শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

গল্প >> ক্রীড়নক : মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী

ক্রীড়নক

মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী

কিছু কিছু দিন আসে মনে হয় সবকিছু সমুজ্জ্বল এবং আশাতীত। প্রকল্প অনুমোদন ও কার্যক্রম চালু করার চিঠি পাবার পর ড. মোফাখখার চৌধুরীর কাছে আজকের দিনটিকে তাই-ই মনে হলো। মনে হলো অনন্য এবং সুখকর। গত কয়েক মাস ধরে দাতা সংস্থার ফরমাশ অনুযায়ী প্রকল্প তৈরি ও বাজেট প্রণয়নের কাজটি যথেষ্ট ভোগান্তি দিয়েছে। ওদের চাহিদা পূরণ করতে গেলে কন্ট্রাক্ট নেওয়ার কোনো মানেই দাঁড়ায় না। অনেক ঘষামাজা করে, অলৌকিক খরচের খাত বাড়িয়ে, প্রশাসনিক খরচ কমিয়ে ও ফিল্ড অপারেশনের খরচ বাড়িয়ে একটি লাভজনক প্রকল্প তৈরি এবং তা পাঁচ বছরের জন্য দাতা সংস্থার অনুমোদন লাভ করার অর্থই হলো-অর্থাগমের একটি নিশ্চিত পথ তৈরি হওয়া। তাছাড়া স্ত্রী সেলিমাকে প্রকল্পের পূর্ণ তদারকির দায়িত্বশীল পদে বসানোর ব্যাপারে দাতাগোষ্ঠী সম্মত হওয়ায় অর্থ সমাগমের পথ আরো সুগম হয়েছে।
পরিকল্পনামাফিক অর্থ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত হওয়ায় আজ রাতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন ড. চৌধুরী। এতে উপস্থিত থাকার কথা তার সংগঠন ’ভাবমূর্তি’র মতোই কন্ট্রাক্ট পাওয়া ’সুকৃতি’ ও ’সমতা’র কর্ণধার মুরশিদ সানোয়ার এবং শফিক আহমেদের। ভাবমূর্তি কার্যালয়েই অনুষ্ঠানটি হবে। আয়োজনের পুরো দায়িত্ব পড়েছে মাহতাবের ঘাড়ে। মাহতাব সেলিমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য এক বিশ্বস্ত কর্মচারী। সে অ্যাকাউন্টস, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে সবকিছু দেখাশোনা করে। কিন্তু তার আগে ড. চৌধুরীকে আরেকটি বিশেষ সভায় যেতে হবে বিকেল পাঁচটায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি গ্রুপকে তিনি নামমাত্র সম্মানীতে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান পোভার্টি এন্ড স্ল্যাম ডুয়েলার্স শীর্ষক গবেষণা কর্মের উপাত্ত সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করেছেন। স্যারের প্রজেক্টে কাজ করলে পরীক্ষায় সহজে সাপোর্ট পাওয়া যাবে-এই আশাতেই সম্মানীর ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রাণান্ত শ্রম দিচ্ছে। ড. চৌধুরী যে বিষয়টি বুঝেন না তা নয়, বরং প্রকল্পের টাকা বাঁচাতেই জেনেশুনেই তিনি তার শিক্ষার্থীদের এ দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু মুখে বলছেন, শিক্ষার্থীদের খ-কালীন একটা কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন। 
বিকেলে প্রকল্পের রিভিউ মিটিংয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়ে ড. চৌধুরী ডাক দিলেন সেলিমাকে, শোনো, আমি বেরুচ্ছি।
- একটু দাঁড়াও, সেলিমা অন্য ঘর থেকে সাড়া দিয়ে ধীর পায়ে এ ঘরে আসেন। তোমাকে না বলেছি কখনো কোথাও ঠিক সময়ে যাবে না? লোকজনকে অপেক্ষা করতে দাও, তোমাকে নিয়ে গল্প ছড়াতে দাও। এতে তুমি ওদের মনের মধ্যে গেঁথে যাবে।
- তা এখন তুমি আমাকে কোনো বড়শিতে গাঁথতে চাইছো? হালকা রসিকতার সুরে বলেন ড. চৌধুরী
- পাগল! হেসে মুখোমুখি দাঁড়ান সেলিমা, তোমায় গাঁথার কি আর বাকি আছে?
- সে আমি প্রতি পলে অনুভব করি, ড. চৌধুরী আয়নার দিকে ফিরে ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবির কলারটা ঠিক করে নেন।
- তবে ‘লেসুগিরি’টা বন্ধ করলে তুমি আমার পুরোপুরি হও। নিজের দিকে ড. চৌধুরীকে ঘুরিয়ে নিয়ে সেলিমা গলায় অভিমান ফোটান।
- কী যে বলো না! ড. চৌধুরী হালকা গলায় বলেন, তোমার এখনও সন্দেহ বাতিকটা গেলো না।
- সে কী আর সাধে চৌধুরী সাহেব। সেলিমা চোখে চোখ রাখেন, আমার চেয়ে কেউ তোমাকে বেশি চেনে না।
- তা জানি। কথার ফাঁকে মানিব্যাগটা খুলে হাঁ হয়ে যান ড. চৌধুরী, এ কী! সব টাকা যে সরিয়ে রাখলে?
- দিনকাল যা হয়েছে, বেশি টাকা পকেটে নিয়ে ঘুরার অনেক বিপদ, সেলিমা হাসেন, তাছাড়া...
- তাছাড়া কী? ড. চৌধুরীর সুরে মেজাজটা জাগার পথে।
হাসেন সেলিমা, প্রিয় ছাত্রীদের নিয়ে না আবার চায়নিজে চলে যাও...
- আসলে তোমাকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার, ড. চৌধুরী গলায় আলতো ঝাঁজ ফোটাতে গিয়েও থেমে যান। কারণ তার জানা আছে সেলিমাকে খুঁচিয়ে কিছুই করা যাবে না। সেলিমা এবং তাদের পুরো পরিবারের সাপোর্ট না থাকলে আজকের ড. চৌধুরীকে শুধুমাত্র ভার্সিটির একজন লেকচারারই হয়ে থাকতে হতো। বুদ্ধিজীবী, সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেওয়া সম্ভব হতো না। নিজেকে সামলে নিয়ে ড. চৌধুরী মন গলানো হাসি ফোটান ঠোঁটে, তুমি একটুও বদলালে না।
- ঠিক আছে বদলাইনি, সেলিমা দরোজার কাছে এগিয়ে আসেন। কাল সকাল এগারোটায় কিন্তু স্কুলে ইন্টারভিউ নিতে হবে।
- তাই তো! ড. চৌধুরীকে একটু চিন্তিত দেখায়। আজ ভার্সিটি গেলাম না কন্ট্রাক্ট সই করার জন্য, কালও যাবো না?
- সিক কল করে দেবে, সরল সমাধান দেন সেলিমা।
- কিন্তু এতে ক্যারিয়ারের সমস্যা হয়, তুমি বোঝো না?
- তোমার ভার্সিটির ক্যারিয়ারে এ যাবত কোনো সমস্যা হয়েছে?
- না, তা হয়নি, সেলিমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে কথা গিলে ফেলেন ড. চৌধুরী। তিনি জানেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে থাকা সেলিমার আত্মীয় স্বজনের বদৌলতে বছরে ছয় মাস ক্লাস না নিয়েও দিব্যি বহাল তবিয়তে আছেন। বরং প্রতি বছর প্রমোশন পেয়ে ভিসির চেয়ারের দিকে এগিয়ে চলেছেন। 
- ঠিক আছে, আমি এখন আসি। ড. চৌধুরী বিদায় নিয়ে গাড়ি বারান্দায় নেমে আসেন।
ড্রাইভার শুকুর মিয়া দরোজা খুলে দাঁড়ালে ড. চৌধুরী ঝপাৎ করে গাড়িতে ঢুকে ফোঁস করে দম ফেলেন। শুকুর মিয়া ফিরে তাকালে কপট গাম্ভীর্য এনে বলেন, চলো।
আত্মমগ্ন হয়ে গেলেন ড. মোফখখার চৌধুরী। মনে মনে বেশ বিরক্তই। সেলিমার বাড়াবাড়িটা অনেক সময় দুঃসহ মনে হয়। গাইডেন্স আর সাপোর্ট করছে বলে কি একেবারে মাথা কিনে নিয়েছে? আরে বাবা, আমি তো সংসারটা ঠিক রেখেছি, না কি? আমাকে হাজারো মানুষের সাথে মিশতে হয়, সংস্পর্শে যেতে হয়। কাজের স্বার্থে মেয়েদেরও খাতির করতে হয়, এজন্য এতো কথা শুনানো কেনো? রাগে স্ত্রীকে কল্পনা করে মুঠি পাকিয়ে কিল মারেন সামনের সিটে।
মৃদু শব্দ হওয়ায় শুকুর মিয়া গাড়ির গতি কমিয়ে ঘাড় কাত করে, স্যার কিছু বললেন?
- না। সেলিমার ঝাল ড্রাইভারের উপর মেটান ড. চৌধুরী, সামনে তাকাও। 
- স্যার গেটের সামনে জটলা, শুকুর মিয়া একটু কাঁপাস্বরে বললো। 
- তুমি যাও। ও নিয়ে ভাবতে হবে না। কিন্তু গাড়ি গেটের সামনে এলে টের পেলেন, বিষয়টি ভাবারই। জটলাটা ‘ভাবমূর্তি’কে ঘিরে। তিনি পালের গোদা সায়মুনকে চিনতে পারলেন। সে ওসমান গণি কলেজের ভিপি এবং এলাকার দাপুটে ছাত্রনেতা, থুক্কু, সন্ত্রাসী। যার সাথে ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র নেতাদের আছে গভীর সম্পর্ক। ওদের ধমক দিয়ে কোনো কাজ হবে না বুঝতে পেরে তিনি ইশারায় সায়মুনকে ডাকলেন।
- কী হয়েছে সায়মুন? গাড়ির কাচ নামিয়ে ড. চৌধুরী মুখ বাড়ালেন।
- আমরা নতুন ছাত্র সংসদের অভিষেক অনুষ্ঠানের জন্যে কিছু হেল্প চেয়েছি স্যার, কিন্তু আপনার ম্যানেজার মাহতাব সাহেব ছেলেদের সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন। সায়মুন প্রতিবাদী গলায় বলে, আমরা এর বিচার চাই।
- মাহতাব ভুল করেছে। ড. চৌধুরী নিজের চিরাচরিত ধুরন্ধর চাল প্রয়োগ করেন, ঠিক আছে। রাত ন’টার দিকে তুমি এসো, আমি অফিসে থাকবো।
- ঠিক আছে স্যার। সায়মুন ছেলেদের দিকে তাকিয়ে হাঁক দেয়, অ্যাই চল সবাই, স্যার আমাদের ব্যাপারটা দেখবেন।
শুকুর মিয়া গাড়িটা ভেতরে নিয়ে দরোজার মুখে দাঁড়ায়। স্যার আমি কি অপেক্ষা করবো?
- না, তুমি বাসায় চলে যাও, ড. চৌধুরী গাড়ি থেকে নেমে পাঞ্জাবিটা টান করেন, ম্যাডাম তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
- ক’টার দিকে আসবো স্যার?
- ন’টার দিকে এসো।
- আমার ছেলেকে সাড়ে আটটায় ডাক্তারের কাছে নিতে হবে স্যার। শুকুর মিয়া করুণ সুরে বলে।
- কাল নিয়ো। ড. চৌধুরী কনফারেন্স রুমের দিকে পা বাড়ান।
- আজকের এ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছি দশ দিন আগে স্যার। শুকুর মিয়া কাতর গলায় বলে।
- তাহলে আরও দশ দিন পরে নিয়ো। ভাবলেশহীন মুখে জবাব দেন ড. চৌধুরী।
- ছেলেটার ভীষণ অসুখ স্যার। শুকুর মিয়ার কণ্ঠে অনুনয়ের সুর। 
- তা আমি কী করতে পারি শুকুর? ড. চৌধুরীর গলায় উষ্মা, চাকরি করতে হলে এসব বাহানা বাদ দিতে হবে। শুকুর মিয়াকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত পায়ে তিনি ঢুকে গেলেন কনফারেন্স রুমে।

স্লামালেকুম স্যার! শুকুর মিয়ার কাতরতা ছাপিয়ে কনফারেন্স রুম থেকে সমবেত কন্ঠ আছড়ে পড়ে বাইরে।
- বসো বসো, নিজের চেয়ারে বসতে বসতে ড. চৌধুরী বললেন। তারপর উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, মনে হচ্ছে দু’জন অনুপস্থিত।
- না স্যার, ফাহিম নামের সিনিয়র ক্লাশের ছাত্র এবং প্রকল্পের সহকারী টিম লিডার বলে, জুঁই আর সোহেল এখনো ফিল্ডে, এসে পড়বে।
-  ট্যাবুলেশনের কাজ কি কালকে শুরু করতে পারবে? ফাহিমের দিকে তাকান ড. চৌধুরী।
- সমস্যা আছে স্যার... ফাহিম আমতা আমতা করে।
- আবার সমস্যা? ভ্রু কুঁচকালেন ড. চৌধুরী।
- ঝর্ণাপাড়া, মাতারবাড়ি রেল বস্তি, ভাসমান কলোনি আর হারিস কলোনির বাসিন্দারা আমাদের তথ্য দিচ্ছে না।
- কারণ কী? প্যাডে নাম ক’টি লিখে চোখ তুলে তাকান তিনি।
- ওরা বলে, বিদেশীদের কাছে ওদের খবর বেচে আমরা টাকা নেবো, ওদের কী লাভ? তানভির নামের বেঁটেখাটো ছাত্রটি বলে। 
- হুঁ, বস্তির লোকগুলোও দেখি সেয়ানা হয়ে গেছে। চিন্তিতমুখে বলেন ড. চৌধুরী। তা, তোমরা কী বলেছো?
- বলেছি, ফাহিম বলে, তাদের উন্নয়নের জন্যই এসব তথ্যের প্রয়োজন। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হয়তো আমরা নিজেরাও প্রকল্প নিতে পারি আবার সরকারকেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার জন্যে সুপারিশ করতে পারি।
- ভালোই বলেছো। ড. চৌধুরী মাথা নিচু করে লিখতে থাকেন, আর কিছু?
- আসলে স্যার বস্তিগুলোতে বিভিন্ন পার্টির ক্যাডাররা আড্ডা গেঁড়েছে, দরোজার মুখ থেকে জুঁইয়ের গলা ভেসে আসে। এ প্রকল্পের লিডার সে। 
- আরে জুঁই, এসো, ড. চৌধুরীর চোখেমুখে আলো ঝলকায়, ভাবছিলাম, এতক্ষণ কী করছো ফিল্ডে।
- সরকারি দলের এক নেতাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, ঘর্মাক্ত কপালে লেপটে থাকা চুল সরিয়ে তন্বী জুঁই বলে, কোনো লাভ হলো না।
- কেনো? জুঁইয়ের রোদে পোড়া ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে নরম কন্ঠে জানতে চাইলেন ড. চৌধুরী।
- ওরা চাঁদা চাইছে, জুঁই শাড়ির আঁচলে মুখটা মুছে সপ্রতিভ গলায় বলে।
- তাই? কন্ঠে একটু বিস্ময় ফোটান ড. চৌধুরী, তোমরাই বলো, এদেশের গরিব মানুষদের উন্নতি কী করে হবে? ঠিক আছে। উঠে দাঁড়ান তিনি, তোমরা চা-নাস্তা খাও, আর একাউন্টস থেকে টাকা নিয়ে যেও। আর হ্যাঁ, জুঁই, তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে, ওপরে এসো। 

