শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

গল্প >> নিম সম্পর্ক : কৃষ্ণেদু পালিত

নিম সম্পর্ক

কৃষ্ণেদু পালিত

ইচ্ছে নেই তবু যেতে হবে। এর আগে প্রতিবারই একটা না একটা অজুহাতে এড়িয়ে গেছে। এবার আর সম্ভব নয়। জয়ন্তর কাছে কোনো আপত্তি ধোপে টিকবে না। ওর এক বন্ধু নিউ আলিপুরে থাকে, সে খবরটা এনেছে। আমেরিকা থেকে দিন সাতেকের জন্যে একজন বিখ্যাত গাইনোকলজিস্ট আসছেন কলকাতায়। ভদ্রলোকের নাম টি.এন. ভেলেংকার। প্রবাসী ভারতীয়। ইচ্ছে হলে মউলকে একবার দেখিয়ে নিতে পারে। .
শোনা অবধি অন্ধকার দেখছে মউল। চোখের সামনে সমস্ত দৃশ্য বন বন করে ঘুরছে। একটু একটু করে লোপ পাচ্ছে চেতনা আর একটা অভিশপ্ত দুপুর ভয়ঙ্কর হাঁ নিয়ে ছুটে আসছে তার দিকে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, মাথার উপর জ্বলন্ত সূর্য, ধীর পায়ে পথ ভাঙছে এক কিশোরী, স্কুল থেকে ফিরছে সে। রোগা, লম্বা, ধবধবে শাদা পায়ের রং। চোখ দুটো খুব বড় বড় আর ব্যক্তিত্বপূর্ণ। ক্লাস নাইনে উঠে সদ্য শাড়ি ধরেছে। শাদা জমির উপর নীল পাড়, নীল ব্লাউজ। রাস্তা সংক্ষেপের জন্যে ডান দিকের একটা গলি ধরলো মেয়েটি। জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরমে চারদিক নির্জন। মেয়েটি আপন মনে হাঁটছিলো। হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে মূর্তিমান তিন শয়তান আচমকা মেয়েটির মুখ চেপে ধরে। এদিকটায় সারাদিন লোকজন প্রায় আসে না বললেই চলে। একটা মিলের পেছন ভাগ। কারখানার যত নোংরা আর বর্জ্য পদার্থ এখানে ফেলা হয়, তবু একটু সুুযোগ পেতেই মেয়েটি চিৎকার করার চেষ্টা করে। সঙ্গে সঙ্গে ভারি একটা হাত, যার দু’ আঙুলের ফাঁকে কালো জড়ুল, ডান ভ্রুর মাঝখান বরাবর কাটা দাগ - মেয়েটির মুখ চেপে ধরে।

ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া ছিলো। ঠিক সাড়ে ছ’ টায় জাগিয়ে দিলো। সাড়ে সাতটার মধ্যে তৈরি হয়ে নিলো মউল। শাদার উপর বুটি দেওয়া শান্তিপুরী তাঁত পরেছে আজ। ঘাড়ের নিচে আলতো একটা খোঁপা। মুখে হালকা পাফের পরশ। নো কসমেটিক্স। ঠোঁটে সামান্য রঙ পর্যন্ত না। সাজগোজের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই অনীহা মউলের। বিশেষ করে অ্যাকসিডেন্টের পর। তারপর তো বাবা কলকাতার পাট উঠিয়ে দিলেন। মান সম্মান, মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে থানা-পুলিশ করেননি। পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে এসেছেন।

মাস দুই পরের ঘটনা। তল পেটে চিনচিনে ব্যথাটা প্রথম টের পায়। তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তখনকার মতো পেইন কিলার খেয়ে নিতো। যন্ত্রণাটা মাঝে মধ্যেই হতো। একদিন মাঝরাতে মরণাপণ্ন অবস্থা। তখন শ্রাবণ যায় যায়। ঝড় জল বৃষ্টি... সেই রাতেই হসপিটালে ভর্তি করা হলো। সিরিয়াস কন্ডিশন। এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি। প্রায় তিন মাস ধরে ফিটাস ফেলোপিওন টিউবের মধ্যে গ্রো করে আছে। তারপর রাপচার্ড। অ্যাবডোমিনাল ক্যাভিটি রক্তে ভরে গেছে। জীবন বাঁচাতে ফেলোপিয়ান টিউব কেটে বাদ দিতে হলো। সমস্ত জীবনের মতো মউল হারালো নারীর সাধারণ সত্তা।
ডাক্তারবাবু বাবাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, আর কোনো ভয় নেই, তবে সাময়িক একটু ডিপ্রেশন হতে পারে। চেষ্টা করবেন ওর মনটা সবসময় ভালো রাখতে।
পরিবর্তে বাবা নিজেই ভেঙে পড়লেন। ভেঙে পড়লো মা। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভাবনায় শোকে মূহ্যমান দুটি প্রাণী। সামান্য ডিপ্রেশন হলেও তখন অতোটা বোঝেনি মউল। বুঝেছে ক্রমশ, যত বড় হয়েছে। তাকে ঘিরে মা-বাবার কোমল পরিবেশ রূঢ় হয়েছে ধীরে ধীরে।
বিয়ে করবে না মনস্থির করেছিলো। দেখতে খারাপ নয়। লম্বায় চওড়ায় যে কোনো বাঙালি মেয়ের কাছে ঈর্ষণীয়। পাত্রীর বাজারে যথেষ্ট কদর। দেখতে এসে কেউ কখনও অপছন্দ করেনি। শিক্ষিত, সুশ্রী, গৃহকর্মে নিপুণা। সুুপাত্র কেনার মতো বাবার পর্যাপ্ত টাকাও আছে। আর পেটের দাগ? যা হোক একটা বলে চালিয়ে দিতে পারতো। তারপর?
মউল বিয়ে করবে না, একে একে সমস্ত পাত্রপক্ষকে ফিরিয়ে দিয়েছে। যতোই বুঝান মা-বাবা আত্মীয়-স্বজন। নিজের জীবনের অভিশাপ, জেনেশুনে অন্যের ওপর চাপাবে না। চাকরির চেষ্টা করছিলো। হয়তো পেয়েও যেতো। হঠাৎ জয়ন্তর আবির্ভাবে সব চিন্তা-ভাবনা উলটো-পালটা হয়ে গেলো।
বিয়েতে মত দিলো সে।

মিনিট কুড়ি ধরে বিভিন্ন পরীক্ষার পর ডা. ভেলেংকার মউলকে বাইরে ওয়েটিং রুমে বসতে বললেন। জয়ন্ত চেম্বারে। যা বলার তাকেই বলবেন।
ওয়েটিং রুমে বসে ভিতরে ভিতরে ভাঙছিলো মউল। এরকম একটা আশঙ্কা জয়ন্তকে মনে ধরার পর থেকে ছিলো। বিয়ের পর থেকেই মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছে। তবু...।
মউল ঘামছে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে সবকিছু আর ভয়ঙ্কর সেই দুপুর একটু একটু করে থাবা বাড়াচ্ছে। যন্ত্রণা। তলপেটে অসহ্য যন্ত্রণা। উরু বেয়ে রক্তের স্রোত। বুকের জামা ছেঁড়া। সদ্য প্রস্ফুটিত বুকে হিংস্র নখের আঁচড়। গালে নীল ক্ষত। যন্ত্রণায় ঠোঁট কামড়ে ধরেছিলো, পাতলা ঠোঁট চিরে জমাট রক্ত। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো সে।
এসব কথা জয়ন্তকে আজও বলা হয়নি। চেষ্টা করেছে, পারেনি। একটু একটু করে গত পাঁচ বছরে অনেকটাই ভালোবেসে ফেলেছে জয়ন্তকে। মানুষটাকে তাই আঘাত দিতে চায়নি।
একটু পরেই জয়ন্ত বেরিয়ে আসে। গম্ভীর। মি. ভেলেংকারের সাথে কী হয়েছে সেই জানে। মউলের সাথে একটাও কথা বললো না। এমনকি ফিরেও তাকালো না। সোজা গিয়ে ফিয়াটে চাপলো। পেছন পেছন মউল। ভয়ে মুখ শাদা। বুকের ভিতর ঢিপঢিপ করছে। মনে মনে শক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। এমন একটা দিনের ‘অপেক্ষা’ তো দীর্ঘদিনের!
রাস্তায় একটা কথাও বললো না জয়ন্ত। মউলকে বাড়ির সামনে নামিয়ে গাড়ি ব্যাক করল। কোথায় গেলো কিছু বলে গেলো না। ফিরলো রাত করে। মত্ত অবস্থায়। এমনিতে মদ খায় না, মাঝে মধ্যে এক আধ পেগ খেলেও ধরার মতো কিছু নয়। আজ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। দরজা খুলতেই ভিতরে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। ধরে তুলতে যাচ্ছিলো মউল, বাধা দিল।
- ডোন্ট টাচ মি। আ-উ-ট। আই সে গেট আউট। নষ্টা, কুচরিত্রা মেয়েমানুষ ...
- কী বলছ তুমি !
- ঠিকই বলছি। জয়ন্ত টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়। রাগে চোখ জ্বলছে। বলে, অস্বীকার করতে পারবে, বিয়ের আগে তোমার প্রেগনান্সি আসেনি? পাপের মূল্য দিতে টিউব কেটে বাদ দিতে হয়নি?
মউলের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। কথা বলতে পারে না। জোরে জোরে শ্বাস নেয়। দু’ মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর শান্ত অথচ রূঢ়স্বরে উচ্চারণ করে, আই ওয়াজ রেপ্ড। রেপ্ড বাই থ্রি এভিলস, হোয়েন আই ওয়াজ থার্টিন। কথা বলতে বলতে হাঁপায় সে। নিশ্বাসে আগুন ছোটে। মুহূর্ত চুপ থাকার পর আবার বলে, তেরো বছর আগে। এই অঞ্চলের এক গলিতে।
জয়ন্ত চমকে ওঠে। নেশাটা টাল খায়। সামলে নিয়ে মউলের হাত চেপে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে, জেনেশুনে কেনো আমার জীবনটা নষ্ট করলে। কোন অধিকারে ! হো-য়া-ই? হোয়াই ইউ হেল মাই লাইফ?
এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় মউল। জয়ন্তর কাছ থেকে এতোটা আশা করেনি। ভেবেছিলো বিয়ের এতো বছর বাদে ভালোবাসা অনেক দৃঢ় হয়েছে। যেখানে দাঁড়িয়ে...। ক্রুদ্ধ সাপিনীর মতো ফুঁসে উঠলো। দু’ চোখ ঘৃণা আর ক্ষোভের জ্বলন্ত অঙ্গার। এতোদিনে সেই মুহূর্ত এসেছে।
- প্রশ্নটা আমিও তোমাকে করতে পারি।
- তার মানে !
জয়ন্ত’র পেটের মধ্যে একটা রাবারের বল ড্রপ খেয়ে গলায় আটকে যায়। ভয়ে কাগজশাদা মুখ। গলার স্বর ভাঙা।
মউল তখনও হাঁপাচ্ছে। কোনো উত্তর দিলো না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শ্বাস নিলো। কিছুটা সময় নিয়ে হাড় হিম করা ঠাণ্ডা গলায় কেটে কেটে উচ্চারণ করলো, একটা অসহায় মেয়ের পক্ষে প্রতিশোধ নেওয়ার এছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।
- কী বলতে চাও তুমি? জয়ন্ত’র গলায় আটকে থাকা বলে প্রবল অস্বস্তি। ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
- ভদ্রলোক সেজে যতই সাধু হও, দু’ আঙুলের ফাঁকে কালো জড়ুল আর ভ্রুর কাটা দাগ দেখে প্রথম দিনই তোমাকে চিনেছিলাম ...
এক ঝটকায় গলায় আটকে থাকা বলটা সরে যায়। অসহ্য যন্ত্রণায় পেটের ভিতর মোচড় মারে। মেঝে ভাসিয়ে হড়হড় করে বমি করে ফেলে জয়ন্ত। সন্ধ্যায় গেলা দামি মদ আর চীনা খাবারের কিছুই এখন আর আলাদাভাবে চেনা যায় না।
উত্তর চব্বিশ পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

গল্প >> ঘাসফুলের নাকফুল : মোহছেনা পারভীন

ঘাসফুলের নাকফুল

মোহছেনা পারভীন

হুঁকোয় একটা টান দিয়ে চেঁচিয়ে মেয়েকে ডাক দেয় নেকবর। কইরে, কই গেলি রুকি হুক্কায় কয়ডা কয়লা চুলা থাইকা আইনা দে দেহি। হুক্কায় টান দিয়া মজা পাইতেছি না। রুকি বাপের হুঁকোর জন্য কয়েক টুকরো জ্বলন্ত কয়লা চুলা থেকে নিয়ে কলকিতে ভরে ফুঁ দিতে থাকে। নেকবর মেয়েকে বারণ করে জোরে ফুঁ দিতে, আগুন ছিটকে মুখে কাপড়ে লাগতে পারে।

