মঙ্গলবার, ৯ নভেম্বর, ২০১০

প্রবন্ধ >> মণিপুরী সংস্কৃতির অন্তর্গত লড়াই ও রাসলীলা : শুভাশিস সিনহা

মণিপুরী সংস্কৃতির অন্তর্গত লড়াই ও রাসলীলা

শুভাশিস সিনহা

একটি শিল্পআঙ্গিক বা সাংস্কৃতিক উপাদানের বিচার করতে গিয়ে তার ভৌগলিক-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের সাথে নির্ণিত এবং বিনির্মিত রূপটির ভেতরটি ধরতে না গিয়ে নন্দনতত্ত্ব অনেক সময় কেবল তার বাহ্যকাঠামোর চুলচেরা বিশ্লেষণে গলদঘর্ম থাকে এবং শেষতক সেই জাতি-সাংস্কৃতিক বর্গটির সর্বনাশ না করে ছাড়ে না। মণিপুরীদের শত বছরের প্রচলিত রাসলীলার ক্ষেত্রেও তা-ই দেখা গেছে। রাসনৃত্যের মুদ্রাগুলো অনন্য... পোশাকটা এতো রাজকীয়... গায়কীটা খুব শ্রুতিমনোহর... এতো চমৎকার পারফরম্যান্স আর হয় না... ইত্যাদি ইত্যাদি। মণিপুরীদের রাসলীলানুকরণ অনুষ্ঠান যারা দেখতে আসেন, বা সোজা কথায় যারা রাসনৃত্য দেখতে আসেন, তাদের মন্তব্য এরকমই। শিল্পের মাপকাঠি দিয়ে মেপে মেপে একটি জনপদের একটি বিশাল কাণ্ডকে মাপার চেষ্টা বহুদিন ধরে চলেছে। ক্লাসিকাল নাচের গ্রামার দিয়ে, লোকজ উপাদানের শিল্পবিচারের দণ্ড দিয়ে ইতোমধ্যে রাসলীলাকে বেশ অলঙ্কৃত করা গেছে। কিন্তু ভেতর থেকে দেখার আর বুঝবার সবচেয়ে কঠিন আবার সবচেয়ে সাদামাটা যে রাস্তাটা, সেই রাস্তায় কেউ যায়নি বলা যায়। আমরা যে এখন যেতে পারব তারও নিশ্চয়তা নেই। কারণ বিষয়গুলো এখন বেশ অভ্যস্ত একটা ভাব নিয়ে ফেলেছে, আর তরিকা চেনাটাও কঠিন। কিন্তু এটা তো সত্য যে, রাস মানে কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, কেবল একটা কৃত্যও নয়, আরও কিছু। কী সেটা। শিল্পরুচির আধুনিকতা নিয়ে চাখলে, সেই স্বাদটা কি পাওয়া যাবে?
পয়লা আমরা ইতিহাসে যাই। আজ থেকে প্রায় আড়াইশ বছর আগের কথা। ভারতের মণিপুর রাজ্যের রাজা ভাগ্যচন্দ্র স্বপ্নে দেখলেন তিনি রাসলীলার আয়োজন করেছেন। নিজের কন্যা বিম্বাবতীকে রাধারূপে দেখলেন। এরপর মণিপুরে আয়োজিত হয় প্রথম রাসলীলা, ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে। এর পেছনে আরেকটা প্রাসঙ্গিক কাহিনী আছে। সেটা হলো মণিপুরের প্রাকৃত ধর্মানুসারী মণিপুরী জাতিসত্তা তার কিছু আগে সবেমাত্র বৈষ্ণব ধর্মের বলয়ের মধ্যে এসেছে। বাঙালি বৈষ্ণব প্রচারকেরা মণিপুরে গিয়ে এ ধমের্র বীজ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর মণিপুরের জনগণ ততদিনে নিজেদের অন্তর্বিতর্কের সূত্রগুলো বেশ চিনে নিয়েছিলো । ফলে বেড়েছে দ্বন্দ্ব। এম্নিতেই নানান মত, পার্বণ আর কৃত্যছাওয়া রাজ্যটি। অনেকেই তাই কৃষ্ণ-রাধার পর-ঐহিক সম্পর্কের গাঁথাটিকে খুব আদরে মেনে নিলো। অনেকে মানলো না। সে যাই হোক, রাসলীলা প্রেক্ষিতটাকে এখন হয়ত একটু চিনে নেয়া গেলো। অপরের ধর্মকে নিজের করে নেওয়া বা নেওয়াবার জন্য একটা বিশাল হাতিয়ার ছিলো রাসলীলা, অন্তত ভাগ্যচন্দ্রের কাছে। বৈষ্ণব পদকর্তাদের নানান পদ ও বোল নিয়ে মনিপুরী চিন্তকেরা রচনা করতে লাগলেন রাসলীলার আঙ্গিক। আর ভারতের ভরত প্রমুখ শিল্পগুরুদের নানান মুদ্রা বা করণের সাথে মণিপুরের লোকনৃত্যকলার নানান নমুনার পরিমিত সিনথেসিস গড়ে উঠল এই নব্য ক্লাসিক শিল্পআঙ্গিকে। সব কিছুই কিন্তু একটি ধর্মদার্শনিক ভাবনা অধিগ্রহণের প্রয়াস। বৈষ্ণবিজম গিয়ে ছিলো বাঙলা থেকে, ফলে রাসলীলায় বাঙলায়ন তো থাকবেই, আর ক্লাসিক রীতিতে ভাষার যে উচ্চতার ধারণা থাকে, তার প্রেক্ষিত অপ্রাতিষ্ঠানিক ধর্মমতাবলম্বী মণিপুরীদের মাঝে ছিলো ভাষাগত হীনম্মন্যতাও। ফলে সহজেই বাংলা গানগুলো নিয়ে নেয়া হলো।
কিন্তু বাঙলা হলে কী হবে, তার গায়কী, উচ্চারণ রীতি, ভঙ্গি, আবেগ, প্রক্ষেপণ সবকিছুতে থেকে গেলো একেবারেই মণিপুরী ছাপ। যে কারণে এখনো অনেক বাঙালি চিন্তকের কাছে অবিশ্বাস্য যে রাসলীলার গানগুলো বাঙলা বা অপভ্রংশ বা ব্রজবুলি ভাষায় হয়। শুনেও তারা ধরে উঠতে পারেন না যে এটা বাঙলা। তাদের ধারণা সব গানই মণিপুরী ভাষার। আর গায়কীর মজাটা মণিপুরী ধরনে, সেখানে মিহি আর কাঁপা কাঁপা সুরের বৈচিত্র্য আছে। আর মণিপুরীদের নিজেদের শিল্পনকশার ধারণা থেকে বানানো হলো পোশাক, অনেকটাই রাজকীয়, সোনার আর জরির কাজ করা, দেখলে চোখ পলক ফেলবে না। আর মণিপুরীরা কীর্তনের খোল আর ঢোলের একটা সংমিশ্রন করে নিলো। যার নাম মৃদঙ্গ। এর চামড়া খুবই শক্ত। আর সহজপ্রাপ্তও নয়। অর্থাৎ একটা প্রান্তিক জনপদের মানুষ একটি ধর্ম আর মতাদর্শকে মেনে নিলো, কিন্তু দিয়ে দিলো নিজস্বতার ছাপ। কেউ বলতে পারবে না যে এটা আর কোনো জাতির বা বাঙালির।
তো রাস হয়ে গেলো। একেবারে আদিমধ্যঅন্ত সম্পন্ন একটি কাহিনীমূলক নয়, ভাবাত্মক প্রযোজনা। গান আর নাচ, সাথে বাদ্য। কেন্দ্রে কৃষ্ণ আর রাধা। কিন্তু এই কৃষ্ণ আর রাধাকে স্বর্গ আর মর্ত্যে পৃথক করার উপায় নেই। তারা দুজনেই একেবারে মর্ত্যের মানুষ। এভাবে ভাবলেই আবেগের খেলাটি জমে ওঠে। শিল্প হবার পরে সেটা মনেরই সম্পদ হতে চায়। আর তা ভাবুক বা দার্শনিকের নয়। রাসের মণ্ডলি বা মাটিতে রাধাকৃষ্ণরূপী শিল্পীরা নেচে গেয়ে প্রেমলীলা করে, আর ভক্তরা আর কাউকে মনে করে আবেগায়িত হয়, কাঁদে, এই কৃষ্ণের বাইরে তারা আর কোনো সত্তাকে খুঁজতে থাকে। অসংখ্যবার রাস দেখবার পর এমনই মনে হয়েছে।
মণিপুরে নানামাত্রিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত শুরু হয়ে গেলো, মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নেই। বারবার আন্তঃ ও অন্তর্কোন্দল আর বর্মীদের আক্রমণে বিপর্যস্ত অনেক মণিপুরী ভারতের সীমানা ছেড়ে চলে এলো বাংলাদেশে। নিয়ে এলো তাদের বিশ্বাস ও কৃত্যের মিশ্র আচার।
জীবনকে নতুন করে সাজানো আর নিজের সম্মানজনক অস্তিত্বের জানান দেয়া। সারারাত ধরে যে অনুষ্ঠানটি চলে, তার সময়গত একটা ক্ষমতাই প্রথমে ধরা পড়বে, এটা স্বাভাবিক। আর নাচ গান অভিনয় ভঙ্গিমা সব মিলিয়ে জটিলতার একটা বিশাল ক্যানভাস। এটাকে নিয়েই জানান দিতে হবে নিজেদের অস্তিত্বের রূপটা। আর তারই ভেতরে শিকড় গাঁড়ল দিনকে দিন নিজের ভাব আর দর্শনের জায়গাটাও। সেখানে বিরহ মূখ্য, অর্থাৎ বিরহের যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানো, অন্তিমে পা রাখা। কৃষ্ণ সেই লক্ষ্য। আর যাত্রীরা সকলে রাধা। এক কৃষ্ণের মণ্ডলে রাধা আর অজস্র গোপিনীর লীলা সে সত্যই সামনে আনে- আমরা পরমআবর্তিত সামান্য কতোগুলো চিহ্ন মাত্র।
এই ভাবকে চেনানোর জন্য ভাগবত গ্রন্থের একটি অধ্যায় যতোটা কাজ করেছে, তার চেয়ে মনে হয় বেশি মানুষের তাড়িত জীবনের আবেগ আর বেদনা। ভূমি হারানোর যন্ত্রণা। এই হারানো আর পাওয়ার মধ্যকার দ্বন্দ্বের নামই যেনো রাধা। রাধার মধ্য দিয়ে মণিপুরী জনগণ যেনো পৌঁছে যায় নিজেদের জৈবনিক ব্যথাভারাতুর সত্তাটির কাছে।
এখন এই কাণ্ডগুলোর ব্যাকরণিক যে  অবয়ব, তার দিকে একটু নজর দেয়া যাক।
রস্যতে অনেন ইতি রাসঃ। অর্থাৎ যার দ্বারা রস জন্মায় তাই রাস। এখন এই রসউৎপাদন বা নিষ্পত্তির জন্য রাসকাররা কতোই না কাহিনী ফেঁদেছেন। ফাঁদতে ফাঁদতে তারা আর থিতু হতে না পেরে রাসকে নানা ভাগে ভেঙেই ফেলেছেন। মহারাস, বসন্তরাস, কুঞ্জরাস, নিত্যরাস ইত্যাদি। সবের মূল কথা এক, তবে মূলকে চেনার বা পাওয়ার তরিকাগুলো ভিন্ন। বিভিন্ন কাল বা ঋতুর সাথে ভাবরসের একটা সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা। তবে নিত্যরাস কালনিরপেক্ষ। আর জনপ্রিয়ও হয়েছে এটাই।
যা হোক সব ধরনের রাস বিচার করে যে মূল কিছু সূত্র পাওয়া যায় সেগুলো হলো, রাসের আগে একটা পালা থাকবে। নটপালা। নট মানে অভিনেতা, অর্থাৎ অভিনেতাদের পালা । রাসের বলা যায় একটা প্রাগআয়োজন এটি। এটা পুরুষদের পালা। আর রাস মূলত নারীদের। অর্থাৎ একটা ভারসাম্য। এভাবে সাজানো থাকে আয়োজনটি।
নটপালাও রাধাকৃষ্ণের বিষয় আশয় নিয়ে। তবে তার ভাব শান্ত নয়, নাট্যমূলক। সেখানে দরাজ কন্ঠে উদাত্তভবে গান পরিবেশন করা হয়, আর লোকজ ধারার পরিবেশনার ভঙ্গি পাওয়া যায়। গায়ক সেখানে নিজেই পাত্রপাত্রী। আর থাকে বাদ্যের ঝনঝনানি। কিন্তু রাস ধ্যানের, ধীরস্থ। শুরু হয় রাগালাপ দিয়ে। সূত্রধারীরা দীর্ঘ সময় নিয়ে রাসের নির্দিষ্ট রাগগুলো গাইতে থাকেন। সাথে থাকে মৃদঙ্গের তাল।
এই দীর্ঘ রাগালাপের পর রাস শাস্ত্রকাররা বলেছিলেন বৃন্দাবনের গীতবর্ণন থাকবে। কিন্তু এটা অবাক করার বিষয় যে পুরাণের সীমা থেকে সরে রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কের সকল সূত্রের বাইরে আরেকটি চরিত্র রাসলীলায় অনিবার্য অংশ নিয়ে নিলো। স্থান করে নিলো ভাবক হৃদয়ে। তার নাম বৃন্দা। বৃন্দাবনে থাকে বলে তার নাম বৃন্দা, নাকি বৃন্দা থেকে বৃন্দাবন নাম হলো ঠিক করা মুশকিল। তবে এটা মেনে নিতে বাধা নেই যে বৃন্দা একেবারেই লোকমানসজাত। সে নারীচরিত্র, কৃষ্ণানুরাগীই কেবল নয়, কৃষ্ণঅন্তপ্রাণ, কৃষ্ণকে সেই আসরে ডেকে নিয়ে আসে, তার জন্য ফিদা বা বিশেষ আসন পেতে দেয়, নিজের সমস্ত মায়া প্রেম সে আসনে বিছিয়ে দেয়, এবং আকুল কন্ঠে গান করে- আমি কৃষ্ণের প্রেমে কাঙ্গালিনী/ বৃন্দাবনে বৃন্দা দুর্ভাগিনী / এ সুখনিশীথে যমুনাপুলিনে শ্রীরাসমণ্ডলে... / আমি যুগলচরণ সেবা করিব/ যুগলরূপ নেহারিব/ জীবন সফল করিব...। বোঝা গেলো এ বৃন্দার বাস যমুনার তীরে, সেখানেই রাসমণ্ডলি সাজায়, আর যুগলচরণ সেবা করে কৃষ্ণের। রাধার প্রেমে যে কৃষ্ণলীন হবার আকাঙ্ক্ষা, বৃন্দার প্রেমে সেটা নেই, বরং নিজেকে সেই পরম সত্তার চরণে সঁপে দেবার এক ভক্তিময় আকুলতা।
কেউ বলতে পারে না রাসলীলার কাহিনীতে বৃন্দা কবে কোথায় কীভাবে আসলো; কিন্তু এটা অনস্বীকার্য যে রাসের সবচেয়ে আবেদনময় রসময় আবেগবহ গীতিপর্যায়টি বৃন্দা-অংশেই থাকে। রাধা যখন নিখাদ মানবী হয়েও ভক্তরসিকের মনে কৃষ্ণ নামক অধরা সত্তাটির সাথে লীলাখেলায় গিয়ে নিজেকেও দৈবের অংশ করে ফেলল একসময়, তখনই কি বৃন্দা এসেছে মানবিক প্রেমের ব্যাকুলতা নিয়ে? কৃষ্ণকে নিজের করে পাওয়ার দরকার নেই, নিজেকে তার মঙ্গলময় সত্তার চরণদাসী করাই সাধনা, এটা বলাতে?
যা হোক, আমরা ফিরব রাসলীলার অঙ্গে। বৃন্দা কুঞ্জ সাজিয়ে দিয়ে গেলো, রাধা আর কৃষ্ণের প্রেমের বাসর সাজিয়ে দিয়ে গেলো। এরপর কৃষ্ণ আসনে এসে উপবিষ্ট হবেন। শিল্পীটি সচরাচর একজন বালক বা কিশোর। কিন্তু তার অভিনেয় অংশটি হবে প্রাপ্তবয়স্কের ভূমিকায়। যে গাইবে উঠিতে কিশোরী বসিতে কিশোরী, কিশোরী নয়ন রাধা... তাঁর মনের ভেতরটা তো বোঝাই যায়। এই বালককৃষ্ণ নেচে নেচে নানান ভঙ্গিতে মণ্ডলিময় রাধার প্রেমে আকুলতা বিলিয়ে যাবে। এরপর আসবে রাধা।
রাধা ও সখিরা অভিসার রচনা করবে কৃষ্ণ দরশনের। শুরু হবে নানান বাদানুবাদ।
এরই মধ্যে শাস্ত্রকারের নানান উপচার। ভঙ্গীপারেং থেকে শুরু করে অনেককিছুই। বাহ্যত বোঝা যাবে না কী বিশেষ অর্থ। কিন্তু একটি কৃত্যকলাকে শিল্পকলার বৈশিষ্ট্যে চির সমুন্নত রাখার যে ব্যাপক যজ্ঞ, সেখানে মুদ্রার নানান জটিলতা তো থাকবেই। আর ছিলো বলেই মণিপুরী সংস্কৃতি একটি আলাদা আসন নিয়ে দিব্যি অটুট রয়েছে। বাণিজ্যের শিল্পবেত্তারা এখানে হাত দিতে পারেন না। কারণ সেই কঠিন দীর্ঘসাধনের স্তরগুলোয় নিজেকে পুড়িয়ে খাঁটি করার ধৈর্য আর সাধনা কতোজনের আছে!
কিন্তু মণিপুরীরা পেরেছে এই কঠিন সাধনায় ব্রতী হতে। সমস্ত কিছুতে। তাই একটি কৃত্য, তার প্রস্তুতি চলতে পারে মাসব্যাপী। মূল লক্ষ্য মানত পূরণ, মঙ্গল, কিন্তু তার সিদ্ধিতে রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ একটি শিল্পরস সাধনের বহুল শর্ত। পোশাক থেকে শুরু করে মণ্ডলি সাজানো, নিমন্ত্রণকর্ম সবকিছুতে মানতে হবে অনেক বিধি নিষেধ।
রাসের শিল্পীরা যে পোশাক পরবে সেগুলোও হতে হবে নিখুঁত আর দেবতার উদ্দেশ্যে ধূপবাতি জ্বেলে সেগুলো নিবেদন করে প্রণাম জানাতে হবে। তারপরই পাবে পরিধানের স্বীকৃতি। এখনো তার কোনো ব্যতিক্রম নেই। এছাড়া গোপিনীদের নিয়ে রাসের আগের দিন হয় আরেকটি কৃত্য। রাসের অজা বা রাসধারীসহ সবাই মিলে এই কৃত্যটি করা হয়ে থাকে। নিজেদের একটি পরম মঙ্গলময় অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ভাবার বিশ্বাসের লীনবিন্দুতে পৌঁছানোর সূত্র।
আর সেদিন সেই প্রাগকৃত্যের অংশ হিসেবে রাসের একটু অংশেরও মহড়া হবে।
আর রাসের মঞ্চ বা মণ্ডলি, তাতেও সেই ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অটুটতা। বাঁশের খুটি বৃত্তাকারে গেড়ে উপরে কাগজের নকশা করা বেড়। সব মণ্ডলিই গড়নে এই একই রকম। নকশার মধ্যে আলাদা সৃষ্টিশীলতা, কিন্তু অবয়বে কোনো পরিবর্তন আসবে না। নকশাগুলোও বাজারচলতি নয়, মণিপুরী শিল্পমানসের ভেতর থেকে একটা ব্যাকরণে দাঁড় করানো বিশেষ প্রকারে তা হয়ে থাকে। মণ্ডলির নিচেও বৃত্তাকার এক-দুহাত উঁচু বেড়া। তার একদিক মাত্র খোলা। অর্থাৎ ভেতরে যাবার পথটি খুবই সঙ্কীর্ণ। যে যাবে সেই ছোট্ট পথের মধ্যেই নিজের রাস্তা বের করে ঢুকবে নৃত্যআসরে। গিয়ে প্রেম বা ভক্তি নিবেদন করবে।
কার কাছে প্রেম, কার কাছে ভক্তি? যে ছোট্ট ছেলেটি গতকালও ছিলো পাড়ার এক দুষ্টু কিশোর বা শিশু, তাকেই আজ কৃষ্ণের বেশে দেখে ভাবুক বা ভক্তের নয়ন অশ্রুবিগলিত। দুপায়ে তার লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি খায়, আত্মহারা। কৃষ্ণদর্শনের পুলক তার পুরোটা শরীরে ও হৃদয়ে। আবার এটাও নয় যে, সেই ভাবুক বা ভক্তগণ বিস্মৃত এই সত্য থেকে- সে আসলে কৃষ্ণের ভূমিকা নেয়া একজন শিল্পী। তার শিল্পভঙ্গিমার চমৎকারিত্বের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা থাকে ভক্তের মনেও। অর্থাৎ ‘ডায়ালেকটিক্যাল’ ভাবটা  দর্শকের মনে পর্যন্ত।  শিল্পী আর উদ্দিষ্ট সত্তা একই অঙ্গে বিরাজ করে, যে কৃষ্ণ সেই শিল্পী, তার শিল্পত্ব বিচার্য, আবার তার পরম কৃষ্ণত্বও প্রণম্য।
নিজের সন্তান, যে কৃষ্ণরূপে আবির্ভূত রাসমণ্ডলিতে, তাকেই কৃষ্ণজ্ঞানে স্রাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে বিহ্বল পিতৃমাতৃহৃদয়ও। আর এটাই রাস। জীবনের সকল চিহ্ন বাস্তবতার সীমার উপরের জমিনে গিয়ে অন্তরের নানান জায়গা থেকে চেনার মহাযজ্ঞ। এ যজ্ঞে ঘৃত নেই, আহুতি নেই, আছে ভাব রস প্রেম আর ভক্তি। আছে মহান বিশ্বাস।
এর সমাজতাত্ত্বিক কতো কার্যকারণই না থাকতে পারে। আমরা তা খুঁজতে যাইনি। এর সাথে জড়িয়ে আছে একটি প্রান্তিক জনপদের টিকে থাকবার সমস্ত কলাকৌশলের ছকও। খুঁটিয়ে দেখিনি। অনেকদিনের একটা প্রস্তুতি, আয়োজন, গ্রামে গ্রামে বিশেষ প্রকারের কৃত্যে বার্তন বা নিমন্ত্রণ, একটি রাতের পরিবেশনা... কেনো? এর মধ্যে কি কোথাও অগোচরে লুকিয়ে নেই সামাজিক সংহতি ও সম্মিলনের তাগিদ বা আকাঙ্ক্ষা?
অবশ্যই আছে। আছে বলেই, ভাবুকের যতো সমাগম রসিকের যতো সমাবেশ, রাসের রসনিষ্পত্তি ততই মনোহর, এ প্রবাদ আছে। আর গ্রামে গ্রামে বার্তন বা নিমন্ত্রণ পাঠানোর কাজটিও খুবই কঠিন বলা যায়। কেউ বাদ পড়বে না। প্রত্যেক বাড়িতে রাসের নিমন্ত্রণ পৌঁছানো চাই। আর প্রত্যেক বাড়ির কেউ না কেউ উপস্থিত থাকবে রাসে। নাহলে যে পরমমঙ্গলের প্রসাদ থেকে বঞ্চিত হবে।
রাস শুরু হয অনেক রাত করে। রাত বারোটা তো বেজেই যায়। এমনও হয়, একটা দুটো বেজে গেলো। কিন্তু শেষ হবে ভোরে, অবশ্যই। যদি কোনো রাস শুরু হতে দেরি হয়ে যায়, তাহলে মাঝখানে গুরুত্ববিবেচ্যে কিছু অংশ কাটছাঁট করে হলেও ভোরের মধ্যে তার সমাপ্তি টানতে হবে। সারারাত্রির অভিসার শেষে ভোরে যে রাধা আর সখিগণ নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসে। দিনের আলো যতো ফুটে উঠবে তত ধরা পড়বার ভয়। এ যে শান্ত পরিকল্পিত যৌথ পরকীয়া।
আসলে কার সাথে পরকীয়া? ভাবুক কী ভাবেন, যারা সারারাত রাস দেখেন, রাসে মগ্ন থাকেন? এই পরকীয়া নিজেরই ভেতরের সাথে, সেই সত্তা যে নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকে বস্তুজগতের নানান বাহ্যকাজের চাপে তাড়নায়? তাকেই বের করে এনে হৃদয়ের সাথে বোঝাপড়া, নাকি? নাহলে মানুষ রাসের মণ্ডলির চারধারে বসে কেনো কাঁদে হারানো প্রিয়জনের কথা ভেবে? রাসের রাধা বা বৃন্দা বা কৃষ্ণের আর্তির গীতনৃত্যভঙ্গির ভেতরে ঢুকেও কেনো মানুষ সেই ভাব আবেগ আর রসের রূপান্তর ঘটিয়ে ফেলে নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে? শুরু করে হাহাকার, আর্তনাদ, পূর্বপুরুষের বা অকালহারানো প্রিয় মানুষের নাম ধরে?
রাধাকৃষ্ণের মিলন শেষে বর্তি বা প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করা হয়, ব্রাম্মণ বা পুরোহিত সে আরতির মধ্যমণি, তিনি প্রদীপের থালা বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে আরতির গানের সূত্র ধরেন, সাথে থাকেন সূত্রধারীরা। গোপী রাধা কৃষ্ণ সবাই মণ্ডলাকারে সে আরতির আঁচ, তার মঙ্গলস্পর্শ নেয়, সমাগতরাও। অগ্নিশুদ্ধ জীবনের নতুন সঞ্চার।
মূলত এই তো রাস। একই কাহিনী, একই কথা, একই বক্তব্য, তবু বছরের পর বছর ধরে এই পুনরাবৃত্ত শিল্পকৃত্যআঙ্গিক মানুষের কাছে নতুন নতুন করে ফিরে আসে। নতুন যা থাকে তা অংশ নেয়া শিল্পী-বিচারে,  ভিন্ন ভিন্ন অজা বা রাসধারীর শিল্পরুচির তারতম্য অনুসারে নির্বাচিত গানের ক্ষেত্রে থেকে, কিন্তু ফিগার বা কাঠামো সেই একই। ক্লাসিকাল পর্যায়ের শিল্পনিরীক্ষা থেকে গৃহীত ভাবমুদ্রাগীতি ধীরে ধীরে একেবারেই লৌকিক বা প্রাকৃত হয়ে যায় রাসলীলায়। এ এক আশ্চর্য রূপান্তরকরণ। যদি তাই না হতো, তাহলে আবালবৃদ্ধবনিতা এভাবে রাসের স্বাদ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারত না। গানের কথায় সরল কমিউনিকেটিভ ধরন নেই, নাচের মুদ্রাগুলোর ভেতরেও নেই সহজ প্রকাশরীতি, প্রতিবেশ পরিবেশ কোথাও নেই লৌকিকতার সাধারণ উপাদান; তবু রাস সকলের, প্রাণের, অন্তরের, সব আবেগ আর আর্তির বোঝাপড়ার ফিরে দেখবার খুঁজে পাবার সমাবেশ।
মণিপুরীরা নিজেদের অস্থিরতার কালে, রাজ্যশাসকদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার সময়ে, আগ্রাসনের নতুন নতুন ধরনের মুখে একটি ভাবধর্মকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছিলো, সেখানে আচার নয় মন্ত্র নয়, ছিলো প্রেমে আর রসে পরমকে চিনবার তরিকা, সেখান থেকেই নিজেদের শিল্পনন্দনের ভাবনায় তারা আরও আড়াল তৈরি করলো একটি সুদীর্ঘ জটিল আঙ্গিক, একটি দুর্ভেদ্য আড়াল, সেই আড়ালের ভেতর প্রতিদিনের সাধনার ভেতর দিয়ে তারা নিজেরা নিজেদের কাছের হয়েছে, আত্মীয় হয়েছে, আর টিকে থাকবার রাজনীতিতে হারিয়ে ফেলবার বিরুদ্ধ লড়াইয়ে সেই আড়াল আর রহস্যের উচ্চ সৌন্দর্যআঙ্গিকের বিভায় স্বাতন্ত্রে তারা অক্ষুণ্ন থাকতে পেরেছে নিজেদের মুদ্রায় নিজেদের সুরে। রাসলীলা তাই মণিপুরীদের কাছে একটি সামগ্রিক ভাবলীলা, জীবন ভাবনা, পাওয়া না-পাওয়া মান- অভিমান অভিসার আর দর্শনের ব্যাকরণের ভিতর দিয়ে নিজের সাথে নিজের পরিচয় ও বোঝাপড়ার চলমান ব্যাকরণ।

>> পথিক ১৮

প্রবন্ধ >> কানু বিনা গীত নাই : চৌধুরী মুফাদ আহমদ

কানু বিনা গীত নাই

চৌধুরী মুফাদ আহমদ

শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র - এক রহস্যময় পুরুষ। মহাভারতের নানান লৌকিক অলৌকিক কাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হন এবং ঘটনাবলীর গতি প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি বিষ্ণুর অবতার। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি অর্জুনকে নানা বিষয়ে যে পরামর্শ ও বাণী প্রদান করেন তা-ই ‘গীতা’। ‘গীতা’ হিন্দুদের পরম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। আবার কাশিরাম দাশের মহাভারত বাঙালি হিন্দুর ঘরে ঘরে পঠিত একটি মহাগ্রন্থ। মহাভারত বা গীতার এই শ্রীকৃষ্ণ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিকট একজন পূজনীয় ব্যক্তি, বিষ্ণুর অবতার। আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিকট নানা কুটিল বুদ্ধিসম্পন্ন, নানা মহৎ গুণের অধিকারী একটি মহাকাব্যিক চরিত্র মাত্র। কিন্তু এই শ্রীকৃষ্ণই ব্রজের কানাই রূপে, রাধার প্রেমিক রূপে বাঙালির মনোজগতে অবাধে বিচরণ করেন। ব্রজের কানাইকে চিনে নিতে তার ধর্মীয় পরিচয় বা তার অবতারত্ব কোনো বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় না। তাই মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণ কেবল হিন্দুর নিকট একজন পূজনীয় দেবতা, আর ব্রজের কানাই, বাঙালির বিরহ-ভালবাসার নিত্য সহচর।
বাংলায় শাস্ত্রীয় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব কোনোকালেই গভীর বা ব্যাপক ছিলো না। প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশে লৌকিক ধর্মের চর্চাই প্রবল ছিলো। মনসা, চন্ডী, শীতলা, বাসুলি’র বাংলার হিন্দুদের উপর যে প্রভাব ছিলো শাস্ত্রীয় বা পৌরাণিক কোনো দেব-দেবীর তেমন প্রভাব ছিলো না। বাংলায় সেন আমলের পূর্বে প্রাতিষ্ঠানিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কোনো প্রসার ঘটেনি। সেন আমলে রাজকীয় উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রসারের ফলে লৌকিক ধর্ম-বিশ্বাসের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সমন্বয়-আপোষের পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু পৌরাণিক দেব-দেবী ও বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের গভীর বা ব্যাপক প্রভাব বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে সৃষ্টি হয়নি। এ কারণে রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, হনুমান, যুধিষ্ঠির, অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণ, দ্রৌপদীকে বাংলায় তেমন জনপ্রিয় দেখা যায় না।
বৈষ্ণব ধর্ম নানা কারণে বাংলাদেশে এক সময় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিলো। বৈষ্ণব মত সৃষ্টি করেছিলো এক ভাব বিপ্লবের। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীর সংখ্যার তুলনায় বাঙালির চেতনায় বৈষ্ণব মতের প্রভাব অনেক গভীর ও ব্যাপক ছিলো। বৈষ্ণব মতের ধর্মীয় দিকের চেয়ে তার মানবিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবেদনের তীব্রতা বেশি ছিলো। তাই এই মত বাঙালি চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
শ্রীচৈতন্যের জন্মের পূর্ব থেকেই বাংলায় শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা নিয়ে পদ রচনা শুরু হলেও শ্রীচৈতন্যের পর থেকে বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রকৃত অভিযাত্রা শুরু হয় বাংলা ভাষায়। চৈতন্য পরবর্তী দু’শো বছর বৈষ্ণব সাহিত্য নানা রূপে নানা বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। এই যুগে রাধাকৃষ্ণের প্রেমের রূপকের আশ্রয়ে মানুষের চিরন্তন প্রেম-বিরহ, আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। এই সাহিত্য বাংলা সাহিত্যে এমন একটি কাব্যাদর্শের সৃষ্টি করেছে যাকে কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা যায় না, যায়নি। এ কারণে মুসলমান কবির লেখায় বৈষ্ণব কবিতার অভাব ঘটেনি। এই কাব্যাদর্শ যুগ যুগ ধরে বাঙালি কবিদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে এবং এই ধারা আজও বহমান। রাধা ও কৃষ্ণের প্রেম কাহিনী নানা রূপে, নানা রঙে, নানা ভাবে যুগে যুগে তিলে তিলে নতুন হয়ে ওঠেছে, বাঙালির কানের ভেতর দিয়ে মরমে পৌঁছে মনপ্রাণ আকুল করে তুলেছে। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বাংলার কবিকূল আপন মনের প্রেম-বিরহের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য রাধা-কৃষ্ণের রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন অকৃপণভাবে, বৈষ্ণব ভাবাদর্শে অবগাহন করেছেন অকুন্ঠ চিত্তে।
রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনী ভক্তদের নিকট জীবাত্মা (রাধা) ও পরমাত্মার (কৃষ্ণ) মিলনের রূপক কাহিনী। এই রূপককে আশ্রয় করে তাদের ভক্তিপূর্ণ্য কাব্য রচনায় অনেক মুসলমান কবিই কুন্ঠিত হননি। যেমন সুফী মতবাদ দ্বারা অসংখ্য হিন্দু কবি (রবীন্দ্রনাথসহ) প্রভাবিত হয়েছেন এবং সুফিদের মতো ঈশ্বরকে দয়িতা কল্পনা করে ভক্তিপূর্ণ কাব্য রচনা করেছেন।
বৈষ্ণব কবিতা মানেই গান। ভক্ত বৈষ্ণবের নিকট এক সময় গান মাত্রেই ছিলো নাম-গান। চর্যাপদের পর বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় প্রাচীনতম নিদর্শন বড়– চন্ডীদাশের কাব্য। সেই আদিকাল থেকেই বাঙালি কবির জিজ্ঞাসা-‘কে না বাঁশি বাএ বড়ায়ি কালিনী নই-কূলে/কে না বাঁশি বাএ বড়ায়ি এ গোঠ গোকুলে।’ সেই বাংলা গানে গানে রাই আর কানুর কথা। বাঙালি কবির-গীতিকারের চেতনে অবচেতনে রাধার আর তার চিকন কালার প্রেম-বিরহের বিচিত্র লীলা। আজকের জনপ্রিয় শিল্পী হাজার দর্শকের সামনে স্টেজ কাঁপিয়ে ব্যান্ডের তালে তালে যখন গান করেন ‘বন্ধু যখন বৌ লইয়া, আমার বাড়ির সামনে দিয়া হাইট্যা যায়,- বুকটা ফাইট্যা যায়’ তখন এই চটুল গানের মধ্যেও রাধার বুকফাটা একই আকুতি শনাক্ত করতে পারি যা চন্ডীদাশের কন্ঠে যুগে যুগে অমর হয়ে আছে-‘কেমনে রাখিব হিয়া / আমার বধুঁয়া আন বাড়ি যায় / আমার আঙ্গিনা দিয়া।’
ভানু সিংহের ছদ্মনামে রবীন্দ্রনাথ যখন লিখেন, ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সম’ কিংবা নজরুল যখন গেয়ে ওঠেন, ‘পদ্মার ঢেউ রে মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা যা’ তখন বাংলার শ্রেষ্ঠ দু’জন গীতিকবি রাধার বিরহেই আকুল হন।
আধুনিক বাংলা গান, সিনেমার গান, কোথায় নেই রাধা আর কানু? উদাহরণ দিতে যাওয়া হাস্যকর। তবুও দিই। কারণ এই প্রজন্মের অনেকেই হয়তো অনেক জনপ্রিয় গানের বাণীর অর্থ বোঝেন না। পঞ্চাশের জনপ্রিয় গান ‘গোপীজন মোর চোর, গিরিধারী নাগর’, মান্না দে’র ‘ওকে আজ চলে যেতে বল না ললিতা’, হেমন্তের গাওয়া ‘ও বাঁশিতে ডাকে কে শুনিতে যে আজ মন / পরান গাড়িতে চায় সে রাখাল গায়’-এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গানগুলো যে রাধা-কৃষ্ণের রূপকাশ্রয়ী তা অনেকেই হয়তো বুঝেন না।
তা বাঁশির কথা তো এসেই গেল। বাঁশি আর কৃষ্ণ তো অনেকটা সমার্থক হয়ে গেছে। বড়– চন্ডীদাশ যখন লিখেন ‘বাঁশির শবদে মোঁ আউলাইলো রান্ধন’। আর শচীন দেব বর্মনের কন্ঠে যখন শুনি ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই / সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ কিংবা ”লতা মুঙ্গেশকার যখন গেয়ে ওঠেন ‘বাঁশি কেন গায়, আমারে কাঁদায়’ তখন সেই বংশী ও বংশীবাদককে চিনতে কারো কষ্ট হয় না। এই বাঁশি বা মুরলী হাতে বলেই ব্রজের কানাইয়ের আরেক নাম মুরলীধরন। প্রেমিক কৃষ্ণের কারণে বাঁশী মাত্রেই প্রেমিকের প্রতীক। বাঁশির সুর মানেই আকুল হওয়া। এই সেদিনও এদেশে লোকালয়ে কোনো তরুণের বাঁশি বাজানো সামাজিকভাবে সমর্থনযোগ্য ছিলো না-যাদের তরুণী ভার্যা বা কন্যা আছে তাদের কাছে তো নয়ই।
ইদানীং বিভিন্ন লোক কবির বা অল্প খ্যাত কবিদের গান, বিশেষত, সিলেট অঞ্চলের গান, নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জনপ্রিয় টিভি নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের এ বিষয়ে একটি অগ্রণী ভূমিকা আছে। রাধারমন, হাসন রাজা, সৈয়দ শাহনূর, বাউল আবদুল করিমের গান - এ যুগের তরুণদের কাছে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দ্রুত তালে নানা আধুনিক শব্দযন্ত্র সহযোগে দেশে বিদেশে আলো ঝলমল কনসার্টে সিলেট অঞ্চলের নানা গান গীত হচ্ছে। এসব গানের মধ্যে ‘কানাই তুমি খেইড় খেলাও কেনে’, ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’ ‘অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে-ভ্রমর কইও গিয়া’ এর মতো জনপ্রিয় গানগুলো আধুনিক তরুণ-তরুণীর মনকে (এবং ব্যান্ডের তালে তালে দেহকে) নাড়া দেয়। কিন্তু এসব গানের রূপক কাহিনীটি সম্পর্কে তারা সামান্যই খবর রাখে।
সিলেট অঞ্চলের লোকগানে রাই আর কানাইয়ের প্রভাব অন্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি। এর সুনির্দিষ্ট সামাজিক ঐতিহাসিক কারণ নিশ্চয়ই আছে। ‘সোহাগ চান বদনী ধনি নাচো তো দেখি’ কিংবা ‘তোমরা দেখ গো আসিয়া কমলায় নৃত্য করইন থমকিয়া থমকিয়া’-এর মতো চিরন্তন সুন্দর গানগুলোর কথা ভাবুন।
শত শত বৎসর ধরে বাংলা গান রাধা-কৃষ্ণের, রাই-কানাইয়ের প্রেম-বিরহ কাহিনী থেকে রস আহরণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে। তাই বলা হয় বাংলাদেশে ‘কানু বিনা গীত নাই।’ এখানে বাঁশি বলতেই কৃষ্ণের বাঁশি, প্রেমিকার শাড়ি মাত্রেই নীলাম্বরী, তারা যেখানেই থাকুক জল আনতে যমুনায় যেতে হয়, তমাল-কদম্ব ছাড়া জুৎসই গাছ নেই, প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন স্থান বা ‘রাধেভুঁ’ মাত্রেই কুঞ্জ, বিরহী প্রেমিকার স্বেচ্ছা মৃত্যুর জন্য (যমুনার) জলে ডোবার চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা হয় না, প্রেমিকা মাত্রেই কলঙ্কিনী এবং কলঙ্কের গর্বে গর্বিতা, রাধাকে গঞ্জনা দেওয়ার কারণে শ্বাশুড়ি, ননদী মাত্রেই খল-নায়িকা।
শেষ করছি একটি সত্যি গল্প দিয়ে। আজ থেকে সিকি শতাব্দী পূর্বের ঘটনা। গল্পটি সুনামগঞ্জ অঞ্চলের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিকে নিয়ে। অবিভক্ত আসামে মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন, এমএলএ ছিলেন। তাঁর বয়স তখন আশি ছুঁই ছুঁই। প্রচন্ড ধর্মপ্রাণ আলহাজ্ব। গান বাজনা মোটেই পছন্দ নয়। ঘরে রেডিওতে খবর ছাড়া অন্য কিছু শোনার অনুমতি নেই। অত্যন্ত ব্যক্তিত্বশালী। একবার তার জ্বর হয়েছে। বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছেন। হঠাৎ সবাইকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়ে গেয়ে উঠলেন-
‘সই গো সই, আমি মরলে ঐ করিও
না গাড়িও না পুড়িও, ঐ তমাল ডালে
বেঁধে রাখিস তোরা।
মোর বন্ধু যদি ফিরে আসে
বলিস তোরা বন্ধুর কাছে
ঐ তমাল ডালে তোর পিরীতির মরা। ’
সত্যিই। কানু বিনা গীত নাই।

>> পথিক ১৮

সোমবার, ৮ নভেম্বর, ২০১০

ভ্রমণ >> ক্যাসিনো! ক্যাসিনো!! : আবিদ ফায়সাল

ক্যাসিনো! ক্যাসিনো!!

আবিদ ফায়সাল

ক্যাসিনো রয়েলের গেটে ঢুকতেই সিকিউরিটির লোকেরা ঘিরে ধরল। পাসপোর্ট দেখাতেই তাঁরা কুর্ণিশ করে ভেতরে নিয়ে চলল। জামাল ভাই আগেই বলেছিলেন, পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতে, না হলে বিদেশি বাজিবাজ চিনবে কী করে? মেটাল ডিটেকটরের ছোট তোরণদুয়ার পার হয়ে কাচের দরজা স্পর্শ করতেই একজন Door prize  লেখা একটি কুপন ধরিয়ে দিলেন। দেখি বড় বড় হরফে লেখা : Casino Royale Welcomes you! (Non Nepalese only)    আলো-উপচানো, পুরু কার্পেট বিছানো বিশাল হলরুম। ব্ল্যাকজ্যাক, রুলেত, স্লট মেশিন-সব ধরনের বাজিখেলার উপাদান আছে সুপরিসর স্পেশে; সেই সঙ্গে বাজিবাজদের জন্য বিনামূল্যে পানাহার, ভোজন এবং নাচ-গান উপভোগ করার ব্যবস্থাও আছে। সহযাত্রী ন’জনের মধ্যে সাতজনই বসে পড়লেন গেম খেলতে। কামাল ভাই বিচিত্র দৈহিক কাঠামোর মানবস্রোতের সঙ্গে মিশে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছেন। আমার সতৃষ্ণ নয়নযুগল খুঁজে ফিরছিল পত্রপত্রিকা ও সাহিত্য সাময়িকী। পেয়েও গেলাম কটি : দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট, দ্য হিমালয়ান টাইমস, অন্নপূর্ণা পোস্ট, কান্তিপুর। ক্যাসিনো টাইমস নামে তো একটি ম্যাগাজিনই আছে। যা নিয়মিত বের হয়। সোফায় বসে এগুলো নাড়াচাড়া করতে দেখে ফয়জুল হক ছুটে এলেন। বললেন, পড়া রেখে তাঁর খেলা উপভোগ করতে। আমি মাথা নেড়ে প্রস্তাব কবুল করে তাঁর পাশে গিয়ে একটি চেয়ারে বসলাম। সব-খোয়াবার মন্ত্রে তিনি খেলে যাচ্ছেন। ফল শূন্য, অর্থাৎ পূর্বং। একসময় তাঁর হাত থেকে একটি কয়েন নিয়ে আমি স্লট মেশিনের ছিদ্র পথে প্রবেশ করাতেই দুটি ধাতবমুদ্রা অন্যপথে নির্গত হয়। মন আনন্দে ভরে ওঠে। ভেতরে ভেতরে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে হয়। মেশিনে কয়েন ফেলতে-ফেলতে ফয়জুল হক বললেন, কাউন্টার থেকে কিছু কয়েন সংগ্রহ করে ভাগ্যটা পরীক্ষা করুন। তাঁর কথা শুনে হাসলাম। আমি জুয়ায় জিতে ভাগ্য বদলাতে চাই না। তবু খেলার চেয়ে কৌতূহলই বেশি ছিল। তাই ভেতরের এক ঔৎসুক্য তাড়না আর ফয়জুল হকের অনুরোধের গরজে আমি ভারতীয় একশ রুপির বিনিময়ে কুড়িটি কয়েন সংগ্রহ করে সামনের একটা ফাঁকা মেশিন পেয়ে খেলায় মজলাম। প্রথম এবং দ্বিতীয় কয়েনটায় কিছু হলো না। এক এক করে দুটি কয়েন খুইয়ে মেশিনে তৃতীয় কয়েনটা ফেলে লিভারে টান মারতেই ঝনঝন শব্দ করে ঝকঝকে পঞ্চাশটি কয়েন বের হয়। খুশিতে হুররে বলে উঠলো পাশের রিংকু। ফয়জুল হকও তাঁর চেয়ার ছেড়ে ছুটে এলেন। আমার চাপা আনন্দ ও উত্তেজনা মনের মধ্যে আলোর ঝিলিক মারতে থাকে। হাসিখুশি ধ্বনি শুনে অনেকটা দূর থেকে কাছে এসে জামাল ভাই রসিয়ে বুঝিয়ে বললেন, যদি একটি না ছুড়ে তিনটি একসঙ্গে ছোড়া হতো তাহলে পঞ্চাশটির পরিবর্তে দেড়শটি কয়েন বেরিয়ে আসত। আমি এবার বেপরোয়া রসিকতা নিয়ে কয়েন ফেলছি। কখনও দু-একটি পাচ্ছি। কখনও পাচ্ছি না। এভাবে হারতে হারতে জিতে যাচ্ছি, আবার জিততে জিততে হেরে যাচ্ছি। একসময় ঝাড়া হাত-পা। আমি আর নতুন করে স্লট মেশিনের গর্ভে একটি কয়েনও ছুঁড়তে রাজি না। কামাল আহমদের মতো সংযমকে অহংকার মনে করলাম। স্লট মেশিন ছেড়ে প্রায় কপর্দকশূন্য হয়ে আমাদের সারিতে দাঁড়ালেন ইকরামুল করিম মজুমদার, টি এইচ এম জাহাঙ্গীর, দিলু মামা ও তাঁর ছোট ভাই রিংকু। জামাল, ফয়জুল ও ফরিদী খেলে যাচ্ছেন শোচনীয় উন্মাদনা নিয়ে।
রাত ন’টা বাজতেই শুরু হলো ডান্স। হিন্দি ও নেপালি গানের তালে তালে জোড়ায় জোড়ায় নাচ, একক নাচ। কামাল ভাই আগেভাগেই সামনের সিট দখল করে নিলেন। যত কাছে থেকে দেখা যায়, ততই যেন চোখের স্ফুর্তি, মনের তৃপ্তি। সামনে সংরক্ষিত আসন-তাই একজন বিনয়ীগোছের সুদর্শনা পরিচারিকা হাসিমুখে এসে কামাল আহমদকে অন্য সিটে বসার অনুরোধ করেন। এবং রকমারি পানীয় টেবিলে রেখে চলে যান। নানা দিক-দেশ থেকে আসা ঘরের প্রায় অর্ধেক মানুষজন নাচ দেখতে চলে এলেন। 
এক ফোঁটা আবরণ নিয়ে নেপালি ললনা তাঁর ভুবনমোহনীরূপ প্রদর্শন করছেন। যৌনতাসর্বস্ব ঢেলে দেওয়া দেখানেপনা নৃত্যকলার উৎকট আতিশয্য দেখে নর্তকির প্রেমের সুরা গিলতে গিলতে এক শিখ ধনকুবের উদার মাতাল হয়ে তাঁর পাঁচ আঙুলে সাজিয়ে রাখা টাকার তোড়া ছুড়ে দিলেন। শিখদের দিল দরিয়া হয় নাকি নেশায়। রোমান্টিক ইঙ্গিত করে জাঁহাবাজ নাচুনিও তাঁর কাছে এসে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিয়ে ঠোঁট মিলান-বলিউডি ধুম-ধাড়াক্কা গানে। সিনেমার দর্শকদের মতো সবাই বিমুগ্ধ হয়ে দেখছেন। মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক কোনও রাজকুমারী কিংবা রানি নৃশংস আনন্দে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে মডেল হচ্ছেন আর বিশ্ববিখ্যাত শিল্পিরা ক্যানভাসে জীবন্ত করে তুলছেন। এই দৃশ্য দেখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অনুসরণেই বলতে হয় : ‘আমি জন্ম-রোমান্টিক, নারীদের খানিকটা কল্পনার রহস্যে মুড়ে রাখতে চাই। এ রকম প্রকাশ্য নগ্নতা আমার অরুচিকর লাগে।’ তবে মেয়েগুলোকে দেখে আমার মায়া লাগল। উপহারের টাকাগুলো তারা টিকমতো পাবে তো? আমি শিল্পীর ক্যানভাস এবং সিনেমা-উপন্যাসে এঁদের অমরতা কামনা করে ক্যাসিনো-উন্মাদ ফরিদীর কাছে চলে আসি। ও তখন স্লট মেশিনের ফুটো দিয়ে নেশার উচ্ছ্বাসে সবেধন নীলমণি ছুঁড়ছে। দেখেই দাঁড়িয়ে গেল, হয়ত আমার মনের অবস্থা আঁচ করে ফেলেছে। বলল, চলেন আন্নায়। ওখানেই ডিনার হবে। জামাল ও ফয়জুল হক ছাড়া সবাইকে একই কথা বলে ফরিদী।
পায়ে হাঁটা দশ মিনিটের পথ মাড়িয়ে মনে হলো, যাহা বাহান্ন তাহাই তেপ্পান্ন। ভেবেছিলাম আন্না কোনও চায়নিজ রেস্তোরাঁ হবে, এসে দেখি-ক্যাসিনো এ-টিও! পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই পর্যটকদের জন্য কিছু না-কিছু বিনোদনের ব্যবস্থা আছে। নেপালের বিনোদন ও আমোদপ্রমোদের প্রধান আকর্ষণ এই ক্যাসিনো। এমন পর্যটকও পাওয়া যাবে যারা বছরে একাধিকবার শুধু ক্যাসিনোর অন্ধ আকর্ষণে এখানে আসে। চারটি ক্যাসিনোই কাঠমান্ডুর বড় চার হোটেলে জায়গা নিয়েছে। দরবার মার্গে অবস্থিত যে পাঁচ তারকা হোটেল ‘ইয়াক অ্যান্ড ইয়েতি’ তাতে রয়েছে ক্যাসিনো রয়েল। এছাড়া সল্টি হোটেলে ক্যাসিনো নেশান, এভারেস্ট হোটেলে ক্যাসিনো বানেশ্বর এবং ক্যাসিনো আন্না রয়েছে কাঠমান্ডু শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অন্নপূর্ণা হোটেলে।
নিরাপত্তারক্ষীদের নিশ্ছিদ্রব্যূহ ভেদ করে কাচের দরজা ঠেলে ক্যাসিনো আন্নার ভেতরে ঢুকতেই মনপ্রাণ চনমন করে ওঠা একটা চেনা সুরের গান কানে ভেসে এলো। তবে গানের কথা বোঝা যাচ্ছে না। এখানেও গিজগিজ করছে বিদেশি নারীপুরুষ। চলছে নানান খেলা। কারও কারও হাতে রঙিন পানীয়। মৃদু কথাবার্তা ছাপিয়ে নানান জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের কর্নসার্টেও চেনা সুর মনে হলো। সবাইকে তিন তলার সিঁড়ি দেখিয়ে ফরিদী বলল, ওপরে খাবার সাজানো আছে, যার যা খুশি খেতে পারবেন। আমি একটু পরে আসছি। ক্যাসিনো রয়েলেও মঞ্চের পাশে খাবারের মস্ত আয়োজন দেখেছি, কিন্তু খুব কাছাকাছি হওয়ায় নাচ চলাকালীন ভোজন-পর্বটা দৃষ্টিকটু দেখাবে। হয়ত এ-জন্যই ফরিদী আমাদের আন্নায় নিয়ে এসেছে। কিন্তু তার খাবারের চেয়ে খেলার নেশাই বেশি। আর ক্যাসিনোর টানেই সে বার বার নেপাল ফিরে আসে।
আমরা ভিড় বিস্তর পার হয়ে তিন তলার সিঁড়িতে পা-রাখতেই শুনলাম সেই আবেশধরানো গান : ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা।’ দ্রুত পা চালিয়ে ওপরে উঠে দেখি-বিশাল হলরুম। মধ্যে সিঁড়ি, দুপাশে দেয়াল ঘেঁষা চেয়ার-টেবিল। এক পাশে উঁচু মঞ্চ। মঞ্চের সামনে সোফা-দর্শকদের বসার জায়গা। সিঁড়ির পেছনে গণখাবারের এলাহি ব্যবস্থা। কেউ কেউ নিজ হাতে খাবার নিয়ে চেয়ার-টেবিলে বসে খেতে খেতে লাইভ সংগীত শুনছেন। চেনাসুর, চেনাগান শুনে কী যে আনন্দ হলো। দর্শক সারিতে বসে পড়লাম আমি। আমার দেখাদেখি অন্যরাও বসে পড়লেন। আমরা আবিষ্ট হলাম চেনাগানের সুরলহরিতে। মনে হলো সারা রাত জেগে থেকে গজল শুনি। ভিনদেশে রবীন্দ্রসংগীত শুনে ভীষণ তন্ময় হয়ে পড়লাম। আধুনিক বাঙালির নির্মাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১ খ্রি.) কেবল বাংলা ভাষা বা বাঙালির নন, বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম জনমনজয়ী কবি, নেপালে এসেও আমরা তার আলামত উপলব্ধি করলাম।
হিন্দি জবানে রবীন্দ্রসংগীত শেষ হওয়ার পর শুরু হলো জগজিৎ সিং, পঙ্কজ উদাসের গাওয়া বিখ্যাত সব গজল। আদনান সামির ‘পেয়ারা পেয়ারা জগৎ কি হায়’ অপরিচিত শিল্পীর কণ্ঠে ভালোই লাগছিল। রাত বারোটায় সাঙ্গ হলো সংগীত আসর।
রসনা-রঞ্জক খাবার সাজানো আছে-যার দাম সাধারণ মানুষের ছোঁয়ার বাইরে। দেদার খিদা মেটাতে বেশ জম্পেশ করেই আমরা এই উপাদেয় খাবার খেলাম। এবার হোটেলে ফেরার পালা। আমরা বেরিয়ে পড়লাম নগ্নপুষ্পঅধ্যুষিত পথে। পথে পথে জেগে আছে ফুলদল দৃষ্টিকে কামুক করে। তাকিয়ে দেখতে নেই এই ভয়ংকর ফুল।
১৫ জুন ২০০৯
হোটেল হলি লজ, থামিল, কাঠমান্ডু

>> পথিক ১৮

কবিতা >> অচিন মানব : মীম হোসাইন

অচিন মানব

মীম হোসাইন

দিনের ভেতর রাত ঢুকেছে
রাতের ভেতর দিন
স্বচিন ঘাটে অচিন মানব
বাজায় কীসের বীণ?

>> পথিক ১৮

কবিতা >> শূন্য একের পর বিয়োগ : আহমাদ সাদিক

শূন্য একের পর বিয়োগ

আহমাদ সাদিক

পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ানো দৃষ্টি ঝর্ণার খোঁজে অরণ্য প্রহরী
নৈঃশব্দ রাতের ঝিঁঝিঁ পোকা, আমাকে বলে দাও
কোথায় লুকিয়ে আছে ঝর্ণার হৃদয়?
ওখানে ভেজাবো শুষ্ক জিহ্বা।
বেদনার নীলমাল্য আকাশের গলে ঝুলন্ত
জীবনের পরাজয়ে আমাকে পরাবে
ভাবনায় প্রত্যাশার দীপ্ত প্রস্ফুট
আবাবিলের কান্না  নিঃসৃত ক’ ফোঁটা অশ্রু-
শূন্য জোড়া হাতে
বাঁ হাতের অশ্রু হারিয়ে অজানায়
জিহ্বার স্পর্শ পূর্বে হাতের তালুয় দস্যু ঘূর্ণি
আর আমি এখন হাতের অশ্রুয় চেয়ে চেয়ে রাতের প্রহরী।

>> পথিক ১৮

কবিতা >> কবি : মুস্তাক আহমদ

কবি

মুস্তাক আহমদ

কবি চায় দিন-রাত বৃষ্টি থাকুক
ঘরের টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে
কবি কান পেতে শুনে তার প্রিয়ার নূপুর।

রৌদ্রের দিন উঠে -
কবির দু’ চোখ বেয়ে বিরহের ঘাম ঝরে
কবি চায় শীতলা দুপুর।

কবি নির্জনতা চায়, চায় নীরবতা
অরণ্যের পথ ধরে কবি হাঁটে
হাঁটে আর খুঁজে তার - প্রেম
কবি যুমনাতে যায়, কদমের তলে বসে
আর ভাবে -
সব প্রেম নিয়ে গেছে
               - রাধা আর শ্যাম।

>> পথিক ১৮

কবিতা >> ফেরারী ভাবনা : নাজমুল হাসান

ফেরারী ভাবনা

নাজমুল হাসান

আমাদের বিষণ্নতার একমাত্র সঙ্গী
একটি শলাকা - একটি কাঠি
আহা! বসে-বসে, হেঁটে-হেঁটে
মেঘের কুণ্ডুলি বানাই - বিনির্মাণ করি দুঃখ
পাখির পালকের মত কষ্ট, নিঃসঙ্গতা
উড়ে-উড়ে বেড়ায় বিবর্ণ নীলিমার মাঝে
আমরা তখন স্রষ্টা
সৃষ্টি করি নিত্য নতুন উল্লাস
কখনো অজান্তেই ডুবে যাই বিপাশা নদীতে!
অথচ দু’ পা এগোলেই কবিতা
দুমড়ে-মুচড়ে দেয় বুকের জমিন
ইদানিং ভাবনাগুলো ফেরারী
হুইসেল বাজিয়েছে
দমিয়ে রাখতে পারি না তাদের

>> পথিক ১৮