপারেটর রোবট এসে প্রথমে হালকা নির্ধারিত লেকচার দিল। অতঃপর  সময়মতো প্রজেক্টর চালু করলো। ছোট ছোট শিশুরা গ্রামের গল্পই কেবল শুনেছিলো । পর্দায় ভার্চুয়াল গ্রাম তারা হাঁ করে দেখতে লাগল। তারা দেখতে লাগল গাছ, ধানক্ষেত, খড়ের গাদা, বাঁশের সাঁকো, দেখতে লাগল গরুর পাল, ভেড়ার পাল, মুরগী আর হাঁসের ছানা, তারা দেখতে লাগল, আকাশের নীল আর নীল, বিকেলের টলটলে নদী আর সূর্যাস্ত, গহীন অরণ্যে ঘেরা সবুজ আর সবুজ, তারা দেখতে লাগল শওকত হোসেনের সেই রসূলপুর।
প্রদর্শনী শেষে অপারেটর রোবট ঘোষণা করলো শওকত সাহেব তাঁর ডায়েরীতে হাস্যকর একটি উদ্বৃতি দিয়েছিলেন তা হলো, মানুষ পূর্ণতা অর্জন করলেই ক্রমশঃ ধ্বংস হয়ে যাবে। মজার ব্যাপার হলো, আর কয়েকদিন পরেই, হয়তো আজই মানুষ চারটি মৌলিক বলকে একত্রীভূত করে মহাবিশ্বের উৎপত্তির কারণ জেনে যাবে। ঘোষণা শেষ হবার আগ মুহূর্তেই হঠাৎ দূরবর্তী কোনো স্থান থেকে প্রচন্ড শোঁ শোঁ আওয়াজ শোনা গেলো। সবাই হতবিহবল হয়ে আশেপাশে তাকালো কিন্তু ঠিক বুঝা গেলো না কোথা থেকে শব্দের উৎপত্তি। হঠাৎ সমস্ত পৃথিবী  সবেগে দোলে উঠল। ক্রমেই ভয়ানকভাবে বাড়তে থাকে সে দোলুনি।

>> পথিক ১৮