মা মরা মেয়ে রুকি। জন্মের দু’ মাসের মাথাতেই মাকে হারায়। মা মরা মেয়েটিকে আগলে রেখেছিলেন দাদীই। তিন বছরের মাথায় মারা যান দাদীও। সেই থেকে রুকির বাপ-মা সবই নেকবর। নেকবর ধনী গেরস্তের বাড়ির ধানকাটা, ধানের বীজ বোনা, ধানের চারা রোপনের কাজ করে। যখন ফসলের ভরা মৌসুম তখন খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে নেকবর। রুকিকে নিয়ে তখন মুশকিলে পড়ে যেতো, ছোট্ট মেয়েকে একলা ঘরে রেখে আসতে পারতো না। খেতের আইলে বসিয়ে ধান কাটতো।

শ্যামলা বরণ মেয়েটির বয়স সবে ষোলো পেরিয়েছে। গাঁয়ের মেয়ে ষোলোতেই অনেক বড় হয়ে যায়। অনেক কিছু বুঝতে শেখে। মা নেই, সংসারের সব কাজ তাই রুকিকেই সামাল দিতে হয়। গ্রামের মেয়েদের সাথে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ির মাঝেও তাকে বাপের জন্য রাঁধতে হয়। ঘর গুছিয়ে রাখতে হয়। রুকিরও নিজেকে বড় ভাবতে ভালো লাগে। এখন ও শাড়ি পরে। 
রুকির একটা নাকফুলের ভীষণ শখ। নাকে পরলে কী সুন্দর লাগে। পাশের বাড়ির চাচির কাছে বলেছিলও সে কথা। চাচি হেসে বলেছিলো, বিয়ে হোক তখন পরতে পাবি। লজ্জা পেলেও বিয়ের কথায় আলাদা একটা শিহরণ অনুভব করে রুকি। খেলতে খেলতে নিজের সংসারের একটা স্বপ্নও এরই মাঝেই তৈরি হয়ে আছে তার হৃদয়ে। মাঝে মাঝে বিয়ের প্রস্তাবও আসে রুকির।

পুকুরঘাটে পানি আনতে গেলে রুকির চোখ আটকে যায় ঘাসফুলে। পুকুরের পারে ঘন ঘাস কার্পেটের মত ছেয়ে আছে। তার মাঝে ঘাসফুলগুলো যেনো একেকটা নাকফুল। পরম মমতায় ঘাসের কার্পেটে হাত বুলায় রুকি। একটি ফুল ছিঁড়ে নাকে পরে। মনে হয় নিজেরও একটা সংসার আছে। লজ্জা খেলা করে রুকির চোখেমুখে। নাক থেকে হঠাৎই খুলে পড়ে যায় ঘাসফুল। মনে পড়ে চাচির কথা। চাচি বলেছিলা, সতী নারীর প্রধান চিহ্নই হলো নাকফুল। সতী নারীর নাক থেকে স্বামীর দেওয়া নাকফুল কখনওই খুলে পড়ে না। চমকে ওঠে রুকি। আবার আরেকটি ফুল ছিঁড়ে জিহবার পানি দিয়ে ভিজিয়ে নাকে পরে। এবার নাকে আটকে আছে ঘাসফুলের নাকফুল। মুখে হাসি ফোটে রুকির। পুকুরের স্বচ্ছ পানির দিকে তাকায়। পানির ভেতরে নিজেকে দেখে। অন্যরকম লাগে। ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে নাকফুলের দিকে।

পশ্চিম পাড়ার এক বুড়ি ভিক্ষা করতে আসে রুকিদের গ্রামে। সবাই তাকে বগির মা ডাকে। ছোট থেকেই রুকিকে দেখছে সে। মায়া লাগে মেয়েটির জন্য। বাপের উপকার হয় এই ভেবে বগির মা তার গ্রামের এক ছেলের সাথে রুকির বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। ছেলের নাম নুরু মিয়া। রিকশা চালায়। বাবা নেই। আছেন শুধু বৃদ্ধা মা। ছোট্ট সংসারে মেয়ে সুখী হবে ভেবেই রুকির বাপও প্রস্তাবটি সানন্দে গ্রহণ করে। ছেলের পক্ষও রুকিকে দেখে খুব পছন্দ করে। তাদের কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। বৃদ্ধা শাশুড়ির সেবা করবে এটাই ছেলে পক্ষের চাওয়া।

পঞ্জিকা দেখে একটি ভালো দিনে বিয়ে হয় রুকির। সন্ধ্যার আগেই শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে যায় রুকি। গ্রামের মানুষ নতুন বৌকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমায় নুরু মিয়ার বাড়িতে। খুব সুন্দর লাগছিলো রুকিকে। বিশেষ করে নাকে চান্দি রূপার নাকফুলে বেশ মানিয়েছে নতুন বৌকে। সবার দৃষ্টি নাকফুলের দিকে। নুরু মিয়া দিয়েছে এই নাকফুল। 

পূর্ণিমা রাত। বালিকা বধূর সারা শরীরে ভরা জোছনার ঢেউ। মনে হচ্ছে বিয়ের শাড়িতে বাড়তি কারুকাজ। লম্বা ঘোমটা টেনে চোখ বুজে বসে থাকতে থাকতে রুকি কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেই বুঝতে পারেনি। সকালে মোরগের ডাকে তার ঘুম ভাঙে। ঘুম থেকে উঠে একটি ঝাড়– নিয়ে নেমে পড়ে উঠান ঝাড়– দিতে। আশপাশের অল্প বয়সের মেয়েরা রুকির উঠান ঝাড়– দেওয়ার দৃশ্য দেখার জন্য ভিড় জমায়। কত ভোরে নতুন বউ ঘুম থেকে উঠেছে সেটি দেখার জন্য বয়স্ক মহিলারাও নুরু মিয়ার বাড়িতে আসে। এই দলে ছিলো বগির মাও। বগির মায়ের চোখেই প্রথম ধরা পড়ে বিষয়টি। নাকফুল নেই নতুন বৌয়ের নাকে। বগির মা রুকিকে জিজ্ঞাসা করে, এই পোড়ামুখী তোর নাকফুল কই?  নাক স্পর্শ করে নাকফুলের অস্তিত্ব না পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় রুকি। পাগলের মতো উঠোনজুড়ে ধুলোবালি ময়লা-আর্বজনার মাঝে খুঁজতে থাকে নাকফুল। ততক্ষণে  পুরো গ্রামের বৌ-ঝিদের মাঝে খবর হয়ে যায় নতুন বউয়ের নাকের ফুল হারিয়ে যাওয়ার কথা। 
গ্রামের লোকের ধারণা বিয়ের রাতে নাকফুল হারিয়ে যাওয়া অশুভ লক্ষণ। অমঙ্গল হয় স্বামীর। ছেলের আশু অমঙ্গলের কথা চিন্তা করে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন নুরুর মা। মায়ের কান্না শুনে ঘুম ভাঙে নুরুর। বাইরে এসে সব কিছু জানতে পেরে নাকফুল খুঁজতে থাকে নুরুও। ঘরের ভেতর এলোমেলো বিছানায় খুঁজে পায় নাকফুল। সবাই আশ্বস্ত হয়। তবুও কথা থামে না বৌ-ঝিদের। রুকিকে ইঙ্গিত করে নানা কথায় শুনায়। রুকির কা-জ্ঞানহীনতার কোনো তুলনা খুঁজে পায় না তারা। লজ্জায় অপমানে বারান্দার খুঁটি ধরে মূর্তির মতো নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে রুকি। নুরু তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ঘরে। 

সুখে-দুখে রুকির দিন কেটে যাচ্ছিলো এক রকম। হঠাৎ বাড়ি থেকে নুরুর রিকশাটা চুরি হয়ে যায়। রুজি রোজগারের একমাত্র অবলম্বন রিকশাটি চুরি হয়ে যাওয়ায় সকলেরই যেনো মাথায় হাত পড়ে। রুকিও ভীষণ ভাবনায় পড়ে। কীভাবে চলবে সংসার! শাশুড়ির চিৎকারে রুকির ভাবনার জাল ছিঁড়ে। রুকির শাশুড়ি চিৎকার করে বলতে থাকে, এই পোড়াকপালী যেইদিন আমার বাড়িতে আইছে হেইদিন থাইকাই আমার অমঙ্গল শুরু হইছে। আভাগীর বেটি পরথম দিনই যখন নাকফুল হারাইছে হেই দিনই বুঝবার পারছি এই মাইয়া আমার সংসার ধ্বংস করতে আইছে। নুরুরও মনে হলো মা ঠিকই বলছে। এতোদিন তার রিকশা চুরি হয়নি। এখন কেনো চুরি হবে! মনে মনে রুকির প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই খেপার মতো ঘরে ঢুকে রুকিকে টেনে হিঁচড়ে উঠোনে এনে বুকে পিঠে কিল দিতে শুরু করে নুরু। অসহায় রুকি বাবা গো-মাগো বলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। রুকির কান্নায় নুরুর কোনো ভাবান্তর হয় না। সে চিৎকার করে বলতে থাকে। অলক্ষ্মীর মাইয়া তোর লাইগা আমার রিকশা গেছে তুই এহন তোর বাপের কাছ থাইকা আমার রিকশা আইনা দিবি। 

স্বামীর সংসারে রুকির এখন আর কোনো মূল্য নেই। রিকশা হারানোর পর থেকে নুরু মিয়া যেনো পাল্টে গেছে। কথায় কথায় রুকির দোষ ধরে। বাপের কাছ থেকে রিকশা এনে দেওয়ার জন্য প্রায়ই রুকিকে নির্যাতন করে করে সে। একটু ছুতো পেলে শাশুড়িও ছেড়ে কথা কন না। রুকি নীরবে সব হজম করে। জানে তার বাপের সামর্থ নেই রিকশা এনে দেওয়ার। তাই নীরবে সয়ে যেতেই হবে। 
এক রাতে ক্লান্ত রুকি ঘুমিয়ে আছে। চুপিচুপি ঘরে ঢোকে নুরু। আস্তে করে রুকির নাকফুলটি খুলে নেয়। টের পায় না রুকি। পরদিন সকালে নুরু এক গ্লাস পানি চায় রুকির কাছে। যন্ত্রের মতো নুরুকে পানি এনে দেয় রুকি। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে আচমকা নুরু বলে উঠে, তোর নাক ফুল কই? উত্তরে রুকি বলে, ক্যান নাকেই তো আছে। 
ঝাঁঝিয়ে উঠে নুরু, নাকে থাকলে কি জিগাই? কী করছোছ ক’?
নুরুর ঝাঁঝালো কণ্ঠে ভয় পেয়ে নাকে হাত দেয় রুকি। টের পায় নাকের ফুল নেই। হয়তো নিচে পড়ে গেছে, তাকায় মেঝের দিকে। 
কিছু বুঝে উঠার আগেই গ্লাসের পানি রুকির চোখেমুখে ছুঁড়ে মারে নুুরু। নে তোর পানি তুই খা। আমি তোর হাতে কিছুই খামু না। তুই অলক্ষুণে। তোর শ্বাসেও বিষ। এই বিষে আমার মরণ হইবো। যা আমার ঘর থাইকা বাইর হ। এই বলে নুরু রুকিকে লাথি দিতে থাকে। টেনে হিঁচড়ে তাকে বের করে দেয় ঘরের বাইরে। 

ক্লান্ত দেহে রুকি ফিরে আসে নিজের গ্রামে। মেয়ের চেহারা দেখে যা বুঝার বুঝে নেয় নেকবর। স্বামীর সাথে ঝগড়া হয়েছে হয়তো। মেয়েকে কিছুই বলে না নেকবর। বুঝতে পারে এখন কথা বললে মেয়েটির কষ্টই শুধু বাড়বে। ভাবে দুয়েক দিন যাক, নিজেই দিয়ে আসবে মেয়েকে।

খুব ভোরে ঘুম ভাঙে নেকবরের। মেয়েকে ডাকতে চায় না, ভাবে ক্লান্ত মেয়েটা একটু বিশ্রাম নিক। চোখ পড়ে পুকুর পাড়ে। এতো ভোরে পুকরপারে জটলা দেখে অবাক হয়। এগিয়ে যায় নেকবর। ভিড় ঠেলে সামনে এগোয় সে। পুকুরে চোখ পড়তেই স্তব্ধ হয়ে যায় নেকবর। পানিতে ভাসছে তার আদরের মেয়ে রুকি, নিষ্প্রাণ। মুখ ঢেকে আছে পারে থাকা ঘাসফুলে। ঝাপসা হয়ে আসে নেকবরের চোখ।

গল্প >> দেখে শেখা : নীহারুল ইসলাম

দেখে শেখা

নীহারুল ইসলাম

আসুর কথামতো গোদাগাড়ির ঘাটে উঠেই তোয়েব আলি যে লোকের সঙ্গ পেয়েছিল, সেই লোকটা তাকে যেখানে নিয়ে এল সেটা একটা কানাগলি। লোকটাকে নিয়ে প্রথম থেকেই তোয়েব আলির শঙ্কা ছিলই, এতক্ষণে মনে ভয় ধরল। সে যেতে চেয়েছিল রাজশাহী ইউনিভারসিটি। যেখানে একজন গল্পকার থাকেন। যার সঙ্গে তার দেখা করা খুব জরুরি। কিন্তু এই লোকটা তাকে কানাগলির ভেতর দিয়ে কোথায় যে নিয়ে যাচ্ছে! সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার মাথা কাজ করছে না। 
অনেক খোঁজ-খবরের পর হাসান সাহেবের ঠিকানা পেয়ে খানিকটা উত্তেজনার বশেই তোয়েব আলি গতকাল সন্ধ্যায় আসুর কাছে গেছিল। আসু তার স্কুল-জীবনের বন্ধু। যদিও মাধ্যমিক পাস করার পর আর পড়েনি। রোজগারের ধান্ধায় কাসিমের ঘাটে লেগে গেছিল। এখনও কাসিমের ঘাটেই থাকে। চাল-ডাল, গরু-ছাগল-মুরগি, মানুষ, ...আরও কত কী যে এপার-ওপার করে তার হিসাব নেই। সেই আসুর কাছে গিয়ে সে বলেছিল, ‘ভাই রাজশাহী যাবো। তুই একটু ব্যবস্থা করে দে।’ 
আসু ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিন্তু এ কেমন ব্যবস্থা? লোকটা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কানাগলির ভেতর কোনও ইউনিভারসিটি থাকে নাকি? তোয়েব আলি নিশ্চুপ থেকে লোকটাকে আর অনুসরণ করতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছেন ভাই? আমি যে ইউনিভারসিটি যেতে চাই। 
লোকটি যেমন হাঁটছিল তেমনি হেঁটে যেতে যেতে বলল, বেশি কথা কইবেন না। চুপচাপ চলে আইসেন আমার পিছু পিছু। কেমন যেন হুকুমের সুর। তোয়েব আলির ভয় আরও বেড়ে গেল। গোদাগাড়ির ঘাটে নৌকা থেকে নেমে এত ভয় পায়নি সে। আসু বলে দিয়েছিল,  ‘ঘাটের ওপরে চায়ের দোকানে বসে থাকবে আমার লোক। তোর কোনো চিন্তা নাই। তুই যেখান যেখান ঘুরবি, যার সঙ্গে ইচ্ছে দেখা করবি, লোকটা তোর সঙ্গেই থাকবে। তোর কাজ হয়ে গেলে তোকে আবার গোদাগাড়ির ঘাটে নিয়ে এসে নৌকায় উঠিয়ে দেবে।’ 
আসুর কথামতো ঘাটের ওপর একটা চায়ের দোকানেই লোকটাকে পেয়েছিল সে। নাকি লোকটাই তাকে পেয়েছিল? দোকানের বাইরের দিকের একটা বেঞ্চে বসেছিল অদ্ভুত ভঙ্গিতে। গভীর মনোযোগের সঙ্গে টিভি দেখছিল। কিন্তু তাকে দেখে তড়াক করে লাফিয়ে উঠেছিল। এতক্ষণ যেন টিভিতেই পদ্মা পেরিয়ে তাকে আসতে দেখছিল। তেমন ঘোর নিয়েই এগিয়ে এসে বলেছিল, আপনি কি আছমহম্মদ ভায়ের দোছত্ লাগেন? ইন্ডিয়া থিক্যা আইছত্যাসেন? আপনার নাম তোয়েব আলি? আপনার কি ভারছিটি যাওয়ান লাগবো? হাছান ছাহেবের ছঙ্গ ছাক্ষাৎ করান লাগবো?
তোয়েব আলি দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে বলেছিল, জী। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি আমাকে চিনলেন কী করে? আর এত সব জানলেনইবা কী করে? 
- ইন্ডিয়ানরে দ্যাখলেই আমরা চিনতে পারি। তাছাড়া আছমহম্মদভাই আমারে সব কইয়া পাঠাইসে। আইছেন ভাই। এহ্যানে দাঁড়াইয়া কাম নাই, আমার ছঙ্গ ধরেন। 
তোয়েব আলি লোকটার সঙ্গ ধরেছিল। খানিকটা হাঁটা পথ। তারপর প্রায় আধ ঘণ্টা কিংবা চল্লিশ মিনিট বাস-জার্নি করে রাজশাহী বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে রিকসা করে যে জায়গাটায় লোকটা তাকে নিয়ে নামল, সেখানে একটা সিনেমা হল আছে। নাম ‘অলকা’। যার গা গেঁষে এই কানাগলি! 

দুই
কানাগলি পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত লোকটা তাকে যেখানে নিয়ে এল সেটা একটা বস্তি। তোয়েব আলির অন্তত তাই মনে হল। সে তাদের গ্রামের পাশেই গোলাপনগর বস্তি দেখেছে। বাঁশের খলপার টাটির ঘর। ওপরে করোগেটেড-টিনের ছাউনি। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অনেকগুলি একই রকমের ঘর। অনেক পরিবার। কাচ্চাবাচ্চা পিলপিল করছে। তাদের ডিঙিয়ে-মাড়িয়ে লোকটার পিছু পিছু একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তোয়েব আলি। ঘরের ভেতরটা আবছা, কেমন এলোমেলো সব! অগোছালো! সেই রকম একটা ঘরে তাকে এনে লোকটা বলল, বহেন ভাই! একটুখানি জিরান ল্যান। ছরবত খান। তারপর ভারছিটি যাওয়ান লাগবো। আপনার চিন্তার কারণ নাই। আমি আছি। আছমহম্মদ ভায়ের দোছত্ আপনি। তার মানে আমারও দোছত্। মুনে করেন এই বাড়ি আপনার নিজের বাড়ি। লোকটা যত সহজে এবং যেভাবে কথাগুলি বলল, তোয়েব আলির মাথায় কিছু ঢুকল না। কোথায় বসবে তাও বুঝতে পারল না। খালি দেখল একজন মহিলা বড় ফুল তোলা কাঁচের গেলাসে সরবত নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। তাকে বলছে, ল্যান ভাই - ধরেন। সরবত খান। সেই কুন পোঁহাতে বেরহ্যালছেন। ঘাটায় খাবার তো দূর পানিও জুটেনি বোধায়। লয় ভাই? 
মহিলা নিশ্চয় লোকটার বউ! তোয়েব আলি অনুমান করে। কিন্তু বুঝতে পারে না একজন মহিলা অপরিচিত এক পরপুরুষের সামনে এত স্বচ্ছন্দ হয় কী করে? যদিও সে মহিলার হাত থেকে সরবতের গেলাসটা হাতে নেয়। মহিলার কথার উত্তরে বলে, জী না। 
ইতিমধ্যে মহিলাকে ঘিরে ধরেছে এক গ-া কাচ্চাবাচ্চা। তারা কিলবিল করতে করতে বলছে, মা সরবত খাবো। মা সরবত দে না গে! ও মা! জোর পিয়াস লেগ্যাছে। 
এই দৃশ্য দেখে তোয়েব আলির হাতের গেলাস হাতেই থেকে যায়। মুখে তুলতে পারে না। 
অথচ বাচ্চাদের দিকে খেয়াল নেই মহিলার। মেহমানকে নিয়েই সে ব্যস্ত। মেহমানের দেশে তার বাপের বাড়ি। বর্ডার পেরিয়ে বহুদিন সে বাপের বাড়ি যেতে পারে না। সে কথা মেহমানকে শোনাতে চায়। তার বাপ-মা কেমন আছে, জানতে চায়। কিন্তু মেহমান সরবতের গেলাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে যে! বসতেও জায়গা দেয়নি। হঠাৎ খেয়াল হতেই শরমে ছিঃ! ছিঃ! বলে উঠে মহিলা। তারপর ছুটে যায় ঘরের বাইরে। মেহমানকে বসতে দেবার জন্য কিছু একটা আনতে বোধহয়। 
লোকটা এতক্ষণ ঘরে ছিল না, কথা বলতে বলতে কখন বেরিয়েছিল খেয়াল করেনি। এখন করল। আবার ঘরে ঢুকে লোকটা প্রচ- ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘরের এক কোনায় একটা কাঠের আলমারি থেকে কী বের করতে করতে বলছে, জলদি করেন ভাই। ভারছিটির ক্লাছ শুরুর আগেই গিয়ে আপনার হাছান ছাহেবেরে ধরতি হবে। নাকি খুব দরের মানুষ। ছময়ের দাম বুঝে। আমি খোঁজ-খবর নি আইলাম। আপনি জলদি ছরবতটা খাইয়া ল্যান। 
এবার আর সরবতের গেলাস হাতে ধরে থাকতে পারে না তোয়েব আলি। পিপাসা তার লেগেই আছে। ধূ ধূ চরে বালির ওপর প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটা চাট্টিখানি কথা নয়। তবু সে হেঁটে এসেছে। হাসান সাহেবের টানে এসেছে। হাসান সাহেবের লেখা একটা গল্প, ‘শকুন‘ পড়ে সে যেমন অভিভূত হয়েছে, অবাকও কম হয়নি! একজন গল্পকার, যিনি বাস করেন বরেন্দ্রভূমিতে। অথচ বাগড়ি পেরিয়ে তিনি গল্প লিখছেন রাঢ়বাংলার পটভূমিতে! আবার এমন একটা গল্প যা বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া লেখা সম্ভব নয়। তোয়েব আলির এমনই মনে হয়েছে। কারণ ‘শকুন’ গল্পের চরিত্রগুলির একটা চরিত্র সে নিজেই। পড়াশুনার পাশাপাশি রাখাালি করেছে। রাখাল বালকদের সঙ্গে অমন শকুন সে কত মেরেছে! যখন মামার বাড়িতে থাকত। শুধু তাই না, তার মামার গ্রামের রাখাল বালকেরা যে ভাষায় কথা বলে, ‘শকুন’ গল্পের চরিত্ররাও সেই ভাষায় কথা বলছে। অথচ ভাষার চরিত্র হচ্ছে প্রতি দশ কিলোমিটার অন্তর অন্তর বদলে যাওয়া। তাহলে এটা কী করে সম্ভব? 
এই সব কারণেই বিনা পাসপোর্টে বন্ধু আসুর সহায়তায় সে ছুটে এসেছে এই বিদেশ-বিভূঁয়ে। যে দেশটায় আবার গণতন্ত্র নেই, সামরিক শাসকের অধীন। বিপদ-আপদের তোয়াক্কা করেনি তোয়েব আলি। যদিও একটু আগে গাইড লোকটার ভাবভঙ্গি দেখে তার মনে ভয় ধরেছিল। এখন কিন্তু সে অনেকটাই স্বাভাবিক। এখন খালি তার ভাবনা কতক্ষণে সে ইউনিভারসিটি পৌঁছবে! হাসান সাহেবের সঙ্গে তার কতক্ষণে সাক্ষাত হবে! ভাবতে ভাবতে ফুল তোলা বড় কাঁচের গেলাসটা মুখে লাগিয়ে চোঁ চোঁ টানে একবারেই শেষ করে ফেলল। গেলাসটা নিচে নামিয়ে রেখে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে বলল, চলেন ভাই। যাই তাহলে এবার! 
- হ্যাঁ ভাই। চলেন যাই। 

তিন
ঘর থেকে বেরিয়ে তোয়েব আলির চোখ পড়ে দরজার বাঁ-দিকে একটা পরিত্যক্ত জায়গায়। ইটের প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীর কোথাও এক ফুট দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তার মধ্যেখানে একটা অবহেলিত শিবলিঙ্গ। পাশেই একটা বেলগাছ দাঁড়িয়ে। জায়গাটাকে ছায়া করে আছে। তোয়েব আলির হঠাৎ-ই মনে হয়, এখনও লোকটার নাম জানা হয়নি। বুরবক কাহেকা! মনে মনে নিজেই নিজেকে গাল পেড়ে তোয়েব আলি লোকটাকে জিজ্ঞেস করে, ভাই আপনার নাম?
লোকটা কানাগলি পেরোতে পেরোতে বলে, আছুভাই আমার নাম বলে নাই আপনাকে? 
বলেছিল কী? হয়ত বলেছিল। তাড়াহুড়ো আর উত্তেজনায় খেয়াল করেনি। তবু তোয়েব আলি মনে করতে চেষ্টা করে। কিন্তু মনে করতে পারে না।
লোকটা তাই দেখে বলে, না বলে ঠিক কামটায় করত্যাসে। 
- কেন? তোয়েব আলি জিজ্ঞেস করে। 
- আমার নাম শুনলে ভয় পাইয়া হয়ত আপনি আছতেনই না। 
- কেন, আপনার নামে কী আছে যে আমি ভয় পেতাম? 
-কিসু তো আসেই। না হইলি মানুষে আমারে ভয় পায় ক্যান? লোকটার চোখমুখে অহঙ্কার ফুটে ওঠে। 

চার
কানাগলি থেকে বেরিয়ে ততক্ষণে ওরা বড় রাস্তায় উঠেছে। লোকটা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। হয়ত রিকসা খুঁজছে। হ্যাঁ, ঠিক তাই। একটা খালি রিকসা যেতে দেখে লোকটা হাঁক ছাড়ল, এ্যই রিকছা রহছ! 
রিকসাওয়ালা তার হাঁক শুনে রিকসা ঘুরিয়ে নিয়ে এল ওদের কাছেই। লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, কোনে যাইবেন জালুভাই? ছঙ্গে মেহেমান দেখত্যাসি। ইন্ডিয়া থেক্যা আইত্যাসে বুঝি? কে লাগে? ভাবীজানের ভাই নাকি? 
- বকবক করত্যাসিছ ক্যান? ভারছিটির গেটে সাইড়া আসবি চল। তার আগে নিউমার্কেটের পেসনটায় চল তো একবার। নিজামে নাছতা খাওয়ান লাগব। ধমকের স্বরে বলল লোকটা। তোয়েব আলি এতক্ষণে লোকটার নাম জানল। জালু। রিকসাওয়ালা সেই নামেই তো ডাকল। নামটা তো বেশ ভালো। জলিল কিংবা জালালুদ্দিন। সংক্ষেপে জালু হয়েছে নিশ্চয়। তাহলে লোকটা কেন বলল যে, নাম শুনে ভয় পান যদি! 
যদিও ব্যাপারটা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবে না সে। ততক্ষণে রিকসাটা ছুটতে শুরু করেছে বড় রাস্তা ধরে। দু’জন পূর্ণ-শরীরের মানুষকে হাড্ডিসার রিকসাওয়ালা ছোঁড়া কীভাবে যে অমন ছুটিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তোয়েব আলি বুঝতে পারছে না। আশপাশ দিয়ে নামী-দামী মোটরগাড়ি ছুটছে। রাস্তার দু’ধারের বাড়ি-ঘর গুলিও বেশ। চর হেঁটে পদ্মা পেরিয়ে এত কাছে এমন একটা শহর বিরাজ করছে, তা তার কল্পনাতেও ছিল না। ভাগ্যিস ‘শকুন’ গল্পটা পড়েছিল!
পাঁচ
কিছুক্ষণেই রিকসাটা এসে দাঁড়ায় এমন এক জায়গায়। সেখানে না আছে নিউমার্কেট না আছে বাজার। আছে বলতে রাস্তার ধারে নয়নজুলির ওপর গোটা গোটা বাঁশের পাটাতন। তার ওপর সার সার খলপার টাটির ঝুপড়ি ঘর। ওই ঘরগুলি আবার এক-একটা হোটেল। কোনোটার নাম আমিনা। কোনোটার নাম মহল। কোনটার নাম কোহিনূর! জালু লোকটা বলল, নামেন ভাই একটু নাছতা কর‌্যা যাওয়ান ভালো। আপনার হাছান ছাহেব আপনাকে কতক্ষণে সাড়ব না সাড়ব! খাওয়ার কথা কইব, না কইব। তার ঠিক নাই। এই আমাদের আমিনা-নিজাম হোটেল আছে। বাঢ়িয়া খানা মিলবে। গেলেই মালুম পাইবেন।
লোকটা তাকে বাড়িতে এক গেলাস সরবত খাইয়ে হোটেলে এনে নাস্তা খাওয়াবে। তোয়েব আলি ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে কূল- কিনারা পাচ্ছে না। রিকসা থেকে নেমে বেবাক দাঁড়িয়ে আছে। 
লোকটা ততক্ষণে ওই সব হোটেলগুলির একটিতে ঢুকে পড়েছে। বাইরে আলকাতরা দিয়ে লেখা ‘নিজাম হোটেল’। তোয়েব আলিও পিছু পিছু গিয়ে ঢুকল সেখানে। মোটা মোটা গোটা বাঁশের পাটাতনের ওপর গজাল গেঁথে বেঞ্চ-হাই বেঞ্চ আটকানো। তাতে বসে অনেকেই খাচ্ছে। হোটেলকর্মী, খরিদ্দারদের হাঁটাচলায় পাটাতন একটু-আধটু দুলছে। কারও কোনওরকম ভ্রুক্ষেপ নেই। কেউ খেতে ব্যস্ত, কেউ খাওয়াতে ব্যস্ত। অথচ তোয়েব আলির ভয় করছে। বাঁশের পাটাতনের নিচেই বিশাল খাল। খালে কাদা-জল সমান সমান। সেই কাদা-জলে অসংখ্য কাক আর কুকুরে দাপাদাপি। কোনও কারণে পাটাতন ভেঙে পড়লে আর দেখতে হবে না। কাক-কুকুরে ছিঁড়ে খাবে। ইতিমধ্যে খানা পরিবেশিত হয়েছে তার সামনে। সে খেয়াল করেনি। লোকটা তাকে খেয়াল করাল, খেয়ে ল্যান ভাই। ঠা-া মারলে আর খাইতে পারবেন না। লোকটার কথায় তোয়েব আলি দেখল চিনামাটির বড় বড় দু’টি প্লেট। একটাতে তন্দুরি। আর একটাতে পায়চা। পায়চা দেখে তোয়েব আলির চোখ কপালে উঠার জোগাড়। গরুর গোটা ঠ্যাং সাজিয়ে দিয়েছে যেন চিনামাটির প্লেটে! সত্যিই বাঢ়িয়া খানা। কিন্তু পায়চার হাড় এত বড় বড় কেন? কীভাবে খাবে? এতবড় হাড় মুখে লাগিয়ে মজ্জা টানা যায় নাকি? হঠাৎ তোয়েব আলির মনে পড়ে যায় মাকে। আব্বাকে। ছোটবেলায় মা যখন আব্বার সঙ্গে ইদের নামাজ কিংবা জুম্মার নামাজ পড়তে পাঠাত। তার যেতে ইচ্ছে করত না। আব্বাও চাইত না সে যাক। বলত, ‘এতটুকু বাচ্চা নামাজের কী জানে যে নামাজ পড়বে?’ 
মা তখন বলত, ‘জানে না বলে কি জানতে হবে না?’ 
‘কীভাবে জানবে? আমার সঙ্গে গেলেই জানা হয়ে যাবে?’ আব্বা জিজ্ঞেস করত। 
মা জোর দিয়ে বলত, ‘আলবত জানা হবে।’ 
‘কীভাবে?’ 
‘কেন, তোমার সঙ্গে নামাজে দাঁড়াবে। তুমি যা করবে, ও তাই করবে। বাচ্চারা তো দেখে-শুনেই বড় হয়।’ 
আব্বা বলেছিল, ‘বাহঃ বেশ তো বুদ্ধি তোমার!’ 
আব্বা সেদিন মাকে রসিকতা করলেও মায়ের সে দিনের সেই বুদ্ধিকে আজ কাজে লাগায় তোয়েব আলি। তার পাশে বসা লোকটা। যার নাম জালু। এই বিদেশ-বিভূঁয়ে যে তার গাইড! সেই লোকটা কী ভাবে পায়চা খাচ্ছে? সে দেখবে। 

ছয়
তোয়েব আলি ভালো করে দেখছে। লোকটা বাঁ-হাতটা পায়চার প্লেটের ওপর ধরে ডান হাতে পায়চার মোটা হাড়টা শক্ত করে ধরে ডান হাতের কবজি বাঁ-হাতের কবজিতে বাড়ি মারছে। আজব ব্যাপার ওতেই ওই মোটা হাড়টার ভেতর থেকে মজ্জা খসে খসে পড়ছে চিনা মাটির প্লেটে। গল্পকারের খোঁজে এসে গল্পের খোঁজ পাচ্ছে তোয়েব আলি। তার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। তার আনন্দে নিচের খালের কাদা-জলে অগুনতি কুকুর লটাপটি খাচ্ছে। কাকগুলি হোটেলের নিচের বদ্ধ হাওয়ায় মুক্ত হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। ওদের সবার উল্লাস ভেসে আসছে তার কানে। একই সঙ্গে মায়ের আঁচল ধরে বস্তির কাচ্চাবাচ্চাদের কান্না শুনতে পাচ্ছে সে। ‘মা খেতে দে না গে মা! এ-মা! পেট জ্বলে যেছে যে গে মা!’ লোকটার ঘরের দরজার পাশে পরিত্যক্ত শিব মন্দিরে শিবলিঙ্গের মাথায় বসন্ত বাতাসে পাশের বেলগাছ থেকে একটা-দু’টো বেল পাতা খসে খসে পড়ছে। তোয়েব আলির চোখে সেই দৃশ্যও ভেসে উঠছে। তোয়েব আলি শুনে শিখছে। দেখে শিখছে। তোয়েব আলি বড় হচ্ছে। 
তোয়েব আলির মা কবরে শুয়ে তৃপ্তি পাচ্ছে।
মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত 

মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

গল্প >> ঘুণ পোকা : সুকুমার রুজ

ঘুণ পোকা

সুকুমার রুজ

আচমকা স্বপ্নটা ভেঙে গেলো বিলাসের। বিদঘুটে স্বপ্ন। আজগুবি। মনের মাঝে স্বপ্নে দেখা বিটকেল লোকটা। অদ্ভুত চেহারা। গায়ের রঙ ফ্যাকাশে সাদা। মাথায় ছোট-ছোট লালচে চুল। চোখদুটো নীল। মুখে গোঁফ-দাড়ির চিহ্ন নেই। তার আজগুবি কথাগুলো মনে পড়ছে বিলাসের। নাকি সুরে কাটা কাটা কথা - আজ থেকে যার দিকে তোমার দৃষ্টি পড়বে, তখখুনি তার মনের ভাবনাটা তোমার মনেও চলে আসবে। বিলাসের হাসি পায়। অন্যের ভাবনা সে জেনে যাবে! সত্যিই স্বপ্নের কোনো মাথামু-ু থাকে না। স্বপ্ন কখনও সত্যিও হয় না। বিলাসের কানে কাক ও অন্যান্য পাখ-পাখালির ডাক। জানলা দিয়ে আবছা আলো ঘরের মধ্যে। ওর এখন বিছানা ছাড়ার ইচ্ছে নেই। হাই তুলে পাশ ফেরে সে। পাশেই বিনতা ঘুমের জগতে। নীলচে আলোয় বিনতার আলগা শরীর দেখতে ভালো লাগে তার। ঘুমন্ত মুখটা যেনো কিশোরীর! কিন্তু এ কী! এ কী হচ্ছে তার মনে! বিনতার স্বপ্ন তার মনে চলে আসছে! আশ্চর্য! বিনতা স্বপ্নে দেখছে গোরাকে। বাড়িওয়ালার ছেলে গোরা। বিনতা ওকে বলছে - গোরাদা! তুমি আর আসো না তো! আগে মাঝে মাঝে আমার ঘরে চলে আসতে। এখন আমাকে তোমার ভাল্লাগে না? ও তো দুপুরে স্কুলে থাকে। আজ দুপুরে চলে এসো না। কতদিন তোমার সাথে গল্প করিনি। জানো তো আমি কতো একা। বিলাস হতভম্ব। বিনতার স্বপ্ন, তার অবৈধ কামনা সত্যি-সত্যিই ওর মনে ধরা পড়েছে। বিলাসের গা ঘিন ঘিন করে ওঠে। ছিঃ! বিনতা এমন! অথচ ও বিনতার সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করছে। কিন্তু ওকে দেখে তো কিছু বোঝা যায় না! না না বিনতা এমন হতে পারে না। এ তারই মনের নোংরামি! অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু সে স্পষ্ট শুনলো যেনো ‘গোরাদা! ...!’ বিলাসের মন অস্থির। সে নিশ্চিত হতে বিছানা ছাড়ে। বারান্দায় বেরোতেই বাড়িওয়ালা গুহবাবুর মুখোমুখি। বাড়িওয়ালার হাতে ধরা ডোবারম্যানের ‘চেন’। মুখে মেকি হাসি। চোখেমুখে অবাক হবার ছাপ ফুটিয়ে প্রশ্ন - কী ব্যাপার বিলাসবাবু! আজ বড় সকাল-সকাল! মর্নিংওয়াক শুরু করছেন নাকি আজ থেকে?
বিলাস হালকা হাসি ফুটিয়ে এমনভাবে ঘাড় নাড়ে যার অর্থ হ্যাঁ বা না দুটোই হতে পারে। গুহবাবুর মুখে হাসি থাকলেও মনে অন্য ভাবনা। বিলাসের মনের পর্দায় অদ্ভুতভাবে সে ভাব ফুটে ওঠে - ব্যাটা মাস্টার! এ মাসেই তোর এগ্রিমেন্ট শেষ। এবার এমন পেছনে লাগবো, পালাতে পথ পাবি না। তারপর আবার নতুন ভাড়াটে। আবার অ্যাডভান্স! আরও ফিক্সড ডিপোজিট। কী আনন্দ!
উঃ! কী পাষ- লোকটা! ব্যবহারে বুঝার উপায় নেই মনে এত প্যাঁচ! যদি সত্যিই বুড়ো বদমাইসি করে তাহলে আবার বাড়ি খোঁজা। আবার নতুন করে সংসার পাতা...! স্কুল-ট্যুইশনির ফাঁকে-ফাঁকে বিদেশী কোম্পানির নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের ‘চেন’টা এই এলাকাতেই করেছে। এই এলাকায় ঘর ভাড়া না পেলে...? নাঃ! স্বপ্নটা তাহলে সত্যি সত্যি ফলছে তো! এতে অবশ্য একটা সুবিধা হলো, আগেভাগে অন্যের মনের ভাবনাটা সে জানতে পারছে। প্রয়োজন মতো ব্যবস্থা সে আগেই নিতে পারবে। তার নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ে এ ব্যাপারটা দারুণ কাজে লাগবে। অন্যের সাইকোলজি...। বিলাসের মনে হালকা খুশি। কিন্তু বিনতার স্বপ্নের কথাটা মনে পড়তেই আবার মন ভারি হয়। এর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। গোরাটা একটা লম্পট। বিনতা কী করে ওর চক্করে পড়লো কে জানে! 
সূর্য উঠতে এখনো দেরি আছে। বিলাসের ট্যুইশনে বেরোনোর সময়ও হয়নি এখনো। কিন্তু বিছানায় গিয়ে শুতেও আর ইচ্ছে হচ্ছে না। বিনতার উপর একটা চাপা রাগ ও ঘৃণা ওর মনে। মনটাও ভালো নেই। অন্যের ভাবনা ওর মনে ঢুকে মনটা চঞ্চল হচ্ছে। রাস্তার দিকে চোখ যায় বিলাসের। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের পাশে ছোট ময়লা ফেলা আস্তাকুঁড়ে কাকগুলো ভিড় জমিয়েছে। অনেক কাক একসঙ্গে খাবার খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। ওদের পাশে-পাশে দু-একটা শালিকও বেশ ভীরু-ভীরু চোখে। রাস্তার ধারে সরু কাঁটামাদার গাছটার মাথায় লাল-লাল ফুল। গাছটাতে পাতা নেই বললেই চলে। সেই ফুলের খোসার উপর একটা দোয়েল বসে ফুল থেকে কী খুঁটে খাচ্ছে কে জানে। সরু গাছটা হাওয়ায় দুলছে। তার সঙ্গে সঙ্গে দোয়েলটাও। বিলাসের চোখে এসব দৃশ্য নতুন লাগছে। এ দৃশ্য দেখার ফুরসত হয় না তার কোনো দিনই। ইচ্ছেও লাগে না। আজ যেনো একটু অন্য রকম। বিলাস চপ্পলে পা গলিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। আজ যখন ভোরে জেগেই গেছে, ভোরটাকে সে উপভোগ করতে চায়। কিছুটা এগোতেই কাকলির মায়ের সাথে চোখাচোখি। কয়েকটা বাড়ি পরেই ওরা থাকে। বিলাসকে দেখে নিস্পৃহ গলায় বলে - কী গো মাস্টার! এত সকালে পড়াতে যাচ্ছো, তোমার ছাত্তরের ঘুম ভেঙেচে এখন? বিলাস হালকা হেসে বলে - না মাসিমা! এখন পড়াতে যাচ্ছি না। এই একটু পায়চারি আর কী! কাকলির মা খোকনদের প্রাচীরের ধারে টগর গাছ থেকে ডিঙি মেরে ফুল তুলতে তুলতে বলে - তা বেশ। ভালো, ভালো। এই মুহূর্তে কাকলির মায়ের মনের ভাবনা বিলাসের মনে - হাড়হাভাতে মাস্টার কোত্থেকে এসে এ পাড়ায় জুটে আমার ‘সব্বোনাশ’ করলো। মুকে যেনো মদু - মাসিমা - আমার চোদ্দপাকের বোনপোরে! এখানে পাড়ার সব ‘টিউশানি’গুলো তুই ধরে নিলি। ওগুলো তো সব কাকলির বাবারই ছিলো। বুড়ো মানুষটা চোকে কম দেকে। ও কি অন্য পাড়ায় পড়াতে যেতে পারে! যাওবা কাকলির বিয়েটা যেমন-তেমন করে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম...! বিলাস এ কথাটা একবারও ভাবেনি। পেনশন না-পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত ওই শিক্ষকের মনোকষ্টের কারণ হয়েছে সে! কিন্তু তার কী করার আছে। ছাত্র-ছাত্রীর বাবা-মা তাকে পড়াতে বললে সে তো পড়াবেই। সে তো টাকা উপার্জন করতেই শহরে এসেছে। এখনই তার খাটার বয়স। যত বেশি রোজগার করে নিতে পারে। তা না হলে পরে তো কাকলির বাবার দশা তারও হবে! তাই কাকলির মায়ের ভাবনাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে। তবুও মনটা কেমন যেনো খিঁচখিঁচ করছে তার। ওই অদ্ভুত স্বপ্নটাই যত নষ্টের গোঁড়া। স্বপ্নটা হঠাৎ সে দেখলোইবা কেনো? আর দেখলোই যদি তা সত্যি সত্যি ফলছেই কেনো? এর আগে কত স্বপ্নই সে দেখেছে - পিএইচডি করে কলেজে লেকচারার হয়েছে কিংবা অমিতাভের মুখোমুখি বসে সব প্রশ্নের সঠিক জবাব দিয়ে ক্রোড়পতি বনেছে। এ স্বপ্নগুলো তো ফলেনি। স্বপ্নে দেখা সেই বিদঘুটে লোকটাইবা কে? মুখটা অনেকটা জর্জ বুশের মতো লাগছিলো। নাকি তার নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের অর্গানাইজার, সে কাল সেমিনারে বুঝাচ্ছিলো কীভাবে মানুষের মনের মধ্যে কিংবা আস্তে আস্তে একদম অন্দরমহলে ঢুকে পড়তে হয়; সেই মানুষটার মুখ ছিলো ওটা? কাল কী সুন্দর অংক কষে বুঝিয়েছিলো ম্যানুফ্যাকচারার টু কাস্টমার। মাঝে ডিলার, সাব ডিলার, রিটেলার, এমনকি বিজ্ঞাপন - সব ওমিট। সেই অংশটা পুরো কমিশন। পার মান্থ অ্যাবাউট টেন থাউজেন্ড। ইয়ারলি ওয়ান ল্যাক টোয়েন্টি প্লাস ইনসেনটিভ। দু’ বছরে বাড়ি-গাড়ি। গুহবাবুদের দলে তারও নাম। ইস হ্যাভিক স্বপ্ন দেখিয়েছে মাইরি! ওটা যদি সত্যি হয় তা হলে তো কেল্লা ফতে! এসব ভাবতে ভাবতে বিলাস কখন পায়ে পায়ে পৌঁছে গেছে পাড়ার পার্কে।

বিলাস বিনতার শরীর থেকে চোখ সরিয়ে নিলেও তার স্বপ্ন কিন্তু ভাঙেনি। স্বপ্নে গোরাদা তাকে কথা দিয়েছে আজ দুপুরে আসবে। বিনতার মনে খুশির হাওয়া। আজ সে গোরাদা’র সঙ্গে দুপুরে গল্প করতে পারবে। ওর মুখ থেকে তার রূপের ভুরি ভুরি প্রশংসা শুনবে। দু’জনে মন খুলে কত কথা, হয়তোবা আরও কিছু...! তাই সে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলছে। বাথরুমে ঢুকেছে বিদেশী কোম্পানির দামি সাবান নিয়ে। বিলাস এ সাবান দিয়েছে তার নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের জন্য চার হাজার টাকার বিনিময়ে পাওয়া কসমেটিক্স ভরা কিটস থেকে। কোম্পানির নির্দেশ আছে-আগে নিজে বাড়িতে ব্যবহার করুন। পড়শি, আত্মীয়স্বজনের ঈর্ষার কারণ হোন। তারপর অন্যকে বিক্রি করুন। সেই সাবান মাখছে তার শরীরে, অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে। এতে নাকি ত্বক হবে আরও উজ্জ্বল ও মাখনের মতো নরম। বাথরুমটা সাবানের গন্ধে ভরপুর। প্লাস্টার চটা, মাকড়শার জাল, বিছানো বাথরুমটা কী করে যে সাদা ধবধবে টাইলসে সেজে উঠেছে। দেওয়ালে বিশাল এক আয়না। পুরো শরীর ধরা পড়ে ওতে। এটাইবা এলো কোত্থেকে। যাকগে, ওসব ভাবার সময় এখন বিনতার নেই। সে তার নিরাবরণ শরীরটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আয়নায়। নিজেকে দেখে উৎফুল্ল সে। আগের চেয়ে হঠাৎ কী করে সে আরও সুন্দর হয়ে গেছে। থুতনির নিচে কী সুন্দর ছোট্ট একটা ঢেউ! আগের চেয়ে আরও ভারি হয়েছে বুক। কোমরে ছোট্ট-ছোট্ট দুটো ভাঁজ। মনের মাঝে কখনো বিলাস কখনো গোরাদা! গোরাদা তাকে দেখলেই কত রূপের প্রশংসা করে। অথচ বিলাসের রূপ দেখার সময় নেই। সে সারাদিনই বাইরে। ট্যুইশনি-স্কুল-কোচিং সেন্টার। ছুটির দিনে কসমেটিক্স ভর্তি ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পড়ে। দু’ বছরের মধ্যে বাড়ি-গাড়ি করবেই সে। তখন নতুন বাড়িতে বিনতাকে রাণী করে রাখবে। নতুন গাড়ি চড়িয়ে গঙ্গার ধারে হাওয়া খেতে নিয়ে যাবে। তাই এখন তার কথা বলারও ফুরসত নেই বিনতার সঙ্গে। শুধু রাত্রিবেলায় যা...! বিনতার রূপচর্চার শেষ পর্ব চলছে এখন বিলাসের এনে দেওয়া পছন্দসই দামি লিপস্টিকের ছোঁয়ায়। তারপর সে সারা গায়ে ছিটিয়ে নেয় বিদেশী বডি-¯েপ্র মিন্ট। বিলাস বলে এর গন্ধটা খুবই কামোত্তেজক। এমন মাদকতা এর গন্ধে, যে কোনো পুরুষকে কাবু করে দিতে পারবে। আজ বিনতা এর প্রমাণ পেতে চায়। ওই যে দরজায় খটখট শব্দ। বোধহয় গোরাদা এলো। শব্দটা এবার বেশ জোরে। বিনতার ঘুম ভাঙে। কানে আসে কাজের মেয়ে ডলির ডাক - ও বৌদি। এখনও জাগোনি। ঘুম ভাঙতে এত দেরি তোমাদের!
এখনো সূর্য ওঠেনি। পূব-আকাশে লালচে আভা। বিলাস ভোরে ওঠেনি বহুদিন। সূর্য উঠা কতদিন দেখেনি। ওর আজ সূর্য উঠা দেখার ইচ্ছে হয়। কিন্তু ওর মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বিনতার স্বপ্ন। আচ্ছা বিনতা কি সত্যিই এ রকম? সে কি সত্যিই ওই নচ্ছার গোরাটার সঙ্গে মাখামাখি করছে তার ঘরে না থাকার সুযোগ নিয়ে। আচার ব্যবহারে তো কিছু বুঝা যায় না। যেনো খুবই ‘পতিব্রতা’ নারী। স্বামীর সুখ-সুবিধার জন্যই সে সারাটা দিন ব্যস্ত থাকে এমন ভাবখানা তার! মনের মধ্যে যেসব চিন্তা ঘুরে বেড়ায় সেগুলোই স্বপ্নে আসে বলে শুনেছে। তাহলে বিনতা নিশ্চয় কখনো-সখনো গোরার কথা ভাবে। স্বপ্নটা সে গোরাকে নিয়ে দেখছিলো এটা ঠিক। এ তার নিজের মনের বিকৃত ভাবনা নয়। কেননা শুধু বিনতার স্বপ্ন নয় বাড়িওয়ালা গুহবাবু কিংবা কাকলির মায়ের মনের কথাও সে জানতে পেরেছে স্বপ্নের গুণে। নাঃ, সূর্য রোজই উঠবে। যেদিন হোক দেখলেই চলবে। বিনতাকে আজ একটু বাজিয়ে দেখে নেওয়া যাক, এই ভেবে বিলাস পার্ক থেকে উঠে পড়ে। 
বিনতা বিলাসকে বিছানায় না দেখতে পেয়ে ভেবেছিলো বাথরুমে গেছে। ডলির ডাকে বিছানা ছেড়ে দরজা খুলতে গিয়ে দেখে দরজার খিল খোলা। তাহলে বিলাস নিশ্চয় বাইরে বেরিয়েছে। কিন্তু এত সকালে কোথাও তো যায় না! বিশেষত তাকে না বলে বেরোনো এই প্রথম। বিনতা কিছুটা চিন্তায় পড়ে। ডলিকে শুধায় - কী রে তোর দাদাবাবুর সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলো? ডলি তার স্বভাবগত ভঙ্গিতে উত্তর দেয় - কী করে দেখা হবে? দাদাবাবুর রাস্তা আর আমার রাস্তা কি এক? আমি এ বাড়ি ও বাড়ির পাশ দিয়ে, গলিঘুঁচি দিয়ে...! বিনতা হালকা ধমক দেয়, থাম। তুই বড্ড বেশি বকিস। ডলি বিনতার গলার স্বরে মনের ভাবগতিক বুঝে চুপ করে যায়। প্রতিদিন সকালটা এক নির্দিষ্ট ছকে চলে বিনতার। আজ কেমন যেনো এলোমেলো হয়ে গেছে। এই সময় সে চা বানিয়ে. বিছানায় বিলাসকে এক কাপ আর ডলিকে এক কাপ দিয়ে বারান্দায় গ্রিলের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আয়েস করে চা খায়। চা খেতে খেতে দেখে আস্তাকুঁড়ে কাকেদের লড়াই, আকাশে উড়ন্ত সঙ্গহীন চিল কিংবা সামনের বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা গা-উদোম মানুষটাকে। শোনে ময়লা ফেলা ঠেলাগাড়ির ঘর্ঘর শব্দ, দূরে কারখানার সাইরেন কিংবা বাড়িওয়ালার বাথরুম থেকে ভেসে আসা গোরাদার বেসুরো গান। আজ সে চা বসায়নি। ডলিও কাজে ধরতাই পাচ্ছে না। রোজ সে দরজার চৌকাঠে বসে চা আর একটা টোস্ট খেয়ে, তিনজনের কাপ তুলে নিয়ে বাসন মাজতে বসে। সে আজ এখনো বাসন মাজা শুরু করেনি। একটু উসখুস করে ডলি বলে - কী গো বৌদি আজ এখনো চা বসালে না! মন ভালো নেই বুঝি! দাদার সঙ্গে কিছু হয়েছে নাকি গো? ডলির কথা না শোনার ভান করে বিনতা গ্যাস জ্বেলে চা বসায়। আজ একটু অন্যমনস্ক সে। কেনো যেনো হঠাৎ তার মনে পড়ছে বিয়ের পর প্রথম দিকের দিনগুলোর কথা। শ্বশুর, শাশুড়ি, আইবুড়ো ননদ। ভোর হতে না হতে গৃহস্থালি কাজ, শ্বশুরের ফরমাইশ, শাশুড়ির সাংসারিক জ্ঞান দেওয়া। কী বিতিকিচ্ছি ছিলো সে দিনগুলো। তার মোটেই ভালো লাগতো না। একটু অন্য রকম কাটতো শনিবার সন্ধ্যে থেকে রবিবার সারাটা দিন। সপ্তাহ শেষে বিলাসকে নতুন নতুন লাগতো তার। অনেক বাদ-বিসম্বাদ, মান-অভিমান ও অনেক নাটকীয় ঘটনার পর এই ভাড়াবাড়িতে চলে এসে সে যেনো হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলো। কিছুদিন পরেই অবশ্য তার খারাপ লাগা শুরু হয়েছিলো এখানে। বিলাস ঘরে থাকতে দু’ একটা কথা কিংবা ডলির বকবকানি থামাতে কিছু কথা খরচ করা ছাড়া সারাটা দিন মুখ বুজে একা একা। আজ যেনো হঠাৎ সেই খারাপ লাগাটা বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে প্রথম দিকের সেই দিনগুলোই বোধহয় ভালো ছিলো। কখনোও একা হওয়ার সময় পাওয়া যেতো না। এখানে বিলাস সারা দিনই বাড়ির বাইরে। এখন তো কী এক চেন সিস্টেমের ব্যবসাতে নেমে রাতেরও কিছুটা সময় বাইরে কাটায়। প্রতিবেশী মেয়ে কিংবা বৌগুলোর চোখে চোখ রেখে দেখেছে - সে চোখে কোনো ভাষা নেই। নির্বিকার, অচেনা কিংবা অবাঞ্ছিত। একদিন হঠাৎ বাড়িওয়ালার ছেলে কী এক দরকারে বিলাসের খোঁজ করেছিলো - বৌদি দাদা ঘরে নেই? বোধহয় এখানে আসার পর তার উদ্দেশ্যে অজানা পুরুষের কণ্ঠ শুনেছিলো সেই প্রথমবার। হঠাৎ সে উচ্ছল হয়ে উঠেছিলো। ইচ্ছে করেই একটু বেশি সময় কথা বলেছিলো গোরার সঙ্গে, যার গলার বেসুরো গান রোজ সকালে চা খেতে খেতে শোনে। গোরাও তাকে কিছুটা সময় দিয়েছিলো কিংবা তার শরীরটা জরিপ করতে কিছুটা সময় নিয়েছিলো। বিনতা খুশি না হলেও অখুশিও হয়নি। তারপর কখনো-সখনো গোরা দু’-একবার কথা বলেছে - কী বৌদি ভালো আছেন? কিংবা বাঃ, দারুণ লাগছে তো আজ আপনাকে। প্রথম দিন একটু বেহিসেবি হলেও পরে কখনো গোরার সঙ্গে কথা বলতে সে হিসেবি হয়েছে। গোরাদার চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করেছে। ব্যস, এটুকুই। এর বেশি কিছু নয়। তবুও গোরাদার কাছে সে একটা ব্যাপারে কৃতজ্ঞ, গোরাদা তার একাকীত্বের স্থির জলে ঢিল ছুঁড়ে যেনো জলটাতে ছোট্ট ঢেউ তুলে দিয়েছে। সেই গোরাদাকে নিয়ে কেনো যে আজ এসব স্বপ্ন দেখলো, সেটাই তার মাথায় আসছে না। কোনোদিন সে জ্ঞানত এসব কথা ভাবেনি। ভাবতেও চায় না। তার গ্রামে বেড়ে ওঠা জীবনের চিন্তা ভাবনায়, মানসিকতায় এটা পাপ। কিছু না করলেও শুধু স্বপ্ন দেখাটাই তার মনে পাপের কাঁটা ফোটাচ্ছে। সেই জ্বালাটাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে ভোর বেলায় কিছু না জানিয়ে বিলাসের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া। কত সাত-পাঁচ চিন্তা তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ডলি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলে - এমা! বৌদি তোমার আজ কী হয়েছে বলো তো! চা বসাতেই মনে ছিলো না। যদিওবা চা করলে চিনি দাওনি চায়ে। আরে বাবা! ঘটি-বাটি একসাথে থাকলে ঠোকাঠুকি হয়। মানুষ তো দু’জন। ঝগড়া মানেই জানবে ‘পেরেম’ জমবে ভালো।
বিনতা এক চামচ চিনি ডলির কাপে চামচসহ ঠকাস করে ডুবিয়ে দিয়ে বলে - আঃ! ডলি কী হচ্ছে, কী শুধু বকরবকর! তোকে কে বলেছে তোর দাদাবাবুর সাথে আমার ঝগড়া হয়েছে? চা খেয়ে নিজের কাজ কর। বিনতা ভাবতে থাকে, সে নিজেই ডলিকে মাথায় তুলেছে। প্রথম প্রথম ডলি চুপচাপ কাজ করে চলে যেতো। ডলি বিকেলে বাসন ধুতে এলে বিনতা নিঃসঙ্গতা কাটাতে ওর সাথে এটা ওটা কথা বলা শুরু করায় ওর বাচালতা বেড়ে গেছে।

বিলাস পার্ক থেকে সোজা বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। এখন তার মনজুড়ে বিনতা আর গোরা! আচ্ছা বিনতা স্বপ্নে বলেছিলো - ‘গোরাদা। তুমি আর আসো না তো! আগে মাঝে মাঝে আমার ঘরে চলে আসতে।’ সত্যিই কি গোরা তার ঘরে আসে ওর না-থাকার সুযোগ নিয়ে! বিনতা কোনোদিন এ কথা বলেনি। একদিন শুধু ওর খোঁজে গোরা বিনতার সঙ্গে কথা বলেছিলো, সেও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। এ কথা বিনতা তাকে বলেছিলো। তারপর কি গোরার সঙ্গে মাখামাখি বেড়েছে! সে রকম হওয়ার কথা নয় অবশ্য। এতদিনে বিনতাকে সে যা বুঝেছে...। আসলে গোরা ছেলেটা সুবিধের নয়। ওর উলুক-ঝুলুক স্বভাব আছে বলে শুনেছে। কিন্তু এমনিতে ও যথেষ্ট ভদ্র। তার সঙ্গে সম্মান দিয়েই কথা বলে গোরা। ওকে যদি এখন সে দেখতে পেতো তাহলে ভালো হতো। ওর মনের কথাগুলো জানতে পারতো। ঠিক আছে, কিছুক্ষণ পরই গোরা বেরোবে বাড়ি থেকে। তার আগে বিনতার মনের ভাষাটা একটু পড়ে নেওয়া যাক।

ডলিকে চা দিয়েছে, কিন্তু নিজের জন্য কাপে চা ঢালেনি বিনতা। সে অপেক্ষা করতে থাকে বিলাসের জন্য। নিশ্চয় বিলাস কাছেপিঠে কোথাও গেছে। নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের ব্যাগটা তো নিয়ে বেরোয়নি যে দূরে কোথাও যাবে। ট্যুইশন করতে বেরোনোর সময়ও হয়ে এলো। ওই ঘোড়ার ডিম সাবান, সাবানের ব্যবসাটা শুরু করার পর থেকে ট্যুইশনটাও মাঝে মাঝে কামাই হচ্ছে। ‘ব্যবসা’ বললে ওঁর আবার রাগ হয় - বলে এটা ব্যবসা কে বলেছে? এ হলো এক বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির মেম্বারশিপ নেওয়া। কোনো জিনিস বিক্রি না করলেও চলবে। শুধু তিনজন সদস্য বাড়াতে হবে। আমার দায়িত্ব শেষ। এবার তারা সদস্য বাড়াবে। আামি ঘরে বসে কামাবো। তুমি দেখো না বিনু, দু’ বছরের মধ্যে আমি ভাড়া-বাড়ি ছেড়ে দেবো। নিজের বাড়ি হবে। চাই কি দু’ চাকাও... বলে খ্যাক-খ্যাক করে হাসে। হাসি থামিয়ে বলে - আমি কি এতোই বোকা, ‘চেন’-এ তিনজন নামিয়ে গায়ে হিমজল ঢেলে বসে থাকবো। কোম্পানি থেকে বেশি-বেশি মাল তুলবো। এত বাড়িতে ছেলেমেয়ে পড়াই। তাদের বাড়িতে দু’-একটা করে পুশ করলেই কমিশন প্লাস একস্ট্রা লাভ। বিলাসের চোখে ঝিলিকের কথা মনে পড়ে যায় বিনতার। বিনতার তখন সেটা দেখে ভালো লাগেনি। বিলাস যতোই বলুক - ব্যবসা নয়। এটা তো আসলে ব্যবসাই। ব্যবসা তার কোনোদিনই পছন্দ নয়। বর্ধমানের এক বড় ব্যবসায়ী পাত্রকে সে বাতিল করে বাবার মনে দুঃখ দিয়েছিলো। বিলাসকে অবশ্য এসব কথা বলেনি। বলেছিলো - তুমি শিক্ষক, তোমার আলাদা একটা সম্মান আছে। ওদেরকে এসব বিক্রি করতে গেলে ওদের চোখে তুমি ছোট হয়ে যাবে গো! মুখে কিছু না বললেও ওরা তোমাকে আগের মতো সম্মান দেবে না। আর আমাদের এত টাকার দরকারইবা কী! সরকারি স্কুলে চাকরিটা আছে। দু’ বেলা ট্যুইশনিও করছো। আমাদের ছেলেপুলেও হয়নি এখনো। বিলাস মুখ ঝামটা দিয়েছিলো - তুমি থামো তো! হয়নি বলে কি আর হবে না? নিইনি তাই হয়নি। শহরে ছেলে মানুষ করার খরচ জানো? আর ভাড়া-বাড়িতেইবা কতোদিন থাকবো? এই তো সামনের মাসে এগ্রিমেন্ট শেষ। আবার অ্যাডভান্স দিতে হবে তারপর রি-এগ্রিমেন্ট। মাসে মাসে হাজার টাকা ভাড়া গোনা তো আছেই। আজকালকার দিনে ওসব সম্মান-টম্মানের কোনো মূল্য নেই, বুঝলে? আসল জিনিস হচ্ছে টাকা। যার টাকা আছে তার সম্মান আছে। বিনতা চুপ করে গিয়েছিলো। মনে মনে বলেছিলো - তোমাকে কী করে বুঝাবো যে, আমাদের গ্রামে কোনো অনুষ্ঠান হলে গ্রামের মানুষ আমার বাবাকে সম্মান দেখিয়ে সভাপতি করে নিয়ে যায়, পেনশন না-পাওয়া গরিব রিটায়ার্ড শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও। অথচ গ্রামের সবচেয়ে পয়সওয়ালা বরেণ দত্ত সেই অনুষ্ঠানে সাধারণ শ্রোতা হয়ে সামনে সারি দেওয়া বেঞ্চিতে বসে বাবার ভাষণ শোনেন। শুধুই টাকাই সবকিছু নয়। সেই টাকার পিছনে ছুটতেই কি বিলাস ভোরবেলা কোথাও বেরোলো? নাকি অন্য কোনো কাজে। এসব ভাবতে ভাবতে বিনতা চায়ের কেটলিটা আবার গ্যাসে বসায়। 
দরজায় খটখট শব্দ। ওই বুঝি বিলাস এলো। বিনতা ছুটে গিয়ে দরজা খোলে। না - বিলাস তো নয়। বারান্দায় একজন অচেনা যুবক। বিনতা দু’ পা পিছোয়। যুবকের ভারি গলা - স্যার আছেন? 
- না একটু বেরিয়েছেন। কিছু বলতে হবে?
- বেরিয়েছেন? আমাকে সকালে এই সময়ে স্যার আসতে বলেছিলেন।
- কিন্তু উনি তো... আচ্ছা আপনার নাম?
- আমি প্রলয়। প্রলয় গুপ্ত। স্যার আমার ভাইকে পড়ান। 
গলাটা চেনা মনে হতে ডলি দরজার সামনে আসে। প্রলয়কে দেখে বলে - ও গুপ্তবাবুর ছেলে। আমি ওদের বাড়িতেও কাজ করি। কী গো প্রলয়দা কী ব্যাপার?
- ও ডলি, তুই এখানেও কাজ করিস! আমি স্যারের সঙ্গে একটু...। 
বিনতা বলে - আপনি ইচ্ছে করলে অপেক্ষা করতে পারেন। এখুনি এসে যাবে হয়তো! প্রলয় দরজার বাইরে জুতো খুলে ঘরে গিয়ে বসে। বিনতা কেটলি থেকে এক কাপ চা ঢেলে প্রলয়কে দেয়। প্রলয় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে থাকে ঘরের ভিতর কালার টিভি, ফ্রিজ, আলমারি, বইভর্তি র‌্যাক এবং মাঝে মাঝে আড় চোখে বিনতাকে। 
বিলাস বারান্দায় উঠেই চমকে ওঠে। দরজার সামনে এক জোড়া জুতো। ছেলেদের। কে আবার এলো সাত সকালে। ভোরবেলায় সে যখন বেরিয়ে গেছে তখন বিনতা ঘুমাচ্ছিলো। এর মধ্যে তার না থাকার সুযোগে বদমাইস গোরাটা ঢুকেছে নাকি ঘরে! তা যদি হয় তাহলে দুটোকেই আজ ‘মার্ডার’ করে ফেলবে, তারপর যা আছে কপালে। দরজায় কড়া নাড়তে গিয়েও বিলাস থেমে যায়। দরজার ফুটোতে কান লাগায়।
বিলাস না আসায় বিনতা নিজের কাপে চা ঢেলে নেয়। ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে প্রলয়কে জিজ্ঞেস করে - আপনি কী করেন? প্রলয় হালকা হাসে তেমন কিছু করি না। বেকারই ধরতে গেলে। তাই স্যার বলেছিলেন কী একটা ব্যবসার কথা বলবেন। প্রচুর লাভও আছে নাকি! ও ব্যাপারেই আমাকে আজ আসতে বলেছিলেন। 
বিলাস শুনতে পায় ঘরের ভিতর পুরুষ কণ্ঠ। তার মনে যেনো আগুন ধরে যায়। দরজায় কড়া নাড়ে খুব জোরে, খটখট-খটখট! বিনতা চায়ের কাপ হাতে এসে দরজা খোলে, বিলাসকে দেখে তার চোখে একরাশ প্রশ্ন। বিলাসের চোখে আগুনের ফুলকি। বিনতাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে সে। প্রলয় ততক্ষণে চায়ের কাপ রেখে উঠে দাঁড়িয়েছে।
- গুড মর্নিং স্যার। 
বিলাসের মুখে কোনো কথা বেরোয় না।
- স্যার আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন সকালে।
বিলাস নিজের মধ্যে নিজেকে ফিরে পায় যেনো! বলে - হ্যাঁ বসো, কতক্ষণ এসেছো?
- এই মিনিট পাঁচেক হলো।
বিলাসের মনে পড়ে যায় নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের চেনে প্রলয়কে নামতে কনভিন্স করার জন্য ওকে আসতে বলেছিলো। 
বিনতা বিলাসের ব্যবহারে চমকে ওঠে। এমন তো কখনো করে না। সে হতভম্ব হয়ে দরজার সামনে দাঁড়ায়। প্রলয়কে ঘরে বসতে বলায় ও কি রাগ করেছে? নাকি অন্য কোনো সমস্যা? দেখেও কেমন-কেমন লাগছে! বিলাসকে চা দেওয়ার কথাও ভুলে যায় বিনতা। বিলাস প্রলয়ের দিকে তাকায় পূর্ণদৃষ্টিতে। ওকে নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য প্রস্তুতি নিতেই হয়তোবা। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। প্রলয়ের মনের মাঝের ভাবনাটা ওর মাঝে চলে আসে - বাঃ, মাস্টার ভাড়া বাড়িতে থাকলেও মালদার পার্টি আছে। ঘরে কালার টিভি, ফ্রিজ, মিউজিক সিস্টেম কী নেই! বৌটাও খাসা। সরেস জিনিস। দেখি কী ব্যবসার কথা বলে মাস্টার! যাই হোক লটকে যাবো। তাহলে পিসটাকে মাঝে মাঝে মাপা যাবে। ওর হাতের মিষ্টি চায়ের কাপে চুমু খাওয়া যাবে। খেলোয়াড় তো আমি কম পাকা নই। তেমন তেমন সিগন্যাল পেলে...।
বিলাসের রগের শিরা ফোলে। হাতের মুঠি শক্ত হয়। চোখদুটো যেনো বাঘের চোখ। সহসা সে চিৎকার করে ওঠে - বেরিয়ে যাও ঘর থেকে। প্রলয় চমকে ওঠে। বিনতা ভয় পায়। ডলি কলঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে। 
- কী হয়েছে বৌদি? দাদাবাবু রাগারাগি করছে কেনো?
বিনতা আস্তে আস্তে নিজের মনেই যেনো বলতে থাকে - কী জানি - মানুষটার কিছু গ-গোল হলো কি না - ঠাকুর এ তুমি কী করলে! প্রলয় দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে মাস্টারকে দেখে হয়তোবা ভয় পেয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বিলাস হঠাৎ তার নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়।

বিনতা ও ডলি একে অপরের দিকে চেয়ে চোখের ভাষা বুঝার চেষ্টা করে।

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

গল্প >> খাঁচা : আবদুল হাই মিনার

খাঁচা

আবদুল হাই মিনার

গরমপানির কাছাকাছি আসতেই সকাল গড়িয়ে দুপুর।
জলপাইগুড়ির রাস্তাগুলো এদিকে ততো সুবিধের না। পাহাড়ের ঢালে আর টিলার কোলের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা উঁচু-নীচু রাস্তা। ঝাঁকুনিতে  গাড়ির  যেমন  জান  বেরিয়ে  যাওয়ার  জোগাড়,  তেমনি মানুষেরও। মাঝখানে কতোগুলো চা-বাগান পড়েছিল পথের মাঝে। অইটুকু পথে ওদের গাড়ি   যেন উড়ছিল। খুব ভালো লেগেছিল জায়গাটা পেরোতে। নিশ্চয় চা-বাগানের বাবু সাহেব আর শ্রমিকরা খুব যতœ-আত্তি করে সড়কগুলোর! ফেব্রুয়ারির এই ঝলমলে সকালে বুবুনরা যখন শিলিগুড়ির ঝুমরাতি থেকে রওনা দিয়েছিল বাতাসে তখনো হিমের ভাব মিলোয়নি। এদিককার লোকজন শীতকে বলে জাড়। তো, রাস্তায় জাড়ের একটুও কমতি ছিল না সকাল দশটা পর্যন্ত। শিরীষ-মেডেলা আর চাপালিশের গায়ে কুয়াশার চাদর লেপ্টে ছিল সিগারেটের ধোঁয়ার মত। বানর আর হনুমানের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো খেলছিল রাস্তÍার ওপর। কেমন দুষ্টু একেকটা! মানুষজন বা গাড়ি-ঘোড়াকে যেন তাদের মোটেই ভয় নেই। বরং বুবুন আর সোনমকে ভেঙাচ্ছিল তাচ্ছিল্যভরে। দুপুর গড়ানোর আগেই সব কিছু বদলে গেল। ওম ওম গরম বাতাস বইতে লাগল বনের মাথার ওপর দিয়ে। ছোট ছোট জঙ্গলি জন্তু-জানোয়ারের জায়গায় বুনো হাতি আর মোষের দেখা মিলতে লাগল পথের ধারের বনে আর নালা-ঝরণার কিনারগুলোয়। আরো কত দূর যাওয়ার পর পাতার ফাঁকে ফাঁকে লোকজনের বসতবাটিও চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। শন-ছাওয়া মাটির কুটির। গরু-ছাগল আর ভেড়া নিয়ে রাখালছেলে মাঠে বেরিয়েছে। লাল মাটির পথে মানুষের যাতায়াতও চোখে পড়ার মত। ছোট্টো একটি মেয়ে পাহাড়ের ঢালের টলটলে জলের ঝরণায় হাতমুখ ধুচ্ছে।
বুবুনের বাবা বললেন,- ‘এ’টা হল গিয়ে পশ্চিম দিনাজপুর। আধঘণ্টা আগে আমরা শিলিগুড়ি পেরিয়ে এসেছি। আর, ওই যে, ওই পূবদিকে দেখ, ফাঁসিদেয়া, ওটা বাংলাদেশ। ওই যে           বর্ডার!’
বুবুন আর সোনম গাড়ির কাঁচ নামিয়ে পূবের দিকে তাকাল। কতগুলো ঘর-বাড়ি দেখা গেল। আর সেগুনের বন। রাস্তাটা ধূলায় ধূলাক্কার!
মা বললেন,- ‘ওফ্, ধূলার জ্বালায় বাঁচি না! কাঁচ তোল্, আমার চোখ জ্বালা করছে।’
ওরা তাড়াতাড়ি কাঁচ উঠিয়ে নিল। বাংলাদেশ দেখা হল না ভাল করে।

দু’দিনের কড়ারে বাবাসহ বুবুনের মায়ের বাপের বাড়ি বিধাননগর যাচ্ছে ওরা। একদিন আগে ওরা ছিল দার্জিলিং। সেখান থেকে যাত্রা শুরু করে কার্সিয়ং পাংখাবাড়ি হয়ে শিলিগুড়ি এসে পৌঁছেছিল। রাত্রিবাস গার্গীকাকী আর সেজকাকুর জাঙ্গল-কাটেজে। রাত্তিরে মুগডালের খিঁচুড়ির সাথে হরিয়ালের রোস্ট, আর ভেড়ার মাংসের ভুনা দেয়া হয়েছিল খাবার টেবিলে। বুবুনের মা বললেন,- ‘ভেড়ার মাংস না ছাই, আসলে-’ তারপরই গার্গীকাকীর চোখ টেপায় চুপ করে গেছিলেন। বুবুন সোনমরা বুঝতে পেরেছিল আসলে হরিণের মাংসই খাওয়া হচ্ছে। আইনের মানুষ তাদের বাবাও আইন অমান্য করে আগ্রহভরে সেই মহার্ঘ মাংস খেয়ে চলেছিলেন।

একটু পরেই ওরা দেখে কী, রাস্তাটা দু’ভাগ হয়ে দু’দিকে চলে গেছে।
বুবুনদের গাড়ি আগে আগে চলছিল। পেছনে আসছিল ওদেরকে এস্কর্ট করে আসা পুলিশের পিকআপ ভ্যান।
গাড়ি বাঁয়ের সড়কে পড়তেই পেছন থেকে ড্রাইভারকে জানান হল ওটা সঠিক পথ নয়। ডানের সড়কে চল।
গাড়ি পিছিয়ে এসে আবার ডান দিকে চলতে লাগল।
কতদূর যাওয়ার পর এক অদ্ভুত দৃশ্য ওদের চোখে পড়ল।
সার বেঁধে একদল লোক কোথায় যেন চলেছে। অসংখ্য লোক।
মা বললেন,- ‘পিঁপড়ের সারি!’
‘সামনেই মেলা-টেলা আছে বোধহয়।’ বাবা বললেন।
কিন্তু আরো অনেকদুর আসার পরও কোন মেলা বা সভা সমাবেশের পাত্তা পাওয়া গেল না! লোকগুলো চলেছে তো চলেছেই, থামাথামির নাম নেই।
ওদের যেন বিরামহীন পথ-চলা!
ওরা কোথাও থামবে না, ওদের ক্লান্তি নেই। পৃথিবীটা যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে সেখানে গিয়ে বুঝি ওদের পথ-চলা থামবে।
বাবা ভারি অবাক হয়েছেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে আছে।
মা বললেন,- ‘চলেছে কোথায় ওরা, আশ্চর্য তো!’
‘গাড়ি থামিয়ে একটু খোঁজ নেয়া যায় না?’ বুবুন বলল।
ড্রাইভার একটুকু ঘাড় ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকাল। গাড়ি থামাবে কি না, তারই অনুমোদন- প্রতীক্ষা।
বাবা বললেন- ‘হ্যাঁ, গাড়ি থামাও। ব্যাপার কী জিজ্ঞেস কর!’
জিজ্ঞেস করায় জানা গেল, চলেছে ওরা আব্বাস আদমের ডেরায়, খাঁচা দেখতে।
‘খাঁচা!’ বাবার চোখ কপালে উঠল।
মা বললেন- ‘খাঁচা দেখতে এ’ভাবে সার বেঁধে, পাগল নাকি! কিসের খাঁচা!’
কিন্তু লোকগুলো আর কিছুই বলছে না, জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে ছুটছে তারা আঙরাবাড়ির দিকে। সেখানেই আব্বাস আদমের ডেরা।
বাবা ড্রাইভারকে আরেকটু তথ্য-তালাবি করতে বললেন। ড্রাইভার অনিন্দ্য সুর আসামের গোয়ালপাড়ার মানুষ, এদিককার ধুর-ধার বোঝে ভাল। অনেক ঝুলাঝুলি করল লোকগুলোর সাথে, কিন্তু নূতন আর কোন তথ্য ওদের কাছ থেকে আদায় করতে পারল না।
‘আঙরাবাড়িটা কোথায় জানা যাক।’ বাবা বললেন। ‘কাছাকাছি হলে একটা চক্কর মেরে আসা যাবে। কি অদ্ভুত কা-, খাঁচা দেখতে মানুষ এ’ভাবে ছুটতে পারে ভাবা-ই যায় না!’
মাও চোখ কপালে তোলে বললেন,- ‘কি অশৈলী কা-!’
বুবুন আর সোনমের পোয়াবারো। মাঝপথে একটু থামা যাবে, হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খাওয়াও চলতে পারে। আরো কত মজা যে পথের মাঝে লুকিয়ে আছে কে জানে।
গাড়ি এবার চলল আঙরাবাড়ির পথে। মাত্র একটুখানি পথ। মিনিট দশেকের মাথায় গাড়িটা হড় হড় করে নেমে এলো একটা নাবাল মত জায়গায়।
সামনেই সারি সারি ঘর। বিরাট গাঁও। লোকজনে থিক থিক করছে। খাঁচা-দেখতে-আসা তামশগির জনতার ভিড়ে গ্রামটা নরক।
মা নাক সিঁটকে বললেন- ‘এম্মা, এ’ কোথায় নিয়ে এলে গো!’
বাবা কিছু না বলে গাড়ি থেকে নামলেন। তাঁর চোখেমুখে অঘোর বিস্ময়! বুবুন আর সোনমও নামল। ড্রাইভার অনিন্দ্য ওদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। ওদের গাড়ির পেছনে ততক্ষণে পুলিশের পিকআপ ভ্যানখানাও এসে থেমেছে। তামশগীর জনতা পুলিশ দেখে একটু যেন ভয় পেয়েছে। তাদের হৈ-হল্লা থেমেছে।
গাঁয়ের পথে একটুখানি এগিয়ে যেতেই বেশ ফাঁকা একটি জায়গা চোখে পড়ল। সেই ফাঁকা জায়গা ঘিরে সার বেঁধে তামশগির মানুষের ভিড়। এখানে এই মানুষগুলো নিস্তব্ধ। চুপচাপ তারা অবাকবিস্ময়ে তাকিয়ে আছে বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরী অর্ধসমাপ্ত বে-ধারা ধরনের বিশাল এক     খাঁচার দিকে। অন্তত শ’ চারেক হাত দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বেড় দিয়ে খাঁচাটা আস্তে আস্তে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। মুরগির খাঁচা! আব্বাস আদম ও তার বউ-ছেলেমেয়েরা আড়াইমাস ধরে খাঁচাটা বানাচ্ছে।
আব্বাসের বউ, আর আব্বাস নিজে, আর, তার ছেলেমেয়েরা একটুকু খচ্চর। নোংরা থাকে, খাওয়া-দাওয়ারও বাছ-বিচার নেই। মোরগ পোষে। প্রথমে অল্প ক’টা মোরগ নিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। দেশি মোরগ। পরে টার্কি সাওতি মোরগে ঘর ভরে গেল। এ’গুলোর স্থান সংকুলান অসম্ভব হয়ে উঠল। পাড়ায় গ্রামে লোকজনের ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়তে লাগল মোরগগুলো। লোকজন অতিষ্ট হয়ে উঠল। পাড়া-পড়শির সব্জিবাগান, ফুলবাগান আর বসতঘরের ভেতরেও তাদের অবাধ যাতায়াত! উচিত ছিল আব্বাসের তাৎক্ষণিকভাবে মুরগির সংখ্যা কমিয়ে আনা! তা’ না করে হারামজাদা মুরগি আরো বাড়িয়ে চলল।
মুরগির উৎপাতে পড়শিরা বে-ক্বারার! এ’ নিয়ে হাজারো নালিশ-ফরিয়াদ আর কাজিয়া ফসাদ হয়ে গেছে আগে। সালিশ বসেছে শতবার। শেষে বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্তটা নিতে হল আব্বাসকে। একটা বিশাল খাঁচা বানাবে সে। সবগুলো মুরগিকে সেই খাঁচায় ভরে ফেলবে। খাঁচার ভেতরেই তাদের খাওয়া-দাওয়া, হাগু-মুতু, জন্ম-মৃত্যু চলবে।
হিসেবটা মাথায় রেখে ডিসেম্বরের এক বিষণœ সকালে বউকে সাথে নিয়ে খাঁচার কাজ শুরু করেছিল আব্বাস আদম। সেই খাঁচা এখন প্রায় তৈরী।

বুবুনের বাবা একটু দূরে দাঁড়িয়ে খাঁচা বানানো দেখছিলেন। ঠিক যে দেখছিলেন তা’ অবশ্যি নয়। তিনি তখন অন্যমনস্ক। আইডিয়াটা তাঁর মাথায় পিন ফোটাচ্ছে। সংখ্যায় বেড়ে গেলে এ’ভাবেই তো মুরগিগুলোকে খাঁচায় ভরে ফেলতে হয়। তা’ হলে?
চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইলের এতটুকুন এক দেশ, তার জনসংখ্যা দেখ!
বুবুনের বাবা প্রতিবেশী বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবনায় বুঁদ হয়ে গেছেন তখন।
এই ঊনিশ শ’ নব্বুইতেই যদি বারো কোটি মানুষে ভরে যায় দেশ তা’হলে আরো পঁচিশ বছর পর কী হবে? বিশ কোটি! তাঁর মাথা ঝিম্ ঝিম্ করতে লাগল। ভয়ঙ্কর ! মহা ভয়ঙ্কর! ভারতের জন্য মোটেও ভাল খবর নয় এটি। এখন রোজদিনই শত শত বাংলাদেশি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়ছে। পঁচিশ বছর পর অবস্থা কি দাঁড়াবে! যখন তাদের জনসংখ্যা বিশ কোটির ওপরে উঠবে?
আব্বাস আদমকে হাত ইশারায় ডাক দিলেন তিনি।
আদম ইতস্ততঃ করছিল, আসবে কি আসবে না। সময় নষ্ট করার সময় তার হাতে নেই। একজন অতি উৎসাহি তামশগির দৌড়ে গিয়ে তার কানে কানে কী বলল। আব্বাস যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল। এক লাফে খাঁচা থেকে নেমে দৌড়ে বুবুনের বাবার কাছে এসে হাত জোড় করে দাঁড়ালো।
বুবুনের বাবা কেন্দ্রীয় সরকারের সরাষ্ট্র সচিব, সেটি ততোক্ষণে চাউর হয়ে গেছে। সবাই সমীহভরে তাঁর দিকে তাকাচ্ছে।
‘খাঁচার পুরোটাই বন্ধ করে দেবে নাকি?’ আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘ওপরের দিকে একটুকু খোলা থাকবে।’ হাত কচলে জানালো আব্বাস।
‘বেঁচা-বিক্রির জন্য মুরগি ধরে আনতে অইটুকু খোলা রাখতে হয়।’
‘যদি উড়ে যায়?’
‘গেলে যাবে, তার আর চারা নেই, সাহেব।’
বুবুনের বাবা নির্নিমেষ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন, শেষে ছোট্টো একটা শ্বাস     ফেললেন।
‘তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আব্বাস, অসংখ্য ধন্যবাদ।’ তিনি আব্বাসের হাত আঁকড়ে ধরলেন। তাঁর চোখেমুখে কৃতজ্ঞতার চিহ্ন।
আব্বাস আদম হতবাক। এ’ ভদ্রলোক এ’ রকম করছেন কেন! সে তো তাঁর কোন উপকারই করেনি! বলল-
‘সাহেব, আমি তো আপনার কোন উপকারই করলাম না, তবে কেন ধন্যবাদ দিচ্ছেন?’
‘তুমি জানো না আব্বাস, শুধু আমার নয়, তুমি সারা ভারতের বিরাট উপকার করেছো, বিরাট উপকার, ওহ্- ’
তিনি উত্তেজিত স্বরে ড্রাইভার অনিন্দ্যকে গাড়ি ঘোরাতে বললেন।

গাড়ি বিধাননগরের দিকে চলছিল, বললেন,- ‘বিধাননগর নয়, বাগ-ডোগরা এয়ারপোর্ট। দু’ ঘন্টায় বাগ-ডোগরা পৌছাতে হবে। গরুঢ়ের ফ্লাইটটি তা’হলে ধরতে পারব।’

রাত্রেই দিল্লী পৌছে গেছিলেন বুবুনের বাবা।
জরুরী ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি মিটিং ডাকলেন তিনি।
বিশাল এক খাঁচা তৈরীর জন্যে এ’ মিটিং! বাংলাদেশের চারদিক ঘিরে কাঁটাতারের খাঁচা!

গল্প >> দৃশ্যপট : মুজাফফর আলী তালুকদার

দৃশ্যপট

মুজাফফর আলী তালুকদার


- ঠুক্ ঠুক্ ঠুক্ -
দরোজায় টোকা দেওয়ার শব্দ
- কে?
- দুয়ার খুলেন মাদবর সাব। আমি গনি।
কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার রাত। বাইরে বৃষ্টি ঝরছে টুপ টুপ করে। গা ছমছমে পরিবেশ। প্রায় শব্দহীনভাবে দরজা খুলে গেলো। ভিজে কাপড়ে ঘরে ঢুকলো গনি আর ছাত্তার। ওদের দিকে তাকিয়ে বাহাজ মাদবর বিস্ময়ে বলে উঠলো - কী খবর গনি?
- রাইত কয়ডা সাব?
হারিকেন উঁচু করে টেবিল ঘড়িটার দিকে চেয়ে বাহাজ মাদবর বললো - বারোটা। তা হোক, আগে খবর ক’!
- কেল্লা ফতে, মাদবর সাব!
- ফতে?
- হ, এহেবারে সাবাড়।
- লাশ কোথায়?
- নোজঙ্গের মোড়ে, পাচমুড়া বিলের পানার নিচে। একটু নড়ে উঠে গনি। গামছা দিয়ে ভিজে মাথা মুছতে মুছতে বলে - নেইন, টেহা দেইন। সেকেন্ড শো ভাঙবো এহন। হইটালে নাম ডাইরি করছি। ছোৎ কইরা যামু গা। কাপড় বদলান নাগবো।
মাদবরের কাছে এসে দাঁড়ায় ছাত্তার। ফিসফিস করে বলে - বিশ্বাস অয় না মাদবর চাচা? গনি তো কিছুই করে নাই। আমিই তো বেবাক করছি। মাথার মধ্যে নোয়ার ডাং দিয়া এছা বাড়ি দিছিলাম-এক্কো বাড়িতেই খলিল চেরমেন পইড়া গেলো।
বাহাজ মাদবর ছাত্তারের মুখটা চেপে ধরে - আরে-র-। কথা কইছ না, হালার পো হালা। কেউ হুনবো।
হারিকেন উঁচু করে পকেট থেকে আলমারির চাবিটা বের করে আনে বাহাজ মাদবর। তারপর তালা খুলে দু’জনের সামনে দু’ শ’ টাকা ধরতেই মাথা নেড়ে উঠে গনি - না মাদবর সাব, বেবাক টেহা একবারেই দিয়া দেইন। বাহি থুমু না এহন।
রেগে উঠে বাহাজ মাদবর - কী কইলি?
- কইছি মাদবর সাব। ঠিকই কইছি।
- এতো রাতে কেউ ঘর থিকা টেহা দেয় রে চুতমারানির পো!
প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে ছাত্তার - গাইল পারবাইন না মাদবর চাচা। কাম কইরা টেহা চাইছি। তাড়াতাড়ি করেন। সোময় নাই।
মুহূর্তে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে বাহাজ মাদবর - যাবি গা - যা - যা এহন। পরে আবি।
ঘুরে দাঁড়ায় ছাত্তার - মাদবর চাচা, কামডা বালা অবো না কইলাম। কাম শেষ অইলেই বাহি বেবাক টেহা একবারেই দিবার চাইছুন। এহন আবার বামছাম করুন ক্যা?

টর্চ লাইটের তীব্র আলো মাদবরের মুখের উপর ফেলে হঠাৎ ঘরটা উদ্ভাসিত করে দেয় ছাত্তার।
বাহাজ মাদবরের উত্তেজিত দেহটা কেঁপে উঠে - ছত্তাইরা! বাড়াবড়ি করিস না।
- তাড়াতাড়ি বিদায় করেন চাচা।
- চুপ। যা - বাইর হইয়া যা।
- টেহা ছাড়াই?

দ্বিতীয়বার ছাত্তারের হাতের টর্চ জ্বলে উঠতেই থাবড়া দিয়ে তা ধরে ফেলে বাহাজ মাদবর - শুয়োরের বাচ্চা আমার মুখের উপর কথা।
ছাত্তারের মুখে ঘুষি লাগিয়ে দেয় বাহাজ মাদবর।
এ দৃশ্য দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলো না গনি। মাথায় রক্তে উঠে গেলো। হাতটা চলে গেলো তার কোছের কাছে। শক্ত একটা প্রতিশোধাকাক্সক্ষা উন্মাদ করে দিলো তাকে। সঙ্গে সঙ্গে কোছে গোঁজা ছোড়াটা বসিয়ে দেয় বাহাজ মাদবরের বুকে - শালা হারামির পয়দা।
চোখের নিমেষেই ঢলে পড়লো বাহাজ মাদবরের বেঁটে দেহটা।
একটা গোঙানি। ধপাস শব্দ।

আবারও জ্বলে উঠলো ছাত্তারের টর্চ।

আরেকটি শব্দ, আলমারি খোলার।

রবিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১০