শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

কবিতা >> সীসা : প্রণব আচার্য্য

সীসা

প্রণব আচার্য্য

আমরা পেয়ে গেছি হরিণের খুর- মড়ক লাগা
মাছিদের গুঞ্জন; ঢাকার আকাশে
আজ অনেক ধোঁয়া, দু’জনে মিলে হয়ে আছি
পালকের নরোম শ্বাস। গাছেদের পাতা থেকে
মুছে গ্যাছে সেই কবে বসন্তের দাগ-
অজস্র বেগুনী আলো আর ট্রাফিক হলুদ রিরংসায়
না, এটা প্রাচীন নাটকের একরৈখিক বিন্যাস নয়
এ শহরের সবকটি ইটে লেগে আছে কসমোপলিটন ধূলো
ভুলে গ্যাছো; ভুলে গ্যাছো এই শহরে ধূলো উড়িয়ে
বেজেছিলো ঘন অশ্বখুরধ্বনি- আমরা এসেছি
সেদিনই তো- সীসার মতো ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে রোদ

কবিতা >> বিধ্বস্ত নীলিমা : শফিউল আজম

বিধ্বস্ত নীলিমা

শফিউল আজম


আহারে স্বদেশ আমার-
কলমির বন নেই আর, আছে ঝাউবন
তাও বুকের মাঝখান দিয়ে পাথুরে সড়ক
ইলেকট্রিক ব্যাটে মশকীর সশব্দ মড়ক।
লোহার উপর বউ-পেটানোর ভঙ্গিমায় হাতুড়ি চালাচ্ছে বেধরক।
উদ্ধত স্তন তবু, স্তনে স্তনে পর-পুরুষের দাঁত
দেশের শরীর ভুলে যায় সমস্ত আঘাত
রাতে চর্বি, দিনে-দুপুরেও তাই, এ শহর ভুলে গেছে হা-ভাত।
আকাশেও ফাটল ধরেছে, ডাকতো নীলিমা এককালের কবিরা
মাথার উপর নীলিমা নেই আর, রাতের সড়কেই শুধু
ঘুরে-ফিরে সহস্র নীলিমারা।

কবিতা >> বইমেলা ২০১৪ : রবিউল মানিক

বইমেলা ২০১৪

রবিউল মানিক

কড়ুই গাছের নীচে বাঁধানো চত্বর
রঙিন মুখোশ পরা বন্ধুরা আসছে
সদৃশ্য হাত প্রেমিকার বাহুলগ্ন; সূর্যপুষ্প হলুদ,উজ্জ্বল সূর্যাধার
কোন প্রান্তর জ্বলছে
ফিদা হুসেনের তুলি, প্যাস্টেল, স্প্যাচুলা
জন্মের পেছনে জন্ম

আমার প্রেমিকা নেই...  শৈশবে একটা নদী ছিল
আর একজন দেবী
সব সমর্পণ সমুদ্রের দিকে ফেলে
অবশেষে মরা খাল
দখলের মহোৎসবে কাটা পড়ে গেছে কাশবন
অস্তগামী চাঁদের তলায় সেই দেবী, তার এলোচুল
ঠোঁটের বাঁকানো হাসি, চিকন কোমর, সাদা পেট...

শান বাঁধানো চত্বরে ঠোঙা ভর্তি বাদাম দু’ হাতে
জনস্রোত ভাঙে একে ওকে ডাক দিই
যুগযুগান্তে প্রত্যেক মুখে খুঁজি : সূর্যোদয়, সূর্যাস্তসকল, কবি, চিত্রকর

নিজের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের ঘৃণা
সারি সারি অন্ধকার, একরোখা স্বপ্ন
এক বজ্রপাত থেকে আরেক বজ্রপাতের মধ্য মুকুল ঝরছে

সৌরভে উন্মাদ মানুষ ছুটছে

কবিতা >> স্রোত ও রাতের বৃক্ষ : আবু মকসুদ

স্রোত ও রাতের বৃক্ষ

আবু মকসুদ

(আহমদ ময়েজ পৃথিবীর পৃষ্ঠায় হেঁটে চলা এক দুর্দান্ত পুরুষ)

গাছ মরেছে ভেবে মাড়িয়ে গেলে প্রবল তৃষ্ণায়, নদীজলের নিমিত্ত শিল্প দাঁড়িয়ে যায় তিমিরহরণে। নিরভিমান চাঁদ শরীরে লাগিয়ে, কাদামাটি বিভক্ত স্রোতেরা গড়ে দিতে চাইছে অজস্র উপকূল। রোদের আড়ত ছেড়ে বারান্দার সীমারেখা ধরে, আছন্ন আপন স্মৃতি পুড়ছে চোখের আরামে। প্রত্ন মধ্যযুগেও পাখি-ঘুম শেষে মানুষ পাড়ি দিতো গন্তব্যের ঢেউ-পাশায়, এই হেতু মিথ্যা নয়, যন্ত্র-সভ্যতায় ভালোবাসা ছুঁয়ে দেখে না চিতার হৃদয়। অপরূপ ভবিতব্য নির্মাণের দায়ে গাছের মৃতদেহ মেনে নেয় সময়ের স্খলন। তবু আলোর সলতেটি আগলে প্রত্ন মানুষ ক্লান্ত সূর্যকে পূজে অত্যুজ্জ্বল সকালের প্রত্যাশায়। 
নেই কোনো মঙ্গল পূর্বাভাস, প্রত্ন মানুষেরা যাপিত জীবনে শস্য আকুলতায় করে যায় মৃত্তিকা কর্ষণ। খড়মাটি দিয়ে গড়া মানুষটি সময়ের স্নায়ুর চাপে কখনো হয়ে উঠে উচ্চাকাক্সক্ষী ভেড়া, নিয়তির ছোবলে সে মূর্ছা গেলে অন্তর্গত বেদনার ধ্বনির মতো নেমে আসে অনিবার্য রাত। এমন রাতে মানুষ করে না নিশুতি-বিলাস। 
জলের স্রোতে মানুষ ভাসায় ঈশ্বর, এ এক মজার খেলা, এমন খেলায় এখন মানুষকেও পারদর্শী হতে হবে।
লন্ডন, যুক্তরাজ্য

কবিতা >> গুহার দরিয়া থেকে ভাসে সূর্যমেঘ : ফকির ইলিয়াস

গুহার দরিয়া থেকে ভাসে সূর্যমেঘ

ফকির ইলিয়াস

তন্দ্রা টানেলে এসে এই রূপ অন্য গতি পায়। মূর্ছনায়
নত হয় প্রতিবেশী বেহালা বাদক। আলগে মনের মায়া
জলছবি পরখ করে, আর ব্যঞ্জন বেদনা নিয়ে সমুদ্রের
নিরিখে হারায়। যেতে হবে বহুদূর। বিশদ বনান্তরে যে
পথিক রেখে গেছে ছাপ, তার ছায়া মাড়িয়ে এই অভিবাসী
নদীদের গান শুনে রপ্ত করে নিতে হবে, না জানা বিকেলের
অভিভাষণ। যারা ঢেউসূত্র শিখে উজানের বিনম্র পাথরে
রেখেছিল হাত। বৈঠাডোরে নিজেদের ভবিষ্যৎ জাগিয়ে
রেখে ঠিক তোমার মতোই লিখেছিল চিঠি, 'খুব ভালো
আছি।’ জীবনেরই ভালো থাকা হয়। আর মৃত চাঁদ শুধুই
বিরহ ছড়ায়, গুহায়। গুহার দরিয়া থেকে ভাসে সূর্যমেঘ।
ভোর হবে, এই সত্য অনির্বাণ জেনে তুমিও হাত রাখো
আমার হাতে।

তুমিতো সমুদ্র তাই, নাবিক আমি, চন্দনা ঘোষ
নারীর বৃত্তে আঁকা পরাগের, অবনত প্রথম পুরুষ।
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

কবিতা >> কাতকুঁজো বীর্যবল বোলতা সহবাস : মোহাম্মদ আমজাদ আলী

কাতকুঁজো বীর্যবল বোলতা সহবাস

মোহাম্মদ আমজাদ আলী

গাছ
সীম গাছ
নিম গাছ তাল গাছ
ডাল গাছ লাউ গাছ ঝাউ গাছ
কুলগাছ ফুল গাছ গুল গাছ মূলা গাছ কলা
গাছ গাছ গাছ পাতা পাতা ঢেংপাতা শ্যান পাতা ধান পাতা
মান পাতা চিরতা ত্রিফলা আমলা বহেড়া হরিতকী তিরিতিকি
গাছ গাছ পাতা পাতা নাচে নাচে ঢেউ নাচে ধেই নাচে তাক্ধিনাধিন
আর বিপত্তির দেয়াল ভেঙে আবারো ফিরে যাবার প্রবল তৃষ্ণা সেই গাছ
 বৃক্ষের নিচে যার সবটুকু চিহ্নিত স্মৃতিস্বপ্ন অতীতেই গেছে মুছে আপন দৃষ্টি
ছিঁড়ে ছুটে যাওয়া চোখের পলক মহাকাশ জাপটে ধরে হাঁটা পথে শক্তির উৎস
সূর্যের সাথে কিছুক্ষণ অন্তে কোত্থেকে উড়ে আসা গাঙচিলের ধবল বীর্যবর
অর্চনাকাতর প্রজ্ঞার গভীরে গোষ পাখিদের বিনোদবুদ্ধিতে মুহূর্তে সঙ্গমরত
হাঁসা হাঁসির গম্ভীর সুখ ভোগের চুলচেরা বিচার বিশ্লে ষণ আত্মস্থ অন্তে কাকের
সঙ্গীতে এমন জলজ্যান্ত বিশুদ্ধ সহবাসের শখ-সৌন্দর্যই আলাদা রকমের
নির্ভাবনায় ভুলিয়ে দেয় আকাশ স্বপ্ন দেখার ভয় এমন সময় কার গোলায়
কার ধান কার পেটে কার বীর্যের চিরন্তন পাঁচন জীবন বিচ্ছিন্ন যেনো এই মেঘলা
অমাচ্ছন্ন রাত হেলতে হেলতে গভীর সমুদ্রে নিভে গেলে নিভু আলোর
মিছিল জেগে থাকে অথৈ থৈ থৈ ঘুর্ণি জীবন প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ কীর্তি প্রেম
অন্তরাত্মায় যার চিরন্তন বসবাস একতারা সুরেলা বাউল ভেসে যাওয়া দূর থেকে
আনন্দ বেদনার রঙ্গন সভ্যতা পরস্পরের রক্ত চিবিয়ে কৃষকের ঝাপসা
দু’ চোখ খুঁজেই পায় না কৃষাণীর তন্বি-তলপেট নরম গরম স্তনযুগল যন্ত্রণায়
কুঁজো লিঙ্গ হেলে আসে রাত-বাতের পেট স্মৃতি শক্তি শিশির-দুর্বার স্নেহ গন্ধ
স্পর্শে চোখের ভূঁড়িনাচা স্পর্ধার পালাবহর জল কেটে কেটে বিরান থেকে বিস্ময় আলো টুকরোরা
দীর্ঘশ্বাসে গাণিতিক গুহ্যগর্তে চৈতী হওয়ার সাথে দ্বন্দ্ব মাতালে মেধার জরায়ু জে্যঁওঠা বাঁশের
মতো জটযুদ্ধে পৃথিবী ডুবে গেলে এক ঠায় দাঁড়ানো পেট আর ক্ষুধা দীর্ঘস্বপ্নে অশ্রুর হাড়ভাঙা
শ্রম কাত হতে হতে বিস্ফারিত ককটেল চোখ উদ্বেলিত কামনার হরেক রমণে বিশ্বাস নিঃশ্বাসে
ওজনের বাটখারা ডুবিয়ে দিলে ভরতদের ক্ষুধা আর্তি ঘাম রক্ত মৃত্যু লাশ গলিত দুর্গন্ধ
কুকুর শেয়াল শকুনের অধিকার আর রাহেলাদের ধর্ষিতা পতিতা শোনিত বিক্ষত
ভয়ঙ্কর ভাঙচুর রক্তহাত মেদমগজ যোগাযোগ যোগ্যতা দক্ষতা উন্নয়ন অগ্রগতি
ইত্যাদি প্রভৃতি আর্তি কাতর শশ্মান মিনতি দগদগ চিতার আর আত্মহুতি কবরের
মাটি মাথার ছাদে পেরেক রোদ্দুর আশপাশ ফুটন্ত বৃক্ষের শব্দ কখনো শুকনো শালিকের
ঘ্রাণ দাহমান পাখিদের আর্ত বেদনায় মোহময় আণবিকে দিকে দিকে বুকের
দিব্যদিশা পতঙ্গের দীর্ঘবহরে কে ভাসায় কার অশ্রু ভেলা ভঙ্গুর সভ্যতার ভেলকিজ্ঞানে
কানের পিকক চিন্তা বীর্যের নতজানু দৌড় ফসিল কামনার কর্কশ করতালি
সুখকর সঙ্গমে বিষকাঠুলার সহায়তা সামনে হাহাকারের হর্ষধ্বনি
সবার অলক্ষ্যে ভৌতিক অন্ধকার বিজ্ঞতার বাহারে রঙিন
অন্তরাত্মায় ঘোর ক্লান্ত নিসর্গ পৃষ্ঠ প্রদর্শনের অবর্ণ
সমন্বয় সিঁড়ি টুকরো টুকরো মৃত্যু ক্ষোভে ভ্রষ্টা পৃথিবী
আমার অন্তর জুড়ে উদ্যত লাশের কিরিচ খঞ্জর
উচ্ছৃঙ্খখল প্রবাহের মতো আক্রান্ত ক্রোধভরা
শুয়োরেরা কীভাবে তাড়িত হবে
কিংবা কে যাবে দানব দূর্গে উদ্বৃত্ত সাহসে
চোদ্দ পুরুষের ভিটে আর
পৈত্রিক প্রাণ কাফনের গভীরে ভাঁজ।

কবিতা >> ডানা : লতিফুল ইসলাম শিবলী

ডানা

লতিফুল ইসলাম শিবলী

উড়ে বেড়ানো ছাড়া 
তোমার কাছ থেকে কিছুই শিখলাম না পাখি।
তোমার সহিষ্ণু মৌনতা
ধ্যানমগ্নতা
    বেপরোয়া নির্ভরতা যদি শিখে নিতে পারতাম
তবে নিশ্চিত আমার নাম হতো ‘পাহাড়’

নিপুণ বুননে যদি শিখে নিতাম
বাসা বানানোর কৌশল
তবে কি ঝড়ো বাতাসে তছনছ হই বারংবার -

এত কিছু থাকতে কেন যে তোমার কাছ থেকে 
চেয়ে নিলাম ডানা

শূন্যে ওড়ার সাধ মেটাতে 
শূন্য হয়ে গেলাম।