ড. চৌধুরী ভেতরের আগুন চাপা দিয়ে ওপরে ভাবমূর্তি অফিসে চলে আসেন। 
- ওদের নাস্তা দিতে বলো। মাহতাবকে বললেন, আর পাঁচ শ’ করে টাকা দিয়ে দাও।
- জী স্যার, মাহতাব দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। ভাবে, পোয়াতি বউটা পথের দিকে তাকিয়ে আছে। না জানি আর কতো দেরি হবে। 
- ভাউচারে সাইন নিতে ভুল করো না যেনো। নিজের কক্ষে ঢুকার আগে মুখ ফিরিয়ে বললেন ড. চৌধুরী। 
- ঠিক আছে স্যার, মাহতাব নিরস মুখে বলে।
ড. চৌধুরী চেয়ারে বসতেই সেলিমার ফোন এলো।
- শুনছো?
- বলো।
- পিডি হিসেবে আমি একজনকে ঠিক করেছি।
- কাকে?
- তুমি হয়তো চিনবে, সেলিমা একটু বিরতি দিয়ে বলে, অ্যাকশন এইডের প্রজেক্টে কনসালটেন্টের কাজ করেছে, আগে ড্যানিশ প্রজেক্টে ছিলো, আদনান শহীদ।
- নাম শুনেছি বোধহয়।
- আমি তাকে আজকের মিটিংয়ে আসতে বলেছি।
- কেনো?
- অন্যরা সবাই পিডি নিয়ে বসবে, আর তুমি বসবে একা? সেলিমা স্বামীর বোকামিতে ক্ষুণœ হন। 
- ওরা পিডি নিয়ে আসবে সেতো আমি জানতাম না, ড. চৌধুরী একটু অবাক কন্ঠে বলেন।
- ওরা চিন্তার দিক থেকে তোমার চেয়ে এডভান্স, সেলিমা হাসে, আমি না থাকলে তুমি যে কোথায় হারিয়ে যেতে এখনো বুঝতে পারছো না?
- পারছি না মানে? ড. চৌধুরী গলায় কৌতুক ফোটান, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
- কথাটা কি ঠিক বললে? বিষণœতা ফোটে সেলিমার গলায়, হাড়ে হাড়ে...
- স্যরি! ড. চৌধুরী জিভ কাটার ভঙ্গি করেন, তা আদনান আসবে তো? 
- আসবে। আমি কথা বলেছি।
- ঠিক আছে, জুয়েল কোথায়?
- পড়তে বসেছে।
- নীরদ?
- সারা ঘরে খেলছে।
- আচ্ছা রাখি।
সেলিমার ম্যানেজিং ক্ষমতার প্রশংসা করতে হয়, সিগারেট ধরিয়ে জানালার বাইরে তাকালেন ড. চৌধুরী। বরাবরই সেলিমা আগ বাড়িয়ে সংসার ও সংসারের বাইরের সমস্যার সমাধান করে দেয়। এ জন্যে ওর ওপর এতো নির্ভরতা। তবে ফোনটা পাওয়ার পর ড. চৌধুরীর মনটা একটু খারাপ হয়েছে। তার ইচ্ছে ছিলো জুঁইকে পিডির পোস্টে নিয়োগ দেয়ার। মাত্র মাস তিনেক বাকি ফাইনালের। মেয়েটি যেমন চৌকস তেমনি অপরূপা। অনেক দিন ধরেই তার নানা প্রকল্পে কাজ করছে সে। সে সুবাদে ঘনিষ্ঠতাও হয়েছে। তবে সেলিমা সেটা পছন্দ করে না। সে কখনো কাউকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে দিতে চায় না। ড. চৌধুরীর ভাবনার জাল ছিঁড়ে জুঁই, আসবো স্যার।
- এসো, বসো। সিগারেট নিভিয়ে সোজা হয়ে বসেন ড. চৌধুরী, তোমার কথাই ভাবছিলাম।
- মিথ্যে বলছেন। চেয়ারে বসে মৃদু হাসে জুঁই, আপনি আছেন হিসেব নিয়ে।
- কীসের হিসেব? অবাক হলেন নব্য বুদ্ধিজীবী ড. মোফাখখার চৌধুরী।
- এই, কোন প্রকল্পে কতো লাভ হবে, সামনে আসা ঝামেলাগুলো কাকে দিয়ে মেটাবেন, কোনটা মাইনাস আর কোনটা প্লাস করবেন, এসব আর কী। জুঁই ঝরঝরে গলায় বললো।
- সব ঠিকই ধরেছো। তবে একটি বাদ পড়েছে।
- কোনটা আবার বাদ দিলাম?
- নিজেকে।
- মানে?
- মানে আমি তোমাকে নিয়েও ভাবছিলাম--।
- আমাকে নিয়ে? কপট বিস্ময় প্রকাশ করে জুঁই। যদিও সে জানে ড. চৌধুরী ভেতরে ভেতরে তাকে অনেক দিন ধরে পটাতে চাইছেন। লোকটাকে ওর খারাপ লাগে না। বয়েস একটু বেশি কিন্তু যেমন তীক্ষèধার তেমনি ধুরন্ধর ও সুঠাম পুরুষ। উনি যে তাকে চান সেটি জুঁই অনেক আগেই বুঝতে পেরেছে। তবে সেও ড. চৌধুরীকে খেলিয়ে নিতে চায়। 
- হ্যাঁ, তোমাকে নিয়ে। ড. চৌধুরী যেনো একটু বেসামাল হলেন, তোমাকে আমার ভালো লাগে।
- সে আমার সৌভাগ্য। জুঁইয়ের গলায় মেকি কৃতজ্ঞতার সুর। যেনো হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে বলে, স্যার আমাকে একটু যেতে হবে, কাজ ছিলো।
- ঠিক আছে যাও। কিছুটা ক্ষুণœ হলেও সেটা বাইরে প্রকাশ করেন না ড. চৌধুরী। তা আবার কবে দেখা হচ্ছে? প্রজেক্টের ব্যাপারে জরুরি আলাপ ছিলো।
- কাল ফ্যাকাল্টিতে দেখা হবে, স্যার। ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়ে জুঁই।
জুঁই বেরিয়ে যেতেই ড. চৌধুরীর মনে পড়লো কাল স্কুলের টিচার নিয়োগের ইন্টারভিউ নিতে হবে। সেলিমার নিজের স্কুল। অথচ জুঁইয়ের সাথেও দেখা করার কথা দিয়েছেন। ফন্দি আঁটেন ড. চৌধুরী। মোবাইলে সেলিমার নাম্বারে ফোন করেন। 
- কী হলো আবার? ভেসে আসে সেলিমার বিরক্ত কণ্ঠস্বর। 
- কাল ইন্টারভিউ’র টাইম পেছাতে হবে।
- কেনো? সেলিমার গলায় বিরক্তির সুর বাড়ে আরও। 
- এই মাত্র ভিসি স্যার ফোন করলেন। মিথ্যে বলেন ড. চৌধুরী, কাল সকাল ন’টায় জরুরি মিটিং আছে, যেতেই হবে।
- এতো শর্ট নোটিশে কেউ মিটিং ডাকে? অবিশ্বাসী কন্ঠে বলে সেলিমা, ঠিক আছে, তোমাকে একটার মধ্যে চলে আসতে হবে।
- ভেরি গুড। উৎফুল্ল হন ড. চৌধুরী, সকালটা তোমার আর দ্বিতীয় পর্ব আমার। ফোন রেখে হুঁস করে দম ছাড়েন ড. চৌধুরী। তারুণ্যের বুক খোলা জামায় ফুরফুরে বাতাস অনুভব করেন তিনি। মনে পড়ে আরেকটা কাজ বাকি আছে। সায়মুনদের ব্যাপারটা সামাল দিতে হবে। আবার বস্তিগুলোতে যে উৎপাত দেখা দিয়েছে তাও থামাতে হবে। একমাত্র মেয়র ছাড়া কেউ তাকে সিরিয়াসলি নেবে না। কারণ মেয়র জানেন কীভাবে, কাদের টেকনিক্যাল বুদ্ধিতে তিনি নগরপিতা হয়েছেন। তিনি মেয়র নাজিমুদ্দিন চৌধুরীকে ফোন করলেন।
- কী খবর ডক্টর সাহেব, অপর প্রান্ত থেকে মেয়র দরাজ গলায় বললেন, সব ভালো তো?
- হ্যাঁ। তা আপনি কেমন আছেন?
- চলছে কোনো রকম, নগরপিতা কি আর শান্তিতে থাকতে পারে? হা হা করে হাসেন মেয়র, সমাজসেবা-বুঝলেন না, জনসেবা।
- আমার কিন্তু একটু সমস্যা হচ্ছে। ভণিতায় না গিয়ে সরাসরিই বলেন ড. চৌধুরী।
- কী সমস্যা?
ড. চৌধুরী সায়মুন আর বস্তির ক্যাডারদের চাঁদার বিষয়টি খুলে বললেন।
- আমি দেখছি, মেয়র আশ্বাসের গলায় বললেন, আপনি আপনার কাজ করে যান।
- আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
- নিশ্চিন্তে থাকুন।
বুকটা অনেক হালকা হয়ে গেলো ড. চৌধুরীর। ভাবেন, উপরে ওঠার সিঁড়ি ভাঙতে এ ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক একেবারে অপরিহার্য। এমন সম্পর্ক তৈরি করার জন্য তিনি সময় ও অর্থ তো কম ব্যয় করেননি। অফিসের ফোনটা বেজে উঠলে চিন্তার জাল কাটে। 
- হ্যালো?
- স্যার আমি সায়মুন।
- কিছু বলবে?
- আমি আজ আসতে পারছি না স্যার।
- ঠিক আছে, কাল এসো। মনে মনে হাসেন ড. চৌধুরী
- না স্যার, সায়মুন ক্ষুণ্ন গলায় বলে, আপনি মেয়র সাহেবের কানে এসব কথা না দিলেও পারতেন।  সে ফোন রেখে দিলো।

অফিসে ড. চৌধুরীর আসলে তেমন কিছু করার নেই, চেয়ারে দোল খাওয়া ছাড়া। গেস্টদের অপেক্ষায় থেকে করছিলেনও তাই। আর তার ভাবনার জালে ঘোরাফেরা করছিলো জুঁই। এমন সময় দরোজায় নক হয়। 
- আসতে পারি? 
- কে? চোখ তুলে তাকান ড. চৌধুরী। দরোজায় একটি বছর পঁয়তাল্লিশের মুখ। চোখে ভারি ফ্রেমের চশমা, নাকের নিচে ভারিক্কি গোঁফ।
- আমি আদনান শহীদ। আগন্তুকের কাছ থেকে জবাব আসে। 
- আরে এসো, বসো। উৎফুল্ল ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন ড. চৌধুরী, কেমন আছো?
- ভালো। ঈষৎ ক্ষীণ এবং ক্ষুণœ গলায় বলে আদনান। ’তুমি’ সম্বোধনে সে অস্বস্তিবোধ করে।
- তুমি কি আগামী সপ্তাহে জয়েন করছো? জানতে চান ড. চৌধুরী।
- আমি তো এখনো টার্মস এন্ড কন্ডিশন কিছুই জানি না। আদনান সপ্রতিভ গলায় বলে।
- তুমি তো অনেক অর্গানাইজেশনে কাজ করেছো। ড. চৌধুরী দু’ আঙুলে পেপারওয়েট নাচালেন, সিমিলারই হবে।
- রিটেন না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলতে পারছি না। আদনান খর চোখে ড. চৌধুরীকে দেখে।
- রিটেন তুমি পরশু পেয়ে যাবে, চেয়ারে হেলান দেন ড. চৌধুরী। তবে হিডেন কিছু কন্ডিশন থাকবে, দ্যাট মিনস উইদাউট ডক্যুমেন্ট...
- বুঝলাম না। আদনান তার চাকুরি জীবনে এমন শর্ত আগে আর পায়নি।
- মানে হলো, নাম্বার ওয়ান, তোমাকে আমাদের, মানে ভাবমূর্তির হয়ে কাজ করতে হবে, ড. চৌধুরী একটু থামলেন। যদিও তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দাতারা অনুমোদন করবে।
উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে আদনান।
- সেকেন্ড, তোমার বেতনের টেন পার্সেন্ট নগদে প্রতিমাসে ভাবমূর্তিকে দিতে হবে। ড. চৌধুরী আদনানের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেন, সেলিমা চৌধুরীকে তা দেবে।
- এমন শর্ত আজ পর্যন্ত শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। আদনান নাখোশ গলায় বলে, যেটা আপনারা দেবেন সেটা বাড়িয়ে না দিলে আমাকে ভাবতে হবে।
- কী যে বলো আদনান। ড. চৌধুরী কপট ভঙ্গিতে হাসেন। পিডির পে-স্কেল ডোনারদের হাতে, সেখানে আমাদের কিছু করার নেই। তবে বিভিন্নভাবে তা পুষিয়ে দেয়া হবে।
- যেমন?
- ফিল্ড ট্রিপ, ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ, হেড অফিস ভিজিট, কনভেন্স ইত্যাদি আর কী!
- দারুণ বিজনেস তো! আদনান গোঁফ নাচিয়ে হাসে।
এমন সময় ইন্টারকম বেজে উঠলো। মাহতাবের গলা, স্যার গেস্টরা এসে গেছেন।
কনফারেন্স রুমে বসতে দাও, ড. চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে আদনানের দিকে তাকালেন, তুমি ডিগনিটি নিয়ে পজিশন হোল্ড করবে, তার বিনিময়ে কিছু স্যাক্রিফাইস তো করতে হবে।
- আপনি কি করেন? আদনান উঠে দাঁড়ায়।
- সে কি আর বলতে! ড. চৌধুরী ম্লান হাসেন। যা বলেছি তা তুমি-আমি আর সেলিমা ছাড়া কেউ কখনও জানবে না, মনে থাকবে তো?
- চেষ্টা করবো।
কনফারেন্স রূমে ঢুকতেই মুরশিদ সানোয়ার ও শফিক আহমেদ হৈ হৈ করে উঠলেন। কংগ্রাটস ড. চৌধুরী, কংগ্রাটস।
- আপনাদেরকেও কংগ্রাচুলেশন জানাচ্ছি। সবার সাথে হাত মিলিয়ে ড. চৌধুরী চেয়ারে গিয়ে বসলেন।
- আরে আদনান, আপনি? ’সমতা’র পিডি রূপলা খন্দকার আদনানকে দেখে উচ্ছ্বসিত গলায় বলে।
- তুমি চেনো ওকে? শফিক আহমেদ ভ্রু কোঁচকালেন।
আপনি চেনেন না দেখে আমি অবাক হলাম, রূপলা গড়গড় করে বলে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তো আদনান সাহেব তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন।
শফিক আহমেদ ও মুরশিদ সানোয়ার দুজনেই আদনান শহীদের সাথে হাত মেলান। রূপলা খন্দকার ছাড়াও কনফারেন্স রূমে আরো একজন মহিলা আছেন। মুরশিদ সানোয়ারের পাশে বসা মহিলাটি সুকৃতির পিডি। হাসি বিনিময় করেন আদনানের সাথে। 
- আদনান শহীদ আমাদের নতুন পিডি। ড. চৌধুরী ইশারায় আদনানকে বসতে বলেন। ...তো শেষমেষ সবকিছু ভালোয় ভালোয় হলো কি বলেন?
- আপনি যদি ওদিন কুমিল্লা বার্ডে জ্বালাময়ী বক্তৃতা না দিতেন, মুরশিদ সানোয়ার মুখে রাখা পান এক পাশ থেকে আরেক পাশে সরান একটা বাজে শব্দ করে। মনে হয় না প্রজেক্ট আমরা পেতাম।
- আরে মুরশিদ ভুলে গেলে, শফিক আহমেদের খুঁতখুঁতে চোখ চশমার নীচে কৌতুক ছড়ায়, চৌধুরী বরাবরই জ্বালাময় ছিলো। কলেজ ইউনিভার্সিটিতে কি সে কম জ্বালা ছড়িয়েছে?
- চিম্বুক পাহাড়ের পিকনিক আর কক্সবাজারের সমুদ্র স্নানের সেই জ্বালা তো এখনো অনেকের মনে জ্বলছে। মুরশিদ বাঁকা চোখে রূপলার দিকে তাকালেন।
রূপলার মুখটা মুহূর্তে কেমন ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো। সে আড়চোখে আদনানকে দেখলো। আদনানের ঠোঁটে ঈষৎ হাসি ফুটে আছে, অর্থাৎ সে মজা পাচ্ছে। এ সময় ড. চৌধুরীর সেলফোন বেজে ওঠে।
- আমি আসছি না। সেলিমার গলা থমথমে।
 কী হলো?
 নীরদ পড়ে গিয়ে হাঁটুর চামড়া ছিঁড়ে ফেলেছে।
 ডাক্তারের কাছে নেবে?
 তা লাগবে না, সেলিমা আশ্বস্ত করেন। 
 ঠিক আছে। 
ফোন বন্ধ করে ড. চৌধুরী সবার দিকে তাকান, ছোট ছেলে পড়ে গিয়ে সামান্য ব্যথা পেয়েছে। তা যা হোক। একটু কেশে গলা পরিষ্কার করলেন, আমাদের তিনটি সংগঠন একই ডোনারের প্রজেক্ট পেয়েছি সেটি আনন্দের সংবাদ। কিন্তু আমরা যদি ভুলে যাই যে, ডোনাররা এখনো সেই ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি নিয়ে চলছে তাহলে নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হবে। এই একটি প্রজেক্টের জন্য আমরা বন্ধুত্ব নষ্ট করতে পারি না।
- তাহলে আমরা অ্যাট লিস্ট কোয়ার্টারলি কো-অর্ডিনেশন মিটিংয়ের আয়োজন করি। শফিক আহমেদ তাকালেন মুরশিদের দিকে।
- সেটা ভালো হয়। মুরশিদ সায় দেন।
- আরেকটি বিষয়, ড. চৌধুরী সিদ্ধান্ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলেন, আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধে ডোনারদের কিছু জানাবো না।
- কারেক্ট। সমস্বরে বলেন সুকৃতি আর সমতার সভাপতিদ্বয়।
এরপর পুরো আলোচনা তিন সভাপতির কৌতুক, মশকরা আর খুনসুটিতে ডুবে যায়। আদনান অস্বস্তিবোধ করতে থাকে। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়, আমাকে একটু যেতে হবে।
- যাবে? ড. চৌধুরীর পুলকমাখা মুখে কালো ছাপ পড়ে, ঠিক আছে। তবে সকাল ন’টায় এসে পড়ো।
আদনান সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পড়েন।
- তোমার সিলেকশন ঠিক হয়েছো তো চৌধুরী? আদনান বেরিয়ে যেতেই চিন্তিত ভঙ্গিতে বলেন শফিক আহমেদ, আমি ওকে চিনি। ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না।
- সেলিমার সিলেকশন। ড. চৌধুরী হাসি ফুটানোর চেষ্টা করেন, তবে চিন্তার কিছু নেই, ওরও ব্যাপটাইস্ট হতে দেরি হবে না।
- বুঝলাম না। শফিক আহমেদ চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন ড. চৌধুরীর দিকে।
- বুঝলে না! ড. চৌধুরী বুঝানোর ভঙ্গিতে বলতে থাকেন, আমরাও তো সমাজ বদলের আন্দোলন করেছি, বিশ্ববিদ্যালয়-রাজপথ কাঁপিয়েছি, তাই না?
- তো! ভুরু নাচিয়ে আবারও প্রশ্ন করেন শফিক আহমেদ।
- আর এখন কী করছি? পাল্টা প্রশ্ন করেন ড. চৌধুরী।
হাসি ফুটে ওঠে শফিক আহমেদের চোখেমুখে। ড. চৌধুরীর ইঙ্গিত এখন তিনি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছেন।
- আদনানের এখন সংসার হয়েছে। বলে চলেন ড. চৌধুরী। বাচ্চা-কাচ্চা আছে, পারিবারিক অবস্থাও সুবিধের না। সুতরাং সেও আমাদের দলে ভিড়ে যাবে। ড. চৌধুরী ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফোটালেন, অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া তাকেও গিলে খাবে, ব্যাপটাইস্ট হতেই হবে। 
- দারুণ! শফিক আহমেদ তোষামোদি গলায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
- এই না হলে কি আর বুদ্ধিজীবী হওয়া যায়? মুরশিদ প্রশস্তি করেন।
আবার শুরু হয় তিন সভাপতির মশকরা আর খুনসুটি। আড়ালে চলে যায় তৃণমূল মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য ‘নিবেদিতপ্রাণ’ তিনটি সংগঠনের সকল প্রতিশ্রুতি। 

সবাই বেরিয়ে গেলে ড. চৌধুরী গাড়িতে উঠে শুকুর মিয়াকে বললেন, ক্লাবে চলো।
শুকুর মিয়া জানে ক্লাবে যাওয়ার মানে, চৌধুরী সাহেব গলায় পানি ঢালবেন। সে বিক্ষুব্ধ মনে গাড়ি চালায়। স্যারের আজকের আচরণ তাকে খুব দুঃখ দিয়েছে। ছেলেটার এমন অসুখ, অথচ স্যার তার সাথে দুর্ব্যবহার করলেন। আবেগে তার চোখ ভিজে ওঠে।
- কী শুকুর, মন খারাপ? ড. চৌধুরী হালকাস্বরে প্রশ্ন করে পাঁচ শ’ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিলেন, এটা রাখো।
ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে আপন মনে গজগজ করে শুকুর, টাকা দিয়ে এরা সব কিনতে চায়, মানুষকে মানুষই মনে করে না।
ড. চৌধুরী ফোনটা বন্ধ করে ভাবেন, গলাটা ভিজিয়ে জুঁইয়ের কাছে যাবো। ওদের বাড়িতে তিনি আরও বারকয়েক গিয়েছেন। ওর বাবা কড়া মানুষ; কিন্তু ভার্সিটির দাপুটে প্রফেসরকে দেখলে একেবারে বিনম্র হয়ে যান। হয়তো তাকে দেখে জুঁই খুশি হবে না বরং রেগে যাবে। তবে মুখে কিছু বলবে না। চাই কি হাসিও ঝুলিয়ে রাখতে পারে। 

ক্লাব থেকে বিশ মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে এলেন ড. চৌধুরী। এমনটা সহজে করেন না। ক্লাবে ঢুকলে কমপক্ষে ঘণ্টা দুই তো থাকেনই। আজ দ্রুত তাকে বেরিয়ে আসতে দেখে শুকুর বিস্মিত হয়। সে তাকিয়ে দেখে স্যারের চোখে আলতো রঙের ছায়া।
- বাসায় যাবো স্যার? শুকুর জানতে চায়।
- না, সুগন্ধায় চলো।
- সুগন্ধায়? শুকুর মনে মনে পুনরুচ্চারণ করে, মানে জুঁইদের বাসায়। এই এক রোগে পেয়ে বসেছে ড. চৌধুরীকে। মেয়েটার পিছু লেগেছেন বছর দুয়েক ধরে। কড়া আর ধার দেয়া তলোয়ারের মতো জুঁইকে আজও বশে আনতে পারেননি। শুকুর জানে জুঁই যেদিন বাগে আসবে তার পরদিন ড. চৌধুরী তার খোঁজও নেবেন না। এমন অনেক খেলা সে দেখেছে গত দশ বছরে। ম্যাডাম সব জানেন, রাশও টানতে চান, কিন্তু পেরে ওঠেন না। সে মনে মনে গালি দেয়, হারামজাদা!
- কিছু বলছো?
- না স্যার।
গাড়ি ছোটে সুগন্ধার দিকে, জুঁইয়ের খোঁজে।
পেনসেলভেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

গল্প >> হঠাৎ দেখা : সাঈম চৌধুরী

হঠাৎ দেখা

সাঈম চৌধুরী

রবীন্দ্রনাথের হঠাৎ দেখা কবিতায় আটকে আছি অনেকদিন। সেই কবে পড়েছিলাম, মাথা থেকে যায় না সহজে। রেলে কিংবা বাসে কোথাও যাওয়ার সময়ে এদিক-ওদিক তাকাই। চেনা লোককে খুঁজি অচেনার গাম্ভীর্যে। কিন্তু এমন কাউকেই পাই না। আজকাল হারিয়ে যাওয়াটা যেনো অসম্ভব হয়েছে। কেউ হারিয়ে যায় না। হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে ওঠে, কিছুকাল না দেখা মানুষটি কীভাবে জানি নম্বর যোগাড় করে নেয়। ফেইসবুকে গেলেই চোখে পড়ে, দূরে চলে যাওয়া কোনো বন্ধুর আরেকবার বন্ধুত্বের নিমন্ত্রণ। সামাজিক যোগাযোগের সতেরো ইঞ্চির স্ক্রিনের পাতায় পাতায় ছবি, সেইসব ছবিতে কেউ আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে এক মুখ হাসি নিয়ে জানান দেয়, ভালো আছে এবং সহায়-সম্পদে আছে। আবার কেউ কেউ তিন হাত লম্বা মন্তব্য লেখে বুঝিয়ে দেয়, কাজের ফাঁকেও আছে প্রচুর অবসর। মনে হয়, সুখে আছে সবাই আর সবচেয়ে বড় কথা এখন আর হারিয়ে যেতে কিংবা হারিয়ে দিতে কেউ রাজি হয় না। তবুও ট্রেনে চাপলে হঠাৎ দেখা কবিতার কথা খুব মনে হয়। এদিক-ওদিক তাকাই। আজকাল ট্রেন জার্নি একটু বেশিই হচ্ছে। মাসে এক দুইবার ঢাকা-সিলেট। বাসে যাই না। দুর্ঘটনার ভয়। প্রায় সময়ই ট্রেনে পরিচিত অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। কেমন আছেন, কেমন কাটছে এই ধরনের টুকটাক কথাবার্তা। রেলযাত্রা শেষ হলে এসব সাক্ষাতের কথা মনে থাকে না আর।
আজকের ট্রেনে অবশ্য হঠাৎ দেখা কবিতার কথা মনে ছিলো না একটুও। চিন্তা আটকে ছিলো পত্রিকার পাতার শব্দজটে। পঞ্চাশ টাকা বাড়তি দিয়ে ট্রেনের টিকেট কেটেছি। বলা হয়েছিলো, সিট নেই। কথাটা একদম মিথ্যা। ট্রেনে অনেকগুলো সিট খালি। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে। আমার থেকে উল্টো দিকের দুই সিট দূরত্বে মুখোমুখি এক নারী বসে আছেন। বোরকায় পুরোটা মুখ ঢাকা। শুধু চোখ দুটি বেরিয়ে আছে। শব্দজটে আটকা থাকলেও বারবার মনে হতে থাকে, ঐ নারী আমাকেই দেখছেন। শুধু দেখছেন না, তীক্ষèভাবে তার মগজে যেনো আমাকে গেঁথে নিচ্ছেন। বোরকাতে বিভ্রান্তি আছে আমার। কেউ বোরকা পরে থাকলে তার বয়স আন্দাজ করা যায় না। হয়তো নানী, হয়তো চাচী, হয়তো পাশের বাসার খালাম্মা কিংবা সদ্য স্কুল শেষে কলেজে পা দেওয়া কোনো মেয়ে। দু-একবার তার চোখে তাকিয়েছি। চোখ ফেরাননি তিনি। একা মহিলা। সাথে কেউ নেই। ট্রেন ছাড়েনি তখনো। কমলাপুরে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। 
বোরকার আড়ালে থাকা চোখ দুটির পলকবিহীন পর্যবেক্ষণ আমাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে। তার চোখ চেনা কারো চোখের সাথে মেলে না। আমি শব্দজটে ফিরে যেতে চাই, তিন অক্ষরের একটা নদীর নামের সন্ধান করি, যার শুরুর শব্দটি ’ক’।
ট্রেনের হুইসেল বাজে। শেষ মুহূর্তের একজন যাত্রী দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের কামরার দরজা ধরে উঠে পড়েন। আশেপাশে কয়েকটি সিট খালি থাকা সত্ত্বেও তিনি আমার পাশের সিটটাই দখল করে নেন। ট্রেন চলতে শুরু করে। অনুভব করি, বোরকার আড়ালেই দুই চোখ তখনো আমাকে দেখছে। আমি স্থির করি, তার এই তাকানোকে উপেক্ষা করবো। কিছু সময়ের জন্য চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করতে পারি। যখন ঘুমোবার কিংবা চোখ বন্ধ করার বন্দোবস্ত নিচ্ছি, তখনই হাত ইশারায় এবং বোরকার আড়ালের চোখ দিয়ে মহিলা আমাকে ডাকেন। হঠাৎ দেখা কবিতার একটা লাইন মাথায় আসে, ’মনে হল কম সাহস নয়।’
আমার সঙ্গে পাশের সহযাত্রীও বোরকা পরা নারীর ইশারাকে খেয়াল করেন। ফিসফিস করে জানতে চান, চেনা কেউ নাকি আপনার?
আমি মৃদুস্বরে বলি, চিনি বলে মনে হয় না।
সহযাত্রী তখন সাবধান করে দেন, বুঝলেন বিশ্বাস করবেন না, অজ্ঞান পার্টির লোক হতে পারে! কিছু খেতে দিলে খবরদার খাবেন না।
আমি হাসি। আমার সাধের হঠাৎ দেখার এমন মর্মান্তিক পরিণতির কথা শুনে না হেসে উপায় আছে!
সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। এভাবে যখন ডাকছেন, কে জানে, অতি চেনা কেউ হতে পারেন। বোরকা খুলে দিলেই হয়তো দেখবো তিনি আমার বাড়িওয়ালার স্ত্রী।
কাছে গিয়ে জানতে চাই, আমাকে ডাকছেন?
চোখের ইশারায় হ্যাঁ উত্তর দেন, তারপর বলেন, কিছু মনে করবেন না, আপনি অপু, তাই না?
চমকে উঠি। হ্যাঁ, অপুই আমি। তবে অনেক আগের অপু। পাঠশালার অপু, পাড়ার বন্ধুদের চেনা অপু। বয়স হয়েছে, পুরাতন অনেক কিছুই হারিয়েছি। হারিয়ে যাওয়া এসব অনেক কিছুর মতোই অপু নামটাও হারিয়ে গেছে কবে। এখন আমি সোহরাব হাসান। সোহরাব-রুস্তমের মতো পোশাকি নাম। পোশাকি পরিচয়। অপু বলে আজকাল খুব কম মানুষই আমাকে ডাকে। কেবলমাত্র অপু নাম উচ্চারণের কারণে বোরকা পড়া এই নারীকে হঠাৎ আমার আপনার একজন বলে মনে হয়। তার ওপাশের সিটটা খালি ছিলো। তাতে বসে পড়ি। উৎসাহ নিয়ে বলি, ঠিক ধরেছেন আমি অপু, বোরকার কারণে আপনাকে দেখা যাচ্ছে না, তাই চেনাও যাচ্ছে না।
বোরকা না থাকলেও হয়তো আপনি আমাকে চিনতেন না, আমি হাজেরা।
হাজেরা? বড় একটা অপরিচিত নাম। তবুও নামটা তার কাছ থেকে নেওয়া মাত্র মগজের সার্চ ইঞ্জিনে ফেলে দিয়ে সার্চ বাটনে টিপ দেই। মগজের সকল স্মৃতির ফোল্ডারগুলো খুঁেজ-পেতেও হাজেরা নামের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। শুধু তার নামের সাথে মিল আছে, এমন একটাই নামের সন্ধান পাই, সেটা হলো জয়নাল হাজারী!
চিনতে পারেননি, তাই না? চেনার কথাও না। পেছনের বেঞ্চের ছাত্রী ছিলাম, আপনার সাথে পাঠশালা স্কুলে পড়েছি। এবার মনে পড়ছে হাজেরা নামটি? বোরকার আড়ালে তার প্রশ্নবোধক দৃষ্টি।
আমার কেনো জানি বেশ ভালো লাগে! ভাবতে ভালো লাগে বোরকাঢাকা এই মেয়েটি আমার কবেকার সেই ফেলে আসা সময়ের সহপাঠী। হাজেরা নামের কোনো সহপাঠীর কথা আলাদা ভাবে  মনে পড়ে না। স্মৃতিগুলো বড় বদমাশ। তার যা ইচ্ছা সে নিয়ে যায়, যা ইচ্ছা রেখে যায়।
আমি হাজেরাকে বলি, স্যরি নামটা মনে রাখিনি।
হাজেরা বলে, মনে রাখা আর মনে পড়ার মাঝে অনেক তফাৎ। মনে রাখা শব্দ দুটির মাঝে যতেœর বিষয় আছে, মনে রাখা মানে হচ্ছে তাকে আপনি রেখে দিয়েছেন, আর মনে পড়া বিষয়টা খুব সহজ, যখন-তখন অনেক কিছুই মনে পড়ে যেতে পারে আবার নাও পড়তে পারে। সুতরাং আপনার বলা উচিত হাজেরা নামটা মনে পড়েনি।
বোরকার আড়ালে এমন বুদ্ধিদীপ্ত কথা শুনে আমি মুগ্ধ হই। চেনা না চেনার জটিলতাকে এড়িয়ে যেতে ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। হেসে হেসে বলি, সহপাঠীর সঙ্গে যতদিন পরই দেখা হোক না কেনো, সে কখনো আপনি হয়ে যায় না, সহপাঠী চিরকাল তুমি কিংবা তুই।
হাজেরা বোধহয় হাসে। তবে বোরকা তার হাসিকে আড়াল রাখে। আপনি থেকে তুমিতে যেতে একটুও দ্বিধা করে না হাজেরা। বলে, তোমাকে দেখেই আমি চিনে নিয়েছি। বয়স হয়েছে, কিন্তু মুখটা যেনো সেই পিচ্ছি অপুরই রয়ে গেছে।
তাই নাকি?
ঠিক তাই। আর জানো তোমার অনেক কথাই আমার মনে থেকে গেছে। খুব ভালো ছাত্র ছিলে তুমি। থ্রি থেকে যখন ফোরে উঠলে, এক নম্বর হওনি বলে কী সেই কান্না তোমার। বেশ মজা লেগেছিলো। আমি পেছনের বেঞ্চের ছাত্রী। সব সময় সাতচল্লিশ, আটচল্লিশ রোল নম্বর। এক না হলে যে কাঁদতে হয়, এটা কী যে হাস্যকর ছিলো আমার কাছে!
কথা বলতে বলতে হাসে হাজেরা। শব্দ করে বালিকার মতো হাসি। পাঠশালা স্কুলের মতো হাসি। আমি এই কিছু সময়ের মধ্যেই হাজেরাতে শতভাগ মুগ্ধ হয়ে আছি। প্রাইমারি স্কুলের চল্লিশ-পঞ্চাশ সহপাঠীর ফাঁক গলে কবে জানি সে আমার জগত থেকে উধাও হয়েছে, মনেই নেই তা। কিন্তু হাজেরা সবকিছু মনে করে বসে আছে। থ্রি থেকে ফোরে উঠার সময়ে এক নম্বর হতে না পারার আমার ছেলেমানুষি কষ্টের কথাও তার স্পষ্ট মনে আছে। হাজেরার কাছে আমি অন্যরকম ঋণী হয়ে যাই, তাকে মনে না রাখার দায়ে অপরাধী হয়ে যাই।
হাজেরার কথা থামে না। তাকে বোধহয় স্মৃতির রোগ পেয়ে বসেছে। জানতে চায় সে, মনে আছে তোমার, সেদিন এক নম্বর কে হয়েছিলো? আমার কিন্তু তার কথাও মনে আছে। তার নাম ছিলো লিপি।
হাজেরার কথায় দুপ করে আমার লিপির কথা মনে পড়ে। আহা! লিপির সঙ্গে যদি একবার দেখা হতো। হঠাৎ দেখার মতো দেখা। লিপি আমার প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী। লিপি। আমার প্রথম ভালো লাগা। নিজের উপর রাগ হয়। এমন কি লিপিকেও আমি ভুলে বসে আছি! ফেইস বুক, মোবাইল ফোন কিছুতেই লিপিকে খুঁজিনি, কিছুতেই লিপিকে পাইনি।
আমি বলি, খুব মনে পড়ছে। চোখের সামনে সাদাকালো সিনেমার মতো প্রাইমারি স্কুলের মাঠ দেখছি। দুপুর হয়েছে। টিফিনের জন্য আধঘণ্টার ছুটি। দে দৌড়! মিনতি দিদি, মতিন স্যার, মনোয়ারা আপা, ছুটির ঘণ্টা, হাজেরা আমার বেশ ভালো লাগছে। তোমার সাথে দেখা হয়ে আমার বেশ ভালো লাগছে।
হাজেরা বলে, আমারও বেশ ভালো লাগছে। ভাগ্যিস আমি তোমাকে চিনতে পেরেছিলাম, ভাগ্যিস তোমার বয়স হলেও মুখটা সেই পিচ্ছি অপুর রয়ে গেছে। কী করো আজকাল?
দশটা-পাঁচটা অফিস, সিলেটÑঢাকা-সিলেট। সংসার। ছোট একটা মেয়ে। ছুটি পেলে মেয়ে আর তার মাকে নিয়ে এখানে-ওখানে বেড়াতে যাওয়া। এই তো যাচ্ছে জীবন, তোমার কী খবর?
আমার প্রশ্নে নীরব হয়ে যায় হাজেরা, দীর্ঘশ্বাস গোপন করে। কিছু সময় পর সে তার বলে, স্বামী বড় মাওলানা। বড় একটা মসজিদের ইমাম। কঠিন পর্দাপ্রথা। বাইরের কারো সাথে আলাপ করি না, আলাপ করা যায় না। এই যে, একা শ্রীমঙ্গল ফিরছি, বোধহয় দশ বছরে একা কোথাও বেরুলাম। স্বামী তাবলিগে ছিলেন। আমার মা অসুস্থ। বাধ্য হয়েই তিনি একা যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। যদি জানেন, ফেরার পথে আমি তোমার মতো একজনের সঙ্গে কথা বলে বলে এসেছি, তাহলে বেচারার হার্ট অ্যাটাক হবে। তাবলিগ শেষ করে তিনি বাড়ি ফিরে এসেছেন। শ্রীমঙ্গল পৌঁছলেই দেখতে পাবো আমাকে নিতে ছাতা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মাওলানা সাহেব।
কথা শেষে পানসে হাসি হাসে হাজেরা। নিজের কষ্টকে প্রকাশ করতে কোনো ভণিতা করেনি সে। আমার কেনো জানি তার জন্যে অনেক খারাপ লাগে। মনে হয়, ভুল মানুষের বৃত্তে আটকা পড়ে আছে আমার এককালের শেষ বেঞ্চে বসা সহপাঠিনী।
আমার এইসব ভাবনার ফাঁকে এক ঝটকায় নিজের বিষণœতাকে ঝেড়ে ফেলে হাজেরা বলে, থাক মাওলানা সাহেবের কথা। এসো, যতোটা পথ যাবো আমরা পুরাতন সময়কে সঙ্গে নিয়ে যাই। লিপির কথা মনে আছে তোমার?
আবার পুরাতন সময়। আবার লিপি। ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া নিয়ে আমার আর লিপির কী তীব্র প্রতিযোগিতা। স্কুলের সবাই এটি বেশ উপভোগ করতো। স্যার কিংবা আপা আমাদের মধ্যকার এই প্রতিযোগিতাকে আরো উসকে দিতে চাইতেন। এইসব প্রতিযোগিতার মাঝে কোথায় জানি দুজনের একটা ঐক্যও হয়েছিলো। বয়স কম বলে, সেই সখ্যতা আলাদাভাবে চোখে পড়েনি, প্রাইমারি স্কুলের শেষদিন প্রথমবারের মতো টের পেয়েছিলাম, আমরা একজন অন্যজনকে প্রবলভাবে ভালোবেসেছি। একটা ব্যাপার, কেউ জানে না। কেবল আমি আর লিপি তা জানি। স্কুলের শেষদিন কলঘরের পেছনে আমরা একজন অন্যজনকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছি।
এরপর আরও দুই বছর লিপির সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিলো। সে বালিকা স্কুলের ছাত্রী। আমি এইডেড স্কুলের ছাত্র। একই এলাকার বাসিন্দা। প্রায় সময়ই একসাথে-একপথে আমরা স্কুলে যেতাম। লিপিকে তখন আমি অনেক চিঠি লিখেছি। ছেলেমানুষী সব চিঠি। লিপিও যতœ করে চিঠির উত্তর দিতো। এসব চিঠিতে কখনো আমরা একজন অন্যজনকে বলিনি ভালোবাসি, কিংবা ভালোবাসা কাকে বলে সেটিও আমরা জানতাম না। কিন্তু গভীর মমতা নিয়ে আমরা অনেক অনেক চিঠি লেখেছি।
লিপির বাবার ছিলো সরকারি চাকরি। একদিন বদলির আদেশ আসে তার। আমরা তখন ক্লাস সেভেনে। লিপির সঙ্গে আরেকটা গোপন ব্যাপার ছিলো আমার, কেউ জানে না সেটা। লিপিরা যেদিন আমাদের এলাকা ছেড়ে চলে যায়, সিলেট থেকে দিনাজপুর, তখন মনে হচ্ছিল, দিনাজপুর পৃথিবীর বাইরের একটা অঞ্চল। দিনাজপুরে যে যায় সে আর ফিরে আসে না কখনো। লিপি চলে যাওয়ার আগের দিন আমাকে তার প্রাইমারি স্কুলের ব্যাগটা দিয়ে যায়। ব্যাগটা দিতে লিপি আমাদের বাসায় এসেছে। আমার মায়ের সাথে কথা বলে। বাবার সাথে কথা বলে। তারপর আমার রুমে আসে। কথা বলতে পারে না সে। কেবল কান্না আসে। আমিও কাঁদি। তখন আমাদের মাঝে গোপন সেই ব্যাপারটা ঘটে। জীবনে প্রথমবারের মতো আমি কারো গালে চুমু এঁকে দেই। লিপি তখন চোখ বন্ধ করে থাকে। আমি তখন আরেকটা বিষয় আবিস্কার করি, চোখ বন্ধ করে থাকলেও কান্না আটকে রাখা যায় না। কান্নার শক্তি এমনই তীব্রতর।
সেই লিপিকে আমি ভুলে গেছি। দিনাজপুর যাওয়ার পর প্রথম প্রথম চিঠি লেনদেন হতো। তারপর হয়তো লিপি নতুন বন্ধু পায়, আমারও বন্ধু ভুবন বিস্তৃত হয়। একসময় লিপি আর আমি আমরা দুজনে পুরাতন স্মৃতি হয়ে যাই।
আজ হাজেরা আমাকে আবার লিপির কাছে নিয়ে যায়। জীবনে এই প্রথমবার আমি নিজের বাইরে অন্য একজন এই হাজেরাকেই বলি, জানো হাজেরা আমি লিপিকে খুব ভালোবাসতাম।
হাজেরার চোখ তখন ছলছল করে ওঠে। কাঁদছে নাকি মেয়ে? কী হলো হাজেরা, উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করি।
হাজেরা বলে, লিপির খবর জানো?
না-তো। ওরা দিনাজপুর যাওয়ার পর আর যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি।
আমার কথা শেষ হয় না, তার আগেই হাজেরা বলে, লিপি আর নেই। দশ বছর আগেই মারা গেছে সে।
হঠাৎ ট্রেন তীব্র ব্রেক কষে। কেউ একজন ড্রাইভারকে গালি দিয়ে উঠে। একটা বাচ্চা কাঁদে। এই ব্রেক, এই গালি, এই কান্না কিছুই আমাকে স্পর্শ করে না। আমার শরীর হিমশীতল হয়ে আসে। ট্রেনের সিটের সঙ্গে যেনো তীব্রভাবে আটকা পড়ে পা। হাজেরা আমার কাছে লিপিকে নিয়ে এসেছিলো, হাজেরা আমার কাছ থেকে লিপিকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। যে লিপি অনেক আগেই আমার জগত থেকে গত হয়েছে, তার গত হওয়ার সংবাদে সবকিছু ছাড়িয়ে লিপি যেনো সবচেয়ে বড় বর্তমান হয়ে দাঁড়ায়।
আমি কিছু বলতে পারি না। টের পাই, এটা এমন এক ধরনের শোক যার কোনো ভাষা নেই। হাজেরা আমাকে সময় দেয়। শোক সহ্য করার সময়। কিছু সময় তাই সে নীরব থাকে।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করে। হাজেরা আবার কথা বলে। যথারীতি লিপির কথা। সে বলে, সবার সঙ্গে যোগাযোগ না হলেও লিপির সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হতো। ও দিনাজপুর চলে গেলেও চিঠি লিখতাম আমরা। তারপর একসময় তার বাবা আবার বদলি হয়ে শ্রীমঙ্গল আসেন। আমার বাবাও তখন শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানে চাকুরি করেন। একদিন অবাক হয়ে আবিস্কার করি, লিপি আমার প্রতিবেশী। সেই থেকে লিপি ছিলো আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু।
আমি বলি, হাজেরা লিপির কথা থাকুক। আমরা অন্য কথা বলি।
হাজেরা বলে, না আমরা লিপির কথা বলবো। আজ এই ট্রেনে তোমার আর আমার সাথে আরো একটা মানুষ আছে। সে লিপি। চমৎকার সেই মেয়েটির কথা এখন আর কেউ বলে না। সবাই ভুলে গেছে। এসো আমরা আজ লিপির গল্পগুলো বলে যাই। জানো, তার একটা স্বপ্ন ছিলো, একদিন বড় ডাক্তার হবে। আমাকে বলতো, জানিস হাজেরা, এই যে চা-বাগান, এখানকার কত মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, আমি যদি ডাক্তার হতে পারি, এদের জন্য কিছু করবো।
হাজেরাকে থামিয়ে দিয়ে আমি বলি, মনে আছে হাজেরা লিপির একটা লাল জামা ছিলো। স্কুলে যেদিন বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান হতো সেদিন সে ঐ জামাটা পড়ে আসতো। একদিন কি হলো জানো, আমার বলপয়েন্ট কলমটা কালি ছেড়ে দিয়েছিলো, ঐদিন লাল জামাটা পড়ে এসেছিলো লিপি। আমি কী করলাম, বল পয়েন্টের কালি তার লাল জামায় লাগিয়ে দিলাম। এরপর টানা এক সপ্তাহ লিপি আমার সাথে কথা বলেনি।
হাজেরা বলে, লিপি শ্রীমঙ্গল আসার পর তোমার গল্প করতো। তোমরা নাকি একজন অন্যজনকে চিঠি লিখতে?
হ্যাঁ। কেনো জানি না হঠাৎ করেই চিঠি লেখা বাদ দিয়েছিলাম দুজনে।
হাজেরা বলে, কী লিখতে তুমি চিঠিতে?
আমি বলি, চিঠি যে লিখে মনে রাখার দায় তার নেই, চিঠি যে পায় মনে রাখতে হলে সেই রাখে। লিপি গেছে, যাওয়ার সময় আমার চিঠিগুলোও সঙ্গে নিয়ে গেছে।
আর লিপি যে চিঠিগুলো লিখতো তোমাকে, মনে আছে সেইসব চিঠির কথা, জানতে চায় হাজেরা।
আমি বলি, কিছু তার মনে আছে, কিছু তার ভুলে গেছি। একটা বিষয় মনে আছে, প্রতিটি চিঠির শুরুতে চমৎকার সম্মোধন করতো লিপি, চিঠি শুরু হতো প্রিয় বান্ধব সম্বোধনে। আর আমি প্রতিটি চিঠির শুরুতে লিখতাম, লিপির শুরুতে ভালোবাসা নিবে।
হাজেরা বলে, লিপির কথা সব সময় আমার কেনো বিশেষভাবে মনে পড়ে, জানো?
কেনো, বিশেষ কোনো কারণ আছে নাকি?
হ্যাঁ। আমার যেদিন বিয়ে হলো সেদিন সকালেই লিপির মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে অনেক কেঁদেছি। সবাই বলে কনের কান্না। আমি শুধু জানি প্রিয় বন্ধু লিপির জন্য কাঁদছি।
কী হয়েছিলো লিপির, জানতে চাই আমি।
হাজেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, জানি না। তবে মনে আছে, শেষ দিকে খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলো সে। তার বাবা মারা গেলেন। পরিবারের জমানো সঞ্চয় ছিলো খুব কম। মাও প্রায় সময় অসুস্থ থাকতেন। এক পর্যায়ে অবস্থা এমন দাঁড়ালো মায়ের চিকিৎসার খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হতো। এসব কারণে লেখাপড়াও আর হয়নি তার। যে মেয়ে ডাক্তার হতে চেয়েছিলো, মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পরই পড়া ছাড়তে হয় তার। হাজেরা বলে, লিপি তার জীবনের শেষ সময়ে ছিলো বড় বেশি হতাশ। সবকিছুই যেনো তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। আসলে কখনো কখনো আমার মনে হয়, মরে গিয়েই বেঁচে গেছে লিপি।
হাজেরা যখন লিপির গল্প বলে তখন আমি হাফপ্যান্ট পড়া লিপিকে দেখি, স্কুলের মাঠে দৌড়ছে সে। দৌড়ছে লিপি, আমার প্রিয় সহপাঠী লিপি, আমার প্রথম প্রেম, আমার প্রথম ভালো লাগা। দৌড়তে দৌড়তে এ কোথায় চলে গেলি তুই বন্ধু, এভাবে কি যেতে হয়?
আমার হঠাৎ মনে পড়ে, আসলে হঠাৎ দেখা কবিতার দীর্ঘদিন আটকে থেকে আমি আসলে নিজের অজান্তে লিপির জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। একদিন তার সাথে আমার ট্রেনে দেখা হবে, এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানাবে কাছে আসতে। তারপর বসবো এক বেঞ্চিতে। নানা কথার ফাঁকে সে বলবে, ‘কিছু মনে কোরো না, সময় কোথা সময় নষ্ট করবার। আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই; দূরে যাবে তুমি, দেখা হবে না আর কোনোদিনই। তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে, শুনবো তোমার মুখে।’ তারপর জানতে চাইবে, আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি?’
হাজেরা যেনো আরো কী কী বলে। আমি তার কিছু শুনি না। তারপর সে বলে, এই অপু, কী হলো?
ভাবনা থেকে বাস্তবে ফিরে আসি। হাজেরাকে বলি, লিপিকে আমি ভুলে ছিলাম, কিন্তু সে বেঁচে ছিলো, আমার ভুলে যাওয়ার মধ্যে সে চিরকালই বেঁচে থাকতো, অথচ আজ তাকে মনে করিয়ে দিলে তুমি, আর মনে করিয়ে দিয়ে নিষ্ঠুরের মতো চিরকালের জন্য তাকে মৃত করে দিলে। আর কখনো ট্রেনে তাকে দেখবো বলে অপেক্ষায় থাকবো না। হঠাৎ দেখা কবিতাটা আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাবে?
হাজেরা জানতে চায়, তুমি বুঝি তাকে খুঁজতে?
আমি বলি, চেতনায় নয় অবচেতনে আমি আসলে বহুদিন থেকে লিপিকে খুঁজছিলাম। হাজেরাকে বলি, শোনো হাজেরা দৈবক্রমে যদি তোমার সাথে দেখা হলো, দৈবক্রমে যদি তোমার আমার যাত্রায় লিপিও সঙ্গী হলো, তবে শোনো তোমার কাছে কিছুই গোপন করবো না। জীবনে প্রথম জড়িয়ে ধরেছিলাম তাকে। জীবনে প্রথম বিয়োগের কান্না আমি তার জন্য কেঁদেছি।
হাজেরা বলে, মরে যাওয়ার পর কী হয় আমি জানি না, কিন্তু আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে, লিপি নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও বসে তোমার কথা শুনছে। লিপি নিশ্চয়ই অনেক অনেক খুশি হচ্ছে।
লিপি নিয়ে আমাদের কথাবার্তা এতটুকুই হয়। পাঁচ ঘণ্টার যাত্রাপথে হাজেরা আরো নানাভাবে লিপিকে নিয়ে আসতে চায়। আমি উপেক্ষা করি। এক সময় সেটা ধরতে পারে সে। আমাদের গল্পগুলো তখন ছেলেবেলার অন্য গল্পগুলোর সন্ধান করে। এক সময় একই এলাকায় থাকতাম আমরা। তাই এলাকার মানুষগুলোর কথাও গল্পে আসে। পারাবত ট্রেনের ’চ’ নম্বর বগিটির অন্য যাত্রীরা হয়তো ভাবে, আমরা দুজন মাঝবয়েসি মানুষ তাদের সঙ্গী। কিন্তু আমরা জানি, কামরার এই দুইটি সিটের দুই বাসিন্দা পুরোটা পথ পাঠশালা স্কুলের বয়েসি হয়ে পার করেছি। আমাদের ঘোরলাগা চোখ ছিয়াশির ক্যালেন্ডারে আটকে আছে।
গল্পে গল্পে ট্রেন এক সময় শ্রীমঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছে। বোরকার আড়ালে আমি হাজেরার বেদনাহত দুইটি চোখ দেখি। ট্রেন যখন একদম শ্রীমঙ্গলের কাছাকাছি তখন প্রচ- সাহসী এক প্রস্তাব করে বোরকায় আপাদমস্তক ঢাকা হাজেরা। সে বলে, কিছু মনে করো না, অপু, আমার খুব ইচ্ছা করছে একবার ছেলেবেলাকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখি। তুমি কি তোমার হাতটা একটু বাড়িয়ে দেবে?
ট্রেনের আর কোনো যাত্রী দেখলো কি না কে জানে, আমি হাত বাড়িয়ে দেই। আমার হাত ধরে হু হু করে কাঁদে হাজেরা।
তারপর ট্রেন ঠিকই শ্রীমঙ্গলে থামে। ছোট দুটি ব্যাগ হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় হাজেরা। কোনো বিদায় সম্ভাষণ নয়, আবার দেখা হওয়ার আশাবাদ নয়, বোরকা পড়া অচেনা মহিলা হিসেবেই ট্রেন থেকে নামে হাজেরা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই, অনেক মানুষের ভিড়ে হাজেরা যেভাবে বলেছিলো, ঠিক সেভাবেই ছাতা হাতে এক মাওলানাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। উদ্বিগ্ন চোখে ট্রেনের কামরার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। এক সময় হাজেরা গিয়ে তার সামনে দাঁড়ায়। আমি গভীরভাবে প্রত্যাশা করি, হাজেরা চোখ ফিরে তাকাবে। হাজেরা তাকায় না। ট্রেনের হুইসেল বাজে। ট্রেন ছেড়ে দেয়। স্টেশনে অনেক মানুষ। আমি হাজেরার দিকে তাকিয়ে থাকি। হাজেরা চোখ ফেরাও, একবার চোখ ফেরাও হাজেরা। ট্রেন চলে যাচ্ছে। আমি জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেই। ট্রেন ছুটছে। তখনই, ঠিক তখনই মুখ ঘুরিয়ে তাকায় হাজেরা। মানুষের ভিড়। আমি কিছু দেখি না। আমি হাজেরার চোখ দেখতে চাই। বোরকার আড়ালে তীক্ষè আর গল্পভরা দুই চোখ। দেখা হয়ে উঠে না আর। স্টেশন আর স্টেশনের মানুষগুলো একসময় ছোট হয়ে আসে।
সিলেট পৌঁছতে আরো ঘণ্টা দেড়েকের যাত্রা। ক্লান্ত অবসন্ন বোধ করি। চোখ বন্ধ করে দেই। হাজেরার চোখ দুটি দেখি। মেয়েটার জন্য প্রবল মায়া হয়। একসময় তন্দ্রামতো আসে। তন্দ্রাতেও পাঠশালা। মতিন স্যারের ক্লাস। রোল কল করছেন স্যার। সোহরাব হাসান অপু, হাজির স্যার। রাহাত খান রাছি, উপস্থিত। নাসিমা বেগম বাবলী, উপস্থিত। মোজাম্মিল হোসেন মোরশেদ, উত্তর নেই। রুবিনা খান লিনা, প্রেজেন্ট স্যার, হাজেরা বেগম লিপি, উপস্থিত।
ভীষণ চমকে উঠি, এক ঝটকায় ঘুম ভেঙে যায়। এত বোকা আমি, এত বিস্মৃতিপ্রবণ! মনে পড়েছে, এই তো স্পষ্ট মনে পড়েছে, লিপির অন্য নাম হাজেরা বেগম। বোরকা আমাকে বোকা বানিয়ে গেছে। লিপি আমাকে বোকা বানিয়ে গেছে। হাজেরা আমাকে বোকা বানিয়ে গেছে। হাজেরা পরিচয়ে শ্রীমঙ্গলে যে মেয়েটি নেমে গেলো সেই তবে মরে যাওয়া লিপি ছিলো। মনে পড়ে এই কিছু সময় আগের কথোপকথন। লিপির অনেক স্বপ্ন ছিলো। লিপি ডাক্তার হতে চেয়েছিলো, লিপি চা-বাগানের দরিদ্র মানুষগুলোর সেবা করতে চেয়েছিলো। স্টেশনে লিপির জন্য ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে ছিলো তার মাওলানা স্বামী, নাহ লিপির জন্য নয়, হাজেরার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলো তার স্বামী।
আবার হঠাৎ দেখা কবিতার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে একটা লাইন, ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে।’

গল্প >> নিম সম্পর্ক : কৃষ্ণেদু পালিত

নিম সম্পর্ক

কৃষ্ণেদু পালিত

ইচ্ছে নেই তবু যেতে হবে। এর আগে প্রতিবারই একটা না একটা অজুহাতে এড়িয়ে গেছে। এবার আর সম্ভব নয়। জয়ন্তর কাছে কোনো আপত্তি ধোপে টিকবে না। ওর এক বন্ধু নিউ আলিপুরে থাকে, সে খবরটা এনেছে। আমেরিকা থেকে দিন সাতেকের জন্যে একজন বিখ্যাত গাইনোকলজিস্ট আসছেন কলকাতায়। ভদ্রলোকের নাম টি.এন. ভেলেংকার। প্রবাসী ভারতীয়। ইচ্ছে হলে মউলকে একবার দেখিয়ে নিতে পারে। .
শোনা অবধি অন্ধকার দেখছে মউল। চোখের সামনে সমস্ত দৃশ্য বন বন করে ঘুরছে। একটু একটু করে লোপ পাচ্ছে চেতনা আর একটা অভিশপ্ত দুপুর ভয়ঙ্কর হাঁ নিয়ে ছুটে আসছে তার দিকে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, মাথার উপর জ্বলন্ত সূর্য, ধীর পায়ে পথ ভাঙছে এক কিশোরী, স্কুল থেকে ফিরছে সে। রোগা, লম্বা, ধবধবে শাদা পায়ের রং। চোখ দুটো খুব বড় বড় আর ব্যক্তিত্বপূর্ণ। ক্লাস নাইনে উঠে সদ্য শাড়ি ধরেছে। শাদা জমির উপর নীল পাড়, নীল ব্লাউজ। রাস্তা সংক্ষেপের জন্যে ডান দিকের একটা গলি ধরলো মেয়েটি। জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরমে চারদিক নির্জন। মেয়েটি আপন মনে হাঁটছিলো। হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে মূর্তিমান তিন শয়তান আচমকা মেয়েটির মুখ চেপে ধরে। এদিকটায় সারাদিন লোকজন প্রায় আসে না বললেই চলে। একটা মিলের পেছন ভাগ। কারখানার যত নোংরা আর বর্জ্য পদার্থ এখানে ফেলা হয়, তবু একটু সুুযোগ পেতেই মেয়েটি চিৎকার করার চেষ্টা করে। সঙ্গে সঙ্গে ভারি একটা হাত, যার দু’ আঙুলের ফাঁকে কালো জড়ুল, ডান ভ্রুর মাঝখান বরাবর কাটা দাগ - মেয়েটির মুখ চেপে ধরে।

ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া ছিলো। ঠিক সাড়ে ছ’ টায় জাগিয়ে দিলো। সাড়ে সাতটার মধ্যে তৈরি হয়ে নিলো মউল। শাদার উপর বুটি দেওয়া শান্তিপুরী তাঁত পরেছে আজ। ঘাড়ের নিচে আলতো একটা খোঁপা। মুখে হালকা পাফের পরশ। নো কসমেটিক্স। ঠোঁটে সামান্য রঙ পর্যন্ত না। সাজগোজের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই অনীহা মউলের। বিশেষ করে অ্যাকসিডেন্টের পর। তারপর তো বাবা কলকাতার পাট উঠিয়ে দিলেন। মান সম্মান, মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে থানা-পুলিশ করেননি। পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে এসেছেন।

মাস দুই পরের ঘটনা। তল পেটে চিনচিনে ব্যথাটা প্রথম টের পায়। তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তখনকার মতো পেইন কিলার খেয়ে নিতো। যন্ত্রণাটা মাঝে মধ্যেই হতো। একদিন মাঝরাতে মরণাপণ্ন অবস্থা। তখন শ্রাবণ যায় যায়। ঝড় জল বৃষ্টি... সেই রাতেই হসপিটালে ভর্তি করা হলো। সিরিয়াস কন্ডিশন। এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি। প্রায় তিন মাস ধরে ফিটাস ফেলোপিওন টিউবের মধ্যে গ্রো করে আছে। তারপর রাপচার্ড। অ্যাবডোমিনাল ক্যাভিটি রক্তে ভরে গেছে। জীবন বাঁচাতে ফেলোপিয়ান টিউব কেটে বাদ দিতে হলো। সমস্ত জীবনের মতো মউল হারালো নারীর সাধারণ সত্তা।
ডাক্তারবাবু বাবাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, আর কোনো ভয় নেই, তবে সাময়িক একটু ডিপ্রেশন হতে পারে। চেষ্টা করবেন ওর মনটা সবসময় ভালো রাখতে।
পরিবর্তে বাবা নিজেই ভেঙে পড়লেন। ভেঙে পড়লো মা। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভাবনায় শোকে মূহ্যমান দুটি প্রাণী। সামান্য ডিপ্রেশন হলেও তখন অতোটা বোঝেনি মউল। বুঝেছে ক্রমশ, যত বড় হয়েছে। তাকে ঘিরে মা-বাবার কোমল পরিবেশ রূঢ় হয়েছে ধীরে ধীরে।
বিয়ে করবে না মনস্থির করেছিলো। দেখতে খারাপ নয়। লম্বায় চওড়ায় যে কোনো বাঙালি মেয়ের কাছে ঈর্ষণীয়। পাত্রীর বাজারে যথেষ্ট কদর। দেখতে এসে কেউ কখনও অপছন্দ করেনি। শিক্ষিত, সুশ্রী, গৃহকর্মে নিপুণা। সুুপাত্র কেনার মতো বাবার পর্যাপ্ত টাকাও আছে। আর পেটের দাগ? যা হোক একটা বলে চালিয়ে দিতে পারতো। তারপর?
মউল বিয়ে করবে না, একে একে সমস্ত পাত্রপক্ষকে ফিরিয়ে দিয়েছে। যতোই বুঝান মা-বাবা আত্মীয়-স্বজন। নিজের জীবনের অভিশাপ, জেনেশুনে অন্যের ওপর চাপাবে না। চাকরির চেষ্টা করছিলো। হয়তো পেয়েও যেতো। হঠাৎ জয়ন্তর আবির্ভাবে সব চিন্তা-ভাবনা উলটো-পালটা হয়ে গেলো।
বিয়েতে মত দিলো সে।

মিনিট কুড়ি ধরে বিভিন্ন পরীক্ষার পর ডা. ভেলেংকার মউলকে বাইরে ওয়েটিং রুমে বসতে বললেন। জয়ন্ত চেম্বারে। যা বলার তাকেই বলবেন।
ওয়েটিং রুমে বসে ভিতরে ভিতরে ভাঙছিলো মউল। এরকম একটা আশঙ্কা জয়ন্তকে মনে ধরার পর থেকে ছিলো। বিয়ের পর থেকেই মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছে। তবু...।
মউল ঘামছে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে সবকিছু আর ভয়ঙ্কর সেই দুপুর একটু একটু করে থাবা বাড়াচ্ছে। যন্ত্রণা। তলপেটে অসহ্য যন্ত্রণা। উরু বেয়ে রক্তের স্রোত। বুকের জামা ছেঁড়া। সদ্য প্রস্ফুটিত বুকে হিংস্র নখের আঁচড়। গালে নীল ক্ষত। যন্ত্রণায় ঠোঁট কামড়ে ধরেছিলো, পাতলা ঠোঁট চিরে জমাট রক্ত। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো সে।
এসব কথা জয়ন্তকে আজও বলা হয়নি। চেষ্টা করেছে, পারেনি। একটু একটু করে গত পাঁচ বছরে অনেকটাই ভালোবেসে ফেলেছে জয়ন্তকে। মানুষটাকে তাই আঘাত দিতে চায়নি।
একটু পরেই জয়ন্ত বেরিয়ে আসে। গম্ভীর। মি. ভেলেংকারের সাথে কী হয়েছে সেই জানে। মউলের সাথে একটাও কথা বললো না। এমনকি ফিরেও তাকালো না। সোজা গিয়ে ফিয়াটে চাপলো। পেছন পেছন মউল। ভয়ে মুখ শাদা। বুকের ভিতর ঢিপঢিপ করছে। মনে মনে শক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। এমন একটা দিনের ‘অপেক্ষা’ তো দীর্ঘদিনের!
রাস্তায় একটা কথাও বললো না জয়ন্ত। মউলকে বাড়ির সামনে নামিয়ে গাড়ি ব্যাক করল। কোথায় গেলো কিছু বলে গেলো না। ফিরলো রাত করে। মত্ত অবস্থায়। এমনিতে মদ খায় না, মাঝে মধ্যে এক আধ পেগ খেলেও ধরার মতো কিছু নয়। আজ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। দরজা খুলতেই ভিতরে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। ধরে তুলতে যাচ্ছিলো মউল, বাধা দিল।
- ডোন্ট টাচ মি। আ-উ-ট। আই সে গেট আউট। নষ্টা, কুচরিত্রা মেয়েমানুষ ...
- কী বলছ তুমি !
- ঠিকই বলছি। জয়ন্ত টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়। রাগে চোখ জ্বলছে। বলে, অস্বীকার করতে পারবে, বিয়ের আগে তোমার প্রেগনান্সি আসেনি? পাপের মূল্য দিতে টিউব কেটে বাদ দিতে হয়নি?
মউলের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। কথা বলতে পারে না। জোরে জোরে শ্বাস নেয়। দু’ মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর শান্ত অথচ রূঢ়স্বরে উচ্চারণ করে, আই ওয়াজ রেপ্ড। রেপ্ড বাই থ্রি এভিলস, হোয়েন আই ওয়াজ থার্টিন। কথা বলতে বলতে হাঁপায় সে। নিশ্বাসে আগুন ছোটে। মুহূর্ত চুপ থাকার পর আবার বলে, তেরো বছর আগে। এই অঞ্চলের এক গলিতে।
জয়ন্ত চমকে ওঠে। নেশাটা টাল খায়। সামলে নিয়ে মউলের হাত চেপে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে, জেনেশুনে কেনো আমার জীবনটা নষ্ট করলে। কোন অধিকারে ! হো-য়া-ই? হোয়াই ইউ হেল মাই লাইফ?
এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় মউল। জয়ন্তর কাছ থেকে এতোটা আশা করেনি। ভেবেছিলো বিয়ের এতো বছর বাদে ভালোবাসা অনেক দৃঢ় হয়েছে। যেখানে দাঁড়িয়ে...। ক্রুদ্ধ সাপিনীর মতো ফুঁসে উঠলো। দু’ চোখ ঘৃণা আর ক্ষোভের জ্বলন্ত অঙ্গার। এতোদিনে সেই মুহূর্ত এসেছে।
- প্রশ্নটা আমিও তোমাকে করতে পারি।
- তার মানে !
জয়ন্ত’র পেটের মধ্যে একটা রাবারের বল ড্রপ খেয়ে গলায় আটকে যায়। ভয়ে কাগজশাদা মুখ। গলার স্বর ভাঙা।
মউল তখনও হাঁপাচ্ছে। কোনো উত্তর দিলো না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শ্বাস নিলো। কিছুটা সময় নিয়ে হাড় হিম করা ঠাণ্ডা গলায় কেটে কেটে উচ্চারণ করলো, একটা অসহায় মেয়ের পক্ষে প্রতিশোধ নেওয়ার এছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।
- কী বলতে চাও তুমি? জয়ন্ত’র গলায় আটকে থাকা বলে প্রবল অস্বস্তি। ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
- ভদ্রলোক সেজে যতই সাধু হও, দু’ আঙুলের ফাঁকে কালো জড়ুল আর ভ্রুর কাটা দাগ দেখে প্রথম দিনই তোমাকে চিনেছিলাম ...
এক ঝটকায় গলায় আটকে থাকা বলটা সরে যায়। অসহ্য যন্ত্রণায় পেটের ভিতর মোচড় মারে। মেঝে ভাসিয়ে হড়হড় করে বমি করে ফেলে জয়ন্ত। সন্ধ্যায় গেলা দামি মদ আর চীনা খাবারের কিছুই এখন আর আলাদাভাবে চেনা যায় না।
উত্তর চব্বিশ পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

গল্প >> ঘাসফুলের নাকফুল : মোহছেনা পারভীন

ঘাসফুলের নাকফুল

মোহছেনা পারভীন

হুঁকোয় একটা টান দিয়ে চেঁচিয়ে মেয়েকে ডাক দেয় নেকবর। কইরে, কই গেলি রুকি হুক্কায় কয়ডা কয়লা চুলা থাইকা আইনা দে দেহি। হুক্কায় টান দিয়া মজা পাইতেছি না। রুকি বাপের হুঁকোর জন্য কয়েক টুকরো জ্বলন্ত কয়লা চুলা থেকে নিয়ে কলকিতে ভরে ফুঁ দিতে থাকে। নেকবর মেয়েকে বারণ করে জোরে ফুঁ দিতে, আগুন ছিটকে মুখে কাপড়ে লাগতে পারে।

মা মরা মেয়ে রুকি। জন্মের দু’ মাসের মাথাতেই মাকে হারায়। মা মরা মেয়েটিকে আগলে রেখেছিলেন দাদীই। তিন বছরের মাথায় মারা যান দাদীও। সেই থেকে রুকির বাপ-মা সবই নেকবর। নেকবর ধনী গেরস্তের বাড়ির ধানকাটা, ধানের বীজ বোনা, ধানের চারা রোপনের কাজ করে। যখন ফসলের ভরা মৌসুম তখন খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে নেকবর। রুকিকে নিয়ে তখন মুশকিলে পড়ে যেতো, ছোট্ট মেয়েকে একলা ঘরে রেখে আসতে পারতো না। খেতের আইলে বসিয়ে ধান কাটতো।

শ্যামলা বরণ মেয়েটির বয়স সবে ষোলো পেরিয়েছে। গাঁয়ের মেয়ে ষোলোতেই অনেক বড় হয়ে যায়। অনেক কিছু বুঝতে শেখে। মা নেই, সংসারের সব কাজ তাই রুকিকেই সামাল দিতে হয়। গ্রামের মেয়েদের সাথে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ির মাঝেও তাকে বাপের জন্য রাঁধতে হয়। ঘর গুছিয়ে রাখতে হয়। রুকিরও নিজেকে বড় ভাবতে ভালো লাগে। এখন ও শাড়ি পরে। 
রুকির একটা নাকফুলের ভীষণ শখ। নাকে পরলে কী সুন্দর লাগে। পাশের বাড়ির চাচির কাছে বলেছিলও সে কথা। চাচি হেসে বলেছিলো, বিয়ে হোক তখন পরতে পাবি। লজ্জা পেলেও বিয়ের কথায় আলাদা একটা শিহরণ অনুভব করে রুকি। খেলতে খেলতে নিজের সংসারের একটা স্বপ্নও এরই মাঝেই তৈরি হয়ে আছে তার হৃদয়ে। মাঝে মাঝে বিয়ের প্রস্তাবও আসে রুকির।

পুকুরঘাটে পানি আনতে গেলে রুকির চোখ আটকে যায় ঘাসফুলে। পুকুরের পারে ঘন ঘাস কার্পেটের মত ছেয়ে আছে। তার মাঝে ঘাসফুলগুলো যেনো একেকটা নাকফুল। পরম মমতায় ঘাসের কার্পেটে হাত বুলায় রুকি। একটি ফুল ছিঁড়ে নাকে পরে। মনে হয় নিজেরও একটা সংসার আছে। লজ্জা খেলা করে রুকির চোখেমুখে। নাক থেকে হঠাৎই খুলে পড়ে যায় ঘাসফুল। মনে পড়ে চাচির কথা। চাচি বলেছিলা, সতী নারীর প্রধান চিহ্নই হলো নাকফুল। সতী নারীর নাক থেকে স্বামীর দেওয়া নাকফুল কখনওই খুলে পড়ে না। চমকে ওঠে রুকি। আবার আরেকটি ফুল ছিঁড়ে জিহবার পানি দিয়ে ভিজিয়ে নাকে পরে। এবার নাকে আটকে আছে ঘাসফুলের নাকফুল। মুখে হাসি ফোটে রুকির। পুকুরের স্বচ্ছ পানির দিকে তাকায়। পানির ভেতরে নিজেকে দেখে। অন্যরকম লাগে। ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে নাকফুলের দিকে।

পশ্চিম পাড়ার এক বুড়ি ভিক্ষা করতে আসে রুকিদের গ্রামে। সবাই তাকে বগির মা ডাকে। ছোট থেকেই রুকিকে দেখছে সে। মায়া লাগে মেয়েটির জন্য। বাপের উপকার হয় এই ভেবে বগির মা তার গ্রামের এক ছেলের সাথে রুকির বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। ছেলের নাম নুরু মিয়া। রিকশা চালায়। বাবা নেই। আছেন শুধু বৃদ্ধা মা। ছোট্ট সংসারে মেয়ে সুখী হবে ভেবেই রুকির বাপও প্রস্তাবটি সানন্দে গ্রহণ করে। ছেলের পক্ষও রুকিকে দেখে খুব পছন্দ করে। তাদের কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। বৃদ্ধা শাশুড়ির সেবা করবে এটাই ছেলে পক্ষের চাওয়া।

পঞ্জিকা দেখে একটি ভালো দিনে বিয়ে হয় রুকির। সন্ধ্যার আগেই শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে যায় রুকি। গ্রামের মানুষ নতুন বৌকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমায় নুরু মিয়ার বাড়িতে। খুব সুন্দর লাগছিলো রুকিকে। বিশেষ করে নাকে চান্দি রূপার নাকফুলে বেশ মানিয়েছে নতুন বৌকে। সবার দৃষ্টি নাকফুলের দিকে। নুরু মিয়া দিয়েছে এই নাকফুল। 

পূর্ণিমা রাত। বালিকা বধূর সারা শরীরে ভরা জোছনার ঢেউ। মনে হচ্ছে বিয়ের শাড়িতে বাড়তি কারুকাজ। লম্বা ঘোমটা টেনে চোখ বুজে বসে থাকতে থাকতে রুকি কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেই বুঝতে পারেনি। সকালে মোরগের ডাকে তার ঘুম ভাঙে। ঘুম থেকে উঠে একটি ঝাড়– নিয়ে নেমে পড়ে উঠান ঝাড়– দিতে। আশপাশের অল্প বয়সের মেয়েরা রুকির উঠান ঝাড়– দেওয়ার দৃশ্য দেখার জন্য ভিড় জমায়। কত ভোরে নতুন বউ ঘুম থেকে উঠেছে সেটি দেখার জন্য বয়স্ক মহিলারাও নুরু মিয়ার বাড়িতে আসে। এই দলে ছিলো বগির মাও। বগির মায়ের চোখেই প্রথম ধরা পড়ে বিষয়টি। নাকফুল নেই নতুন বৌয়ের নাকে। বগির মা রুকিকে জিজ্ঞাসা করে, এই পোড়ামুখী তোর নাকফুল কই?  নাক স্পর্শ করে নাকফুলের অস্তিত্ব না পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় রুকি। পাগলের মতো উঠোনজুড়ে ধুলোবালি ময়লা-আর্বজনার মাঝে খুঁজতে থাকে নাকফুল। ততক্ষণে  পুরো গ্রামের বৌ-ঝিদের মাঝে খবর হয়ে যায় নতুন বউয়ের নাকের ফুল হারিয়ে যাওয়ার কথা। 
গ্রামের লোকের ধারণা বিয়ের রাতে নাকফুল হারিয়ে যাওয়া অশুভ লক্ষণ। অমঙ্গল হয় স্বামীর। ছেলের আশু অমঙ্গলের কথা চিন্তা করে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন নুরুর মা। মায়ের কান্না শুনে ঘুম ভাঙে নুরুর। বাইরে এসে সব কিছু জানতে পেরে নাকফুল খুঁজতে থাকে নুরুও। ঘরের ভেতর এলোমেলো বিছানায় খুঁজে পায় নাকফুল। সবাই আশ্বস্ত হয়। তবুও কথা থামে না বৌ-ঝিদের। রুকিকে ইঙ্গিত করে নানা কথায় শুনায়। রুকির কা-জ্ঞানহীনতার কোনো তুলনা খুঁজে পায় না তারা। লজ্জায় অপমানে বারান্দার খুঁটি ধরে মূর্তির মতো নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে রুকি। নুরু তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ঘরে। 

সুখে-দুখে রুকির দিন কেটে যাচ্ছিলো এক রকম। হঠাৎ বাড়ি থেকে নুরুর রিকশাটা চুরি হয়ে যায়। রুজি রোজগারের একমাত্র অবলম্বন রিকশাটি চুরি হয়ে যাওয়ায় সকলেরই যেনো মাথায় হাত পড়ে। রুকিও ভীষণ ভাবনায় পড়ে। কীভাবে চলবে সংসার! শাশুড়ির চিৎকারে রুকির ভাবনার জাল ছিঁড়ে। রুকির শাশুড়ি চিৎকার করে বলতে থাকে, এই পোড়াকপালী যেইদিন আমার বাড়িতে আইছে হেইদিন থাইকাই আমার অমঙ্গল শুরু হইছে। আভাগীর বেটি পরথম দিনই যখন নাকফুল হারাইছে হেই দিনই বুঝবার পারছি এই মাইয়া আমার সংসার ধ্বংস করতে আইছে। নুরুরও মনে হলো মা ঠিকই বলছে। এতোদিন তার রিকশা চুরি হয়নি। এখন কেনো চুরি হবে! মনে মনে রুকির প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই খেপার মতো ঘরে ঢুকে রুকিকে টেনে হিঁচড়ে উঠোনে এনে বুকে পিঠে কিল দিতে শুরু করে নুরু। অসহায় রুকি বাবা গো-মাগো বলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। রুকির কান্নায় নুরুর কোনো ভাবান্তর হয় না। সে চিৎকার করে বলতে থাকে। অলক্ষ্মীর মাইয়া তোর লাইগা আমার রিকশা গেছে তুই এহন তোর বাপের কাছ থাইকা আমার রিকশা আইনা দিবি। 

স্বামীর সংসারে রুকির এখন আর কোনো মূল্য নেই। রিকশা হারানোর পর থেকে নুরু মিয়া যেনো পাল্টে গেছে। কথায় কথায় রুকির দোষ ধরে। বাপের কাছ থেকে রিকশা এনে দেওয়ার জন্য প্রায়ই রুকিকে নির্যাতন করে করে সে। একটু ছুতো পেলে শাশুড়িও ছেড়ে কথা কন না। রুকি নীরবে সব হজম করে। জানে তার বাপের সামর্থ নেই রিকশা এনে দেওয়ার। তাই নীরবে সয়ে যেতেই হবে। 
এক রাতে ক্লান্ত রুকি ঘুমিয়ে আছে। চুপিচুপি ঘরে ঢোকে নুরু। আস্তে করে রুকির নাকফুলটি খুলে নেয়। টের পায় না রুকি। পরদিন সকালে নুরু এক গ্লাস পানি চায় রুকির কাছে। যন্ত্রের মতো নুরুকে পানি এনে দেয় রুকি। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে আচমকা নুরু বলে উঠে, তোর নাক ফুল কই? উত্তরে রুকি বলে, ক্যান নাকেই তো আছে। 
ঝাঁঝিয়ে উঠে নুরু, নাকে থাকলে কি জিগাই? কী করছোছ ক’?
নুরুর ঝাঁঝালো কণ্ঠে ভয় পেয়ে নাকে হাত দেয় রুকি। টের পায় নাকের ফুল নেই। হয়তো নিচে পড়ে গেছে, তাকায় মেঝের দিকে। 
কিছু বুঝে উঠার আগেই গ্লাসের পানি রুকির চোখেমুখে ছুঁড়ে মারে নুুরু। নে তোর পানি তুই খা। আমি তোর হাতে কিছুই খামু না। তুই অলক্ষুণে। তোর শ্বাসেও বিষ। এই বিষে আমার মরণ হইবো। যা আমার ঘর থাইকা বাইর হ। এই বলে নুরু রুকিকে লাথি দিতে থাকে। টেনে হিঁচড়ে তাকে বের করে দেয় ঘরের বাইরে। 

ক্লান্ত দেহে রুকি ফিরে আসে নিজের গ্রামে। মেয়ের চেহারা দেখে যা বুঝার বুঝে নেয় নেকবর। স্বামীর সাথে ঝগড়া হয়েছে হয়তো। মেয়েকে কিছুই বলে না নেকবর। বুঝতে পারে এখন কথা বললে মেয়েটির কষ্টই শুধু বাড়বে। ভাবে দুয়েক দিন যাক, নিজেই দিয়ে আসবে মেয়েকে।

খুব ভোরে ঘুম ভাঙে নেকবরের। মেয়েকে ডাকতে চায় না, ভাবে ক্লান্ত মেয়েটা একটু বিশ্রাম নিক। চোখ পড়ে পুকুর পাড়ে। এতো ভোরে পুকরপারে জটলা দেখে অবাক হয়। এগিয়ে যায় নেকবর। ভিড় ঠেলে সামনে এগোয় সে। পুকুরে চোখ পড়তেই স্তব্ধ হয়ে যায় নেকবর। পানিতে ভাসছে তার আদরের মেয়ে রুকি, নিষ্প্রাণ। মুখ ঢেকে আছে পারে থাকা ঘাসফুলে। ঝাপসা হয়ে আসে নেকবরের চোখ।

গল্প >> দেখে শেখা : নীহারুল ইসলাম

দেখে শেখা

নীহারুল ইসলাম

আসুর কথামতো গোদাগাড়ির ঘাটে উঠেই তোয়েব আলি যে লোকের সঙ্গ পেয়েছিল, সেই লোকটা তাকে যেখানে নিয়ে এল সেটা একটা কানাগলি। লোকটাকে নিয়ে প্রথম থেকেই তোয়েব আলির শঙ্কা ছিলই, এতক্ষণে মনে ভয় ধরল। সে যেতে চেয়েছিল রাজশাহী ইউনিভারসিটি। যেখানে একজন গল্পকার থাকেন। যার সঙ্গে তার দেখা করা খুব জরুরি। কিন্তু এই লোকটা তাকে কানাগলির ভেতর দিয়ে কোথায় যে নিয়ে যাচ্ছে! সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তার মাথা কাজ করছে না। 
অনেক খোঁজ-খবরের পর হাসান সাহেবের ঠিকানা পেয়ে খানিকটা উত্তেজনার বশেই তোয়েব আলি গতকাল সন্ধ্যায় আসুর কাছে গেছিল। আসু তার স্কুল-জীবনের বন্ধু। যদিও মাধ্যমিক পাস করার পর আর পড়েনি। রোজগারের ধান্ধায় কাসিমের ঘাটে লেগে গেছিল। এখনও কাসিমের ঘাটেই থাকে। চাল-ডাল, গরু-ছাগল-মুরগি, মানুষ, ...আরও কত কী যে এপার-ওপার করে তার হিসাব নেই। সেই আসুর কাছে গিয়ে সে বলেছিল, ‘ভাই রাজশাহী যাবো। তুই একটু ব্যবস্থা করে দে।’ 
আসু ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিন্তু এ কেমন ব্যবস্থা? লোকটা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কানাগলির ভেতর কোনও ইউনিভারসিটি থাকে নাকি? তোয়েব আলি নিশ্চুপ থেকে লোকটাকে আর অনুসরণ করতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছেন ভাই? আমি যে ইউনিভারসিটি যেতে চাই। 
লোকটি যেমন হাঁটছিল তেমনি হেঁটে যেতে যেতে বলল, বেশি কথা কইবেন না। চুপচাপ চলে আইসেন আমার পিছু পিছু। কেমন যেন হুকুমের সুর। তোয়েব আলির ভয় আরও বেড়ে গেল। গোদাগাড়ির ঘাটে নৌকা থেকে নেমে এত ভয় পায়নি সে। আসু বলে দিয়েছিল,  ‘ঘাটের ওপরে চায়ের দোকানে বসে থাকবে আমার লোক। তোর কোনো চিন্তা নাই। তুই যেখান যেখান ঘুরবি, যার সঙ্গে ইচ্ছে দেখা করবি, লোকটা তোর সঙ্গেই থাকবে। তোর কাজ হয়ে গেলে তোকে আবার গোদাগাড়ির ঘাটে নিয়ে এসে নৌকায় উঠিয়ে দেবে।’ 
আসুর কথামতো ঘাটের ওপর একটা চায়ের দোকানেই লোকটাকে পেয়েছিল সে। নাকি লোকটাই তাকে পেয়েছিল? দোকানের বাইরের দিকের একটা বেঞ্চে বসেছিল অদ্ভুত ভঙ্গিতে। গভীর মনোযোগের সঙ্গে টিভি দেখছিল। কিন্তু তাকে দেখে তড়াক করে লাফিয়ে উঠেছিল। এতক্ষণ যেন টিভিতেই পদ্মা পেরিয়ে তাকে আসতে দেখছিল। তেমন ঘোর নিয়েই এগিয়ে এসে বলেছিল, আপনি কি আছমহম্মদ ভায়ের দোছত্ লাগেন? ইন্ডিয়া থিক্যা আইছত্যাসেন? আপনার নাম তোয়েব আলি? আপনার কি ভারছিটি যাওয়ান লাগবো? হাছান ছাহেবের ছঙ্গ ছাক্ষাৎ করান লাগবো?
তোয়েব আলি দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে বলেছিল, জী। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি আমাকে চিনলেন কী করে? আর এত সব জানলেনইবা কী করে? 
- ইন্ডিয়ানরে দ্যাখলেই আমরা চিনতে পারি। তাছাড়া আছমহম্মদভাই আমারে সব কইয়া পাঠাইসে। আইছেন ভাই। এহ্যানে দাঁড়াইয়া কাম নাই, আমার ছঙ্গ ধরেন। 
তোয়েব আলি লোকটার সঙ্গ ধরেছিল। খানিকটা হাঁটা পথ। তারপর প্রায় আধ ঘণ্টা কিংবা চল্লিশ মিনিট বাস-জার্নি করে রাজশাহী বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে রিকসা করে যে জায়গাটায় লোকটা তাকে নিয়ে নামল, সেখানে একটা সিনেমা হল আছে। নাম ‘অলকা’। যার গা গেঁষে এই কানাগলি! 

দুই
কানাগলি পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত লোকটা তাকে যেখানে নিয়ে এল সেটা একটা বস্তি। তোয়েব আলির অন্তত তাই মনে হল। সে তাদের গ্রামের পাশেই গোলাপনগর বস্তি দেখেছে। বাঁশের খলপার টাটির ঘর। ওপরে করোগেটেড-টিনের ছাউনি। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অনেকগুলি একই রকমের ঘর। অনেক পরিবার। কাচ্চাবাচ্চা পিলপিল করছে। তাদের ডিঙিয়ে-মাড়িয়ে লোকটার পিছু পিছু একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তোয়েব আলি। ঘরের ভেতরটা আবছা, কেমন এলোমেলো সব! অগোছালো! সেই রকম একটা ঘরে তাকে এনে লোকটা বলল, বহেন ভাই! একটুখানি জিরান ল্যান। ছরবত খান। তারপর ভারছিটি যাওয়ান লাগবো। আপনার চিন্তার কারণ নাই। আমি আছি। আছমহম্মদ ভায়ের দোছত্ আপনি। তার মানে আমারও দোছত্। মুনে করেন এই বাড়ি আপনার নিজের বাড়ি। লোকটা যত সহজে এবং যেভাবে কথাগুলি বলল, তোয়েব আলির মাথায় কিছু ঢুকল না। কোথায় বসবে তাও বুঝতে পারল না। খালি দেখল একজন মহিলা বড় ফুল তোলা কাঁচের গেলাসে সরবত নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। তাকে বলছে, ল্যান ভাই - ধরেন। সরবত খান। সেই কুন পোঁহাতে বেরহ্যালছেন। ঘাটায় খাবার তো দূর পানিও জুটেনি বোধায়। লয় ভাই? 
মহিলা নিশ্চয় লোকটার বউ! তোয়েব আলি অনুমান করে। কিন্তু বুঝতে পারে না একজন মহিলা অপরিচিত এক পরপুরুষের সামনে এত স্বচ্ছন্দ হয় কী করে? যদিও সে মহিলার হাত থেকে সরবতের গেলাসটা হাতে নেয়। মহিলার কথার উত্তরে বলে, জী না। 
ইতিমধ্যে মহিলাকে ঘিরে ধরেছে এক গ-া কাচ্চাবাচ্চা। তারা কিলবিল করতে করতে বলছে, মা সরবত খাবো। মা সরবত দে না গে! ও মা! জোর পিয়াস লেগ্যাছে। 
এই দৃশ্য দেখে তোয়েব আলির হাতের গেলাস হাতেই থেকে যায়। মুখে তুলতে পারে না। 
অথচ বাচ্চাদের দিকে খেয়াল নেই মহিলার। মেহমানকে নিয়েই সে ব্যস্ত। মেহমানের দেশে তার বাপের বাড়ি। বর্ডার পেরিয়ে বহুদিন সে বাপের বাড়ি যেতে পারে না। সে কথা মেহমানকে শোনাতে চায়। তার বাপ-মা কেমন আছে, জানতে চায়। কিন্তু মেহমান সরবতের গেলাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে যে! বসতেও জায়গা দেয়নি। হঠাৎ খেয়াল হতেই শরমে ছিঃ! ছিঃ! বলে উঠে মহিলা। তারপর ছুটে যায় ঘরের বাইরে। মেহমানকে বসতে দেবার জন্য কিছু একটা আনতে বোধহয়। 
লোকটা এতক্ষণ ঘরে ছিল না, কথা বলতে বলতে কখন বেরিয়েছিল খেয়াল করেনি। এখন করল। আবার ঘরে ঢুকে লোকটা প্রচ- ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘরের এক কোনায় একটা কাঠের আলমারি থেকে কী বের করতে করতে বলছে, জলদি করেন ভাই। ভারছিটির ক্লাছ শুরুর আগেই গিয়ে আপনার হাছান ছাহেবেরে ধরতি হবে। নাকি খুব দরের মানুষ। ছময়ের দাম বুঝে। আমি খোঁজ-খবর নি আইলাম। আপনি জলদি ছরবতটা খাইয়া ল্যান। 
এবার আর সরবতের গেলাস হাতে ধরে থাকতে পারে না তোয়েব আলি। পিপাসা তার লেগেই আছে। ধূ ধূ চরে বালির ওপর প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটা চাট্টিখানি কথা নয়। তবু সে হেঁটে এসেছে। হাসান সাহেবের টানে এসেছে। হাসান সাহেবের লেখা একটা গল্প, ‘শকুন‘ পড়ে সে যেমন অভিভূত হয়েছে, অবাকও কম হয়নি! একজন গল্পকার, যিনি বাস করেন বরেন্দ্রভূমিতে। অথচ বাগড়ি পেরিয়ে তিনি গল্প লিখছেন রাঢ়বাংলার পটভূমিতে! আবার এমন একটা গল্প যা বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া লেখা সম্ভব নয়। তোয়েব আলির এমনই মনে হয়েছে। কারণ ‘শকুন’ গল্পের চরিত্রগুলির একটা চরিত্র সে নিজেই। পড়াশুনার পাশাপাশি রাখাালি করেছে। রাখাল বালকদের সঙ্গে অমন শকুন সে কত মেরেছে! যখন মামার বাড়িতে থাকত। শুধু তাই না, তার মামার গ্রামের রাখাল বালকেরা যে ভাষায় কথা বলে, ‘শকুন’ গল্পের চরিত্ররাও সেই ভাষায় কথা বলছে। অথচ ভাষার চরিত্র হচ্ছে প্রতি দশ কিলোমিটার অন্তর অন্তর বদলে যাওয়া। তাহলে এটা কী করে সম্ভব? 
এই সব কারণেই বিনা পাসপোর্টে বন্ধু আসুর সহায়তায় সে ছুটে এসেছে এই বিদেশ-বিভূঁয়ে। যে দেশটায় আবার গণতন্ত্র নেই, সামরিক শাসকের অধীন। বিপদ-আপদের তোয়াক্কা করেনি তোয়েব আলি। যদিও একটু আগে গাইড লোকটার ভাবভঙ্গি দেখে তার মনে ভয় ধরেছিল। এখন কিন্তু সে অনেকটাই স্বাভাবিক। এখন খালি তার ভাবনা কতক্ষণে সে ইউনিভারসিটি পৌঁছবে! হাসান সাহেবের সঙ্গে তার কতক্ষণে সাক্ষাত হবে! ভাবতে ভাবতে ফুল তোলা বড় কাঁচের গেলাসটা মুখে লাগিয়ে চোঁ চোঁ টানে একবারেই শেষ করে ফেলল। গেলাসটা নিচে নামিয়ে রেখে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে বলল, চলেন ভাই। যাই তাহলে এবার! 
- হ্যাঁ ভাই। চলেন যাই। 

তিন
ঘর থেকে বেরিয়ে তোয়েব আলির চোখ পড়ে দরজার বাঁ-দিকে একটা পরিত্যক্ত জায়গায়। ইটের প্রাচীর ঘেরা। প্রাচীর কোথাও এক ফুট দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তার মধ্যেখানে একটা অবহেলিত শিবলিঙ্গ। পাশেই একটা বেলগাছ দাঁড়িয়ে। জায়গাটাকে ছায়া করে আছে। তোয়েব আলির হঠাৎ-ই মনে হয়, এখনও লোকটার নাম জানা হয়নি। বুরবক কাহেকা! মনে মনে নিজেই নিজেকে গাল পেড়ে তোয়েব আলি লোকটাকে জিজ্ঞেস করে, ভাই আপনার নাম?
লোকটা কানাগলি পেরোতে পেরোতে বলে, আছুভাই আমার নাম বলে নাই আপনাকে? 
বলেছিল কী? হয়ত বলেছিল। তাড়াহুড়ো আর উত্তেজনায় খেয়াল করেনি। তবু তোয়েব আলি মনে করতে চেষ্টা করে। কিন্তু মনে করতে পারে না।
লোকটা তাই দেখে বলে, না বলে ঠিক কামটায় করত্যাসে। 
- কেন? তোয়েব আলি জিজ্ঞেস করে। 
- আমার নাম শুনলে ভয় পাইয়া হয়ত আপনি আছতেনই না। 
- কেন, আপনার নামে কী আছে যে আমি ভয় পেতাম? 
-কিসু তো আসেই। না হইলি মানুষে আমারে ভয় পায় ক্যান? লোকটার চোখমুখে অহঙ্কার ফুটে ওঠে। 

চার
কানাগলি থেকে বেরিয়ে ততক্ষণে ওরা বড় রাস্তায় উঠেছে। লোকটা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। হয়ত রিকসা খুঁজছে। হ্যাঁ, ঠিক তাই। একটা খালি রিকসা যেতে দেখে লোকটা হাঁক ছাড়ল, এ্যই রিকছা রহছ! 
রিকসাওয়ালা তার হাঁক শুনে রিকসা ঘুরিয়ে নিয়ে এল ওদের কাছেই। লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, কোনে যাইবেন জালুভাই? ছঙ্গে মেহেমান দেখত্যাসি। ইন্ডিয়া থেক্যা আইত্যাসে বুঝি? কে লাগে? ভাবীজানের ভাই নাকি? 
- বকবক করত্যাসিছ ক্যান? ভারছিটির গেটে সাইড়া আসবি চল। তার আগে নিউমার্কেটের পেসনটায় চল তো একবার। নিজামে নাছতা খাওয়ান লাগব। ধমকের স্বরে বলল লোকটা। তোয়েব আলি এতক্ষণে লোকটার নাম জানল। জালু। রিকসাওয়ালা সেই নামেই তো ডাকল। নামটা তো বেশ ভালো। জলিল কিংবা জালালুদ্দিন। সংক্ষেপে জালু হয়েছে নিশ্চয়। তাহলে লোকটা কেন বলল যে, নাম শুনে ভয় পান যদি! 
যদিও ব্যাপারটা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবে না সে। ততক্ষণে রিকসাটা ছুটতে শুরু করেছে বড় রাস্তা ধরে। দু’জন পূর্ণ-শরীরের মানুষকে হাড্ডিসার রিকসাওয়ালা ছোঁড়া কীভাবে যে অমন ছুটিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তোয়েব আলি বুঝতে পারছে না। আশপাশ দিয়ে নামী-দামী মোটরগাড়ি ছুটছে। রাস্তার দু’ধারের বাড়ি-ঘর গুলিও বেশ। চর হেঁটে পদ্মা পেরিয়ে এত কাছে এমন একটা শহর বিরাজ করছে, তা তার কল্পনাতেও ছিল না। ভাগ্যিস ‘শকুন’ গল্পটা পড়েছিল!
পাঁচ
কিছুক্ষণেই রিকসাটা এসে দাঁড়ায় এমন এক জায়গায়। সেখানে না আছে নিউমার্কেট না আছে বাজার। আছে বলতে রাস্তার ধারে নয়নজুলির ওপর গোটা গোটা বাঁশের পাটাতন। তার ওপর সার সার খলপার টাটির ঝুপড়ি ঘর। ওই ঘরগুলি আবার এক-একটা হোটেল। কোনোটার নাম আমিনা। কোনোটার নাম মহল। কোনটার নাম কোহিনূর! জালু লোকটা বলল, নামেন ভাই একটু নাছতা কর‌্যা যাওয়ান ভালো। আপনার হাছান ছাহেব আপনাকে কতক্ষণে সাড়ব না সাড়ব! খাওয়ার কথা কইব, না কইব। তার ঠিক নাই। এই আমাদের আমিনা-নিজাম হোটেল আছে। বাঢ়িয়া খানা মিলবে। গেলেই মালুম পাইবেন।
লোকটা তাকে বাড়িতে এক গেলাস সরবত খাইয়ে হোটেলে এনে নাস্তা খাওয়াবে। তোয়েব আলি ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে কূল- কিনারা পাচ্ছে না। রিকসা থেকে নেমে বেবাক দাঁড়িয়ে আছে। 
লোকটা ততক্ষণে ওই সব হোটেলগুলির একটিতে ঢুকে পড়েছে। বাইরে আলকাতরা দিয়ে লেখা ‘নিজাম হোটেল’। তোয়েব আলিও পিছু পিছু গিয়ে ঢুকল সেখানে। মোটা মোটা গোটা বাঁশের পাটাতনের ওপর গজাল গেঁথে বেঞ্চ-হাই বেঞ্চ আটকানো। তাতে বসে অনেকেই খাচ্ছে। হোটেলকর্মী, খরিদ্দারদের হাঁটাচলায় পাটাতন একটু-আধটু দুলছে। কারও কোনওরকম ভ্রুক্ষেপ নেই। কেউ খেতে ব্যস্ত, কেউ খাওয়াতে ব্যস্ত। অথচ তোয়েব আলির ভয় করছে। বাঁশের পাটাতনের নিচেই বিশাল খাল। খালে কাদা-জল সমান সমান। সেই কাদা-জলে অসংখ্য কাক আর কুকুরে দাপাদাপি। কোনও কারণে পাটাতন ভেঙে পড়লে আর দেখতে হবে না। কাক-কুকুরে ছিঁড়ে খাবে। ইতিমধ্যে খানা পরিবেশিত হয়েছে তার সামনে। সে খেয়াল করেনি। লোকটা তাকে খেয়াল করাল, খেয়ে ল্যান ভাই। ঠা-া মারলে আর খাইতে পারবেন না। লোকটার কথায় তোয়েব আলি দেখল চিনামাটির বড় বড় দু’টি প্লেট। একটাতে তন্দুরি। আর একটাতে পায়চা। পায়চা দেখে তোয়েব আলির চোখ কপালে উঠার জোগাড়। গরুর গোটা ঠ্যাং সাজিয়ে দিয়েছে যেন চিনামাটির প্লেটে! সত্যিই বাঢ়িয়া খানা। কিন্তু পায়চার হাড় এত বড় বড় কেন? কীভাবে খাবে? এতবড় হাড় মুখে লাগিয়ে মজ্জা টানা যায় নাকি? হঠাৎ তোয়েব আলির মনে পড়ে যায় মাকে। আব্বাকে। ছোটবেলায় মা যখন আব্বার সঙ্গে ইদের নামাজ কিংবা জুম্মার নামাজ পড়তে পাঠাত। তার যেতে ইচ্ছে করত না। আব্বাও চাইত না সে যাক। বলত, ‘এতটুকু বাচ্চা নামাজের কী জানে যে নামাজ পড়বে?’ 
মা তখন বলত, ‘জানে না বলে কি জানতে হবে না?’ 
‘কীভাবে জানবে? আমার সঙ্গে গেলেই জানা হয়ে যাবে?’ আব্বা জিজ্ঞেস করত। 
মা জোর দিয়ে বলত, ‘আলবত জানা হবে।’ 
‘কীভাবে?’ 
‘কেন, তোমার সঙ্গে নামাজে দাঁড়াবে। তুমি যা করবে, ও তাই করবে। বাচ্চারা তো দেখে-শুনেই বড় হয়।’ 
আব্বা বলেছিল, ‘বাহঃ বেশ তো বুদ্ধি তোমার!’ 
আব্বা সেদিন মাকে রসিকতা করলেও মায়ের সে দিনের সেই বুদ্ধিকে আজ কাজে লাগায় তোয়েব আলি। তার পাশে বসা লোকটা। যার নাম জালু। এই বিদেশ-বিভূঁয়ে যে তার গাইড! সেই লোকটা কী ভাবে পায়চা খাচ্ছে? সে দেখবে। 

ছয়
তোয়েব আলি ভালো করে দেখছে। লোকটা বাঁ-হাতটা পায়চার প্লেটের ওপর ধরে ডান হাতে পায়চার মোটা হাড়টা শক্ত করে ধরে ডান হাতের কবজি বাঁ-হাতের কবজিতে বাড়ি মারছে। আজব ব্যাপার ওতেই ওই মোটা হাড়টার ভেতর থেকে মজ্জা খসে খসে পড়ছে চিনা মাটির প্লেটে। গল্পকারের খোঁজে এসে গল্পের খোঁজ পাচ্ছে তোয়েব আলি। তার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। তার আনন্দে নিচের খালের কাদা-জলে অগুনতি কুকুর লটাপটি খাচ্ছে। কাকগুলি হোটেলের নিচের বদ্ধ হাওয়ায় মুক্ত হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। ওদের সবার উল্লাস ভেসে আসছে তার কানে। একই সঙ্গে মায়ের আঁচল ধরে বস্তির কাচ্চাবাচ্চাদের কান্না শুনতে পাচ্ছে সে। ‘মা খেতে দে না গে মা! এ-মা! পেট জ্বলে যেছে যে গে মা!’ লোকটার ঘরের দরজার পাশে পরিত্যক্ত শিব মন্দিরে শিবলিঙ্গের মাথায় বসন্ত বাতাসে পাশের বেলগাছ থেকে একটা-দু’টো বেল পাতা খসে খসে পড়ছে। তোয়েব আলির চোখে সেই দৃশ্যও ভেসে উঠছে। তোয়েব আলি শুনে শিখছে। দেখে শিখছে। তোয়েব আলি বড় হচ্ছে। 
তোয়েব আলির মা কবরে শুয়ে তৃপ্তি পাচ্ছে।
মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত 

মